kalerkantho


শত বাধা পেরিয়ে পপির ‘নিয়ন্তা বুটিক’

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শত বাধা পেরিয়ে পপির ‘নিয়ন্তা বুটিক’

‘নিয়ন্তা বুটিক’-এর স্বত্বাধিকারী হোসনা খাতুন পপি। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা স্বভাবের মেয়ে তিনি। চাকরি নয়, ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হতে চেয়েছেন। স্বল্পপুঁজিতে ছাত্র অবস্থায়ই শুরু করেন ব্যবসা। এসেছে পারিবারিকসহ নানা বাধা। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প শুনেছেন জে এফ পিয়াসা

 

ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলাম। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পছন্দ করতাম; কিন্তু আমার পরিবার তা মোটেও পছন্দ করত না। তাদের ধারণা, মেয়েদের স্বাধীনতা দিলে তারা নষ্ট হয়ে যায়। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দিত। বাইরে গেলেই কি মেয়েরা খারাপ হয়ে যায়? এ রকম কেন ভাবা হয় আমাদের সমাজে? এসব নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেত আমার মাথায়। ছোটবেলায় খালাকে দেখতাম, বাসায় বুটিকের কাজ করতেন। বাসায় থাকলেও উনি স্বাবলম্বী ছিলেন, নিজস্ব আয়ের একটা উৎস ছিল তাঁর। আমি ভাবতাম, বড় হলে আমিও খালার মতো স্বাবলম্বী হব, অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে সক্ষমতা অর্জন করব। ভাবতে খারাপ লাগে, সময় যায় কিন্তু যুগ পাল্টায় না মেয়েদের জন্য। যুগ যুগ ধরেই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একই থাকে! প্রাচীন, প্রথাগত রীতি-নীতি দিয়ে তারা মেয়েদের আটকে রাখতে চায় নিয়মের শৃঙ্খলে। কোনো মেয়ে যদি প্রথাগত রীতি-নীতিকে পদদলিত করে এগিয়ে যেতে চায়, তখনই সবাই খড়্গ হস্তে এগিয়ে আসে তার দিকে। এমনকি বাদ যায় না তার পরিবারও। যেমনটি ঘটেছে আমার জীবনেও।

যখন কলেজে উঠি, তখন যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মোমের আইটেম, ক্লের (সিরামিক) আইটেম বানিয়ে কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার প্রডাক্টের চাহিদা বাড়তে থাকে। চাহিদার জোগান দিতে রাত জেগে কাজ শুরু করি। তারপর ‘নীড় ট্রেনিং সেন্টার’ নামে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলি। এটি প্রায় তিন বছর পরিচালনা করেছিলাম। মিরপুর বাঙলা কলেজে যখন অনার্সে পড়ি, তখন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে বুটিকের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত মেলায় আমার প্রডাক্ট নিয়ে অংশগ্রহণ শুরু করি। হঠাৎ পরিবার থেকে বাধা আসা শুরু করে। আমার পরিবার চায় না আমি ব্যবসা করি, মেলায় কাজ করি, বিশেষ করে মেলায় কাজ করাকে তারা কেউ ভালো চোখে দেখত না। তারপর বিদেশ থেকে প্রডাক্ট আনতে শুরু করি। প্রথম যখন ব্যবসার কাজে বিদেশ যাব বলে মনস্থির করি, তখন তারা কেউ রাজি ছিল না। আমার বিদেশ যাওয়ার কথা শুনে তাদের চোখ যেন কপালে উঠে যায়। এ কেমন কথা! একা একটা মেয়ে বিদেশ চলে যাবে! কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় তারা আমাকে যেতে দিতে বাধ্য হয়। বিদেশ থেকে আনা প্রডাক্ট ও আমার নিজস্ব তৈরি প্রডাক্ট নিয়ে আমি আমার ব্যবসা চালাতে থাকি। আমার প্রডাক্টের চাহিদা যখন বাড়তে থাকে, তখন একটা দোকান দেব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। মিরপুরে আমার বাসার কাছেই একটা দোকান ভাড়া করি। দোকানের নাম দিই ‘নিয়ন্তা বুটিক’। বলতে পারেন শত বাধা পেরিয়ে গড়েছি এই ‘নিয়ন্তা বুটিক’। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ চলতে থাকে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় প্রডাক্ট পাঠাই, আয়োজিত মেলায় অংশগ্রহণ করি। সব কিছু মিলে ভালোই চলছিল; কিন্তু তার পরও বারবার পরিবার থেকে বাধা এসেছে। তারা আমাকে থামাতে চেয়েছে এই ভেবে, ‘লোকে কী বলবে—মেয়ে মেলা করে! ব্যবসা করে! ছি! এই মেয়ের কি ভালো বিয়ে দেওয়া যাবে?’ একপর্যায়ে আমি আমার মাকে মেলায় নিয়ে যাই। আমি কী পরিবেশে কাজ করি তা দেখানোর জন্য। এরপর তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন আসে। নিজের দেড় লাখ টাকাসহ একটি সমিতি থেকে লোন নিয়ে দোকান দিয়েছিলাম। এই দোকান দেখে মিডল্যান্ড ব্যাংক লোন দেয় পাঁচ লাখ টাকা আর মার্কেন্টাইল ব্যাংক লোন দেয় দেড় লাখ টাকা। এই টাকা দিয়ে দোকানের পাশাপাশি একটি কারখানাও দিই। এতৎসত্ত্বেও বারবার পরিবার থেকে চাপ এসেছে চাকরি করার জন্য। কিন্তু আমি অনড় ছিলাম, আমার সাফ জবাব ছিল—কখনোই আমি চাকরি করব না। অন্যের অধীনে চাকরি করতে আমার মোটেও ভালো লাগে না। ব্যবসায় যে স্বাধীনতা, সেটা আমি কখনোই হারাতে চাইনি। একপর্যায়ে পরিবার ছেড়ে আলাদা বাসায় চলে যাওয়ার জন্যও চাপ আসে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রথম লোন পরিশোধ করার পর সিসি লোনে দ্বিতীয়বার ১০ লাখ টাকা লোন পাই। এতে আমার ব্যবসার পরিসর আরো বেড়ে যায়। আমি আরেকটি কারখানা দিই। এখন আমার দুটি কারখানা। এতে কাজ করে ২০ জন কর্মচারী। এ ছাড়া সাবকন্ট্রাক্টে আরো তিন জায়গায় কাজ করাই। এত কিছুর পরও আমার জীবনে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে। দুই জায়গা থেকে লোন নিতে গিয়ে আমার জুতার তলা ক্ষয় হয়ে গেছে। সব ধরনের শর্ত পূরণ করেছি, তা সত্ত্বেও লোন পাইনি। সরকার বলে, বাংলাদেশ ব্যাংক মেয়েদের কোনো সিকিউরিটি ছাড়াই লোন দেয়। এটা আমি বিশ্বাস করি না। হয়তো সবার ক্ষেত্রে দেয় না। কেন দেয় না, আমি জানি না। ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ২০ লাখ টাকার একটা লোন দেওয়ার কথা ছিল। আমার সাপোর্ট আছে, কারখানা আছে। আমি ওদের দেখিয়েছি; কিন্তু কেন যে ওরা লোন দিল না, তা বুঝতে পারিনি। অনেক সময় ব্যবসার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে সুদের ওপর লোন করতে হয়, সুদের টাকা দিতে হয় বলে আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ে। ছোট ছোট সমিতি খুব মোটা হারে সুদ নেয়। তার পরও কী করা! ব্যাংক যখন লোন দিতে নারাজ, তখন এই ছোট সমিতিগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

আমি কোনো ধরনের সাপোর্ট ছাড়াই আমার ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এমনকি একটা টাকাও পরিবার থেকে পাইনি। এখন আমার দুটি দোকান, দুটি কারখানা। পাঁচ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন সামগ্রিক খরচ বাদ দিয়ে মূলধন প্রায় বিশ-পঁচিশ লাখে দাঁড়িয়েছে। ২০ জন কর্মচারীর জীবিকা আমার ওপর নির্ভর করছে। ব্যবসার কাজে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছি। এই যে অভিজ্ঞতা, এটার কোনো তুলনা হয় না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি দীর্ঘ পথ হেঁটেছি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি এবং করছি। আমার এই দীর্ঘ পথে অনুপ্রেরণার জায়গা ছিল আমার খালা। আমি সব বাধা তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছি। বারবার নানা বাধা এসে আমার স্বপ্ন ভেঙে দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি হার মানিনি। আমিও দেখতে চেয়েছি এর শেষ কোথায়। কেউ যদি কোনো কাজে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সততা ও বিশ্বাসের সঙ্গে লেগে থাকে, তাহলে কোনো বাধাই তাকে আটকে রাখতে পারে না। এ শিক্ষাই আমি আমার জীবন থেকে পেয়েছি।



মন্তব্য