kalerkantho


রাজধানীর এক নীরব ঘাতকের নাম শব্দদূষণ

রাতিব রিয়ান   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীর এক নীরব ঘাতকের নাম শব্দদূষণ

অলঙ্করণ : মাসুম

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবল এবং রাতের বেলায় ৪৫ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারে; সেক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠান কোনো আবাসিক এলাকায় করা যাবে না

 

রাতের মধ্যপ্রহর। অবসন্ন-ক্লান্ত শরীর বিছানায় মেলে দিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলেন ঢাকার আর কে মিশন রোডের বাসিন্দা নাজমুল হক (৬০)। কয়েক দিন আগেই তাঁর বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই তাঁর চোখে ঘুম আসছে না, কারণ ছাদেই বাজানো হচ্ছে উচ্চশব্দে গান। উপলক্ষ বিয়েবাড়িতে গায়েহলুদ।

অনেক্ষণ নীরবে সহ্য করলেন নাজমুল হক। কিন্তু এবার আর পারলেন না। বিছানা ছেড়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, অসুস্থতার কথা জানান দিতেই গানের আসরে গেলেন বৃদ্ধ নাজমুল হক। অনুরোধ করলেন, গানের আওয়াজটা যেন একটু কমানো হয়। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনল না। উল্টো কথা কাটাকাটি, তিক্ত বাক্যবিনিময়। উচ্চশব্দ নিয়ে রাতটি পার করলেন নাজমুল। পরদিন এ নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বাগিবতণ্ডা হয়। মারধর করা হয় নাজমুল ও তাঁর ছেলেকে। মারধরের একপর্যায়ে মৃত্যু হয় নাজমুলের।

ঘটনাটি দুই সপ্তাহ আগের। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটকও করেছে। কিন্তু গান শোনার নামে কয়েকজন মানুষের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের বলি হতে হলো একজন বাইপাস সার্জারির রোগীকে। এখন প্রসঙ্গ হলো—রাতে এ রকম উচ্চশব্দে গান-বাজনা করার কোনো নিয়ম আছে কি না বা উচ্চশব্দের গান আমাদের সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না? আবাসিক এলাকার ভেতরে বিয়ে, জন্মদিন, গায়েহলুদসহ নানা অনুষ্ঠানের নামে রাতের বেলায় উচ্চশব্দে গান বাজানো হয়। মহল্লাবাসীর কাছে যা রীতিমতো অত্যাচার। অথচ উচ্চহারে শব্দদূষণ রোধে আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে গান-বাজনা বাজছে উচ্চৈঃস্বরে। শব্দদূষণ রোধে দেশে রয়েছে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬’। এ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আবুল কাসেম খান বলেন, ‘নগরসভ্যতায় আমরা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকি। তার পরও আমাদের পরস্পরের মধ্যে অনেক ব্যবধান। এ কারণে আমরা অনেক সময় অন্যের কষ্ট বুঝতে চাই না। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মধ্যরাতে গান-বাজনা করলে অন্য মানুষের যে সমস্যা হতে পারে, আমরা সেটা দেখি না। আমাদের মূল্যবোধের পরিবর্তন হওয়া দরকার। গান অবশ্যই শুনব। আনন্দও করব, তবে সেই আনন্দ অন্যের জন্য যেন নিরানন্দের কারণ না হয়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে এটাই সামাজিক সচেতনতা।’

মীর হাজীরবাগ, যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা নীলিমা রহমান বলেন, ‘ছাদে কিংবা বাসাবাড়িতে কোনো উপলক্ষ এলেই গান-বাজনা করা হয়। চেঁচামেচি-হৈহুল্লোড় চলে। বেশির ভাগ সময় এগুলো সহ্য করতে হয়। বাড়তি ঝামেলার ভয়ে মানুষ অনেক সময় এগুলোর প্রতিবাদ করে না। আবার দেখা গেল, প্রতিবাদ করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।’

এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘রাজধানীতে শব্দদূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু ঠিকমতো আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় তা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে।’ উচ্চশব্দে গান-বাজনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠান করার দরকার হলে সেখানে কেউ মানা করছে না। কিন্তু অন্যের অসুবিধা যাতে না হয়, সেটি মাথায় রাখতে হবে। মধ্যরাতে অনুষ্ঠানের নামে বাড়ির ছাদ কিংবা খোলা প্লটে বা মাঠে উচ্চশব্দে গান-বাজনা কখনো কাম্য নয়। নিজেদের কার্যকলাপে অন্য কোনো মানুষের সমস্যা হতে পারে, এই বোধ থাকলে অনেকাংশেই এই প্রবণতা কমে আসত।’

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবল এবং রাতের বেলায় ৪৫ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, বিয়ে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারে; সেক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠান কোনো আবাসিক এলাকায় করা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘রাতের বেলায় উচ্চমাত্রায় গান বাজানো কতটা মানবিক, সে বিষয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলেই তো সহজে উত্তর মেলে। আমরা বোধ হয় অনেক সময় এই প্রশ্নটা করি না। যে কাজই করি না কেন, পাশের মানুষের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘নগরের এই ব্যস্ত সময়ে পরিবারের বন্ধন ক্রমেই ক্ষুণ্ন হয়ে যাচ্ছে। পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ কারণে ছোট-বড় অপরাধপ্রবণতা তৈরি হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ থাকলে সামাজিক অনুষ্ঠানের নামে অনাচারগুলো হয় না।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (রমনা) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘এ ধরনের অনুষ্ঠান বা গান-বাজনা যখন হয়, তখন সেটি প্রতিবেশীরা কিভাবে নেন তা-ই প্রথম বিবেচ্য বিষয়। কেউ ঝামেলার ভয়ে এসব এড়িয়ে চলেন। এসব বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ তিনি আরো বলেন, ‘মোট কথা মানুষকে সচেতন হতে হবে। কখনো কখনো আইন প্রয়োগের চেয়ে মানুষের সচেতনতা শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমাদের স্বল্প জনবল দিয়ে এগুলো রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা চাইলেও তাত্ক্ষণিক সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘থানায় অভিযোগ দিলে এ বিষয়ে সহজে প্রতিকার পাওয়া যায়। ভুক্তভোগী কেউ চাইলে পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন।’



মন্তব্য