kalerkantho


‘ডিআইটি পুকুর’ এখন দখলদারদের কবলে

জাহিদ সাদেক   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘ডিআইটি পুকুর’ এখন দখলদারদের কবলে

একসময়ের গভীর জলের ডিআইটি পুকুরটিতে এখন যেন ঘটিও আর ডুববে না! পুকুরের চারপাশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে দোকান। করা হয়েছে কলা ও সবজির বাগান। পুকুরটির উত্তর-পশ্চিম কোণে গড়ে উঠেছে রিকশা গ্যারেজ। এমনি নানা অজুহাতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে রেখেছে ডিআইটি পুকুরের জায়গা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডিআইটি প্লটে অবস্থিত এই পুকুরের চারপাশে গড়ে উঠেছে হোটেল, ফার্নিচার, কাপড়ের দোকানসহ নানা ধরনের অবৈধ দোকানপাট। এসব দোকান থেকে ভাড়া তুলে পকেট ভারী করছে আড়ালে থাকা কুচক্রীরা। দিন দিন বাড়ছে দখলের পরিধি। আবার এসব দোকানের পেছনের অংশের পুকুর ভরাট করে শাকসবজির চাষ করছেন আশপাশের বাড়ির মালিকরা। তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেড়াও দেওয়া হয়েছে। দিনের আলোতেই মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। পাশেই একপাশজুড়ে আবর্জনার স্তূপ। পূর্ব দিকে কয়েকটি বাড়ি, পশ্চিম প্রান্তে ফেলা হয়েছে মাটির স্তূপ। পশ্চিম-উত্তরে দেওয়া হয়েছে ‘শহিদ চেয়ারম্যান’-এর রিকশা গ্যারেজ। তুলনামূলক উত্তর ও পশ্চিম দিকে দোকান বেশি। সব মিলে প্রায় ৪০-৪৫টি দোকান দেওয়া হয়েছে পুকুরের চারপাশে। এতে একদিকে যেমন পুকুরের জায়গা দখল হচ্ছে, অন্যদিকে এলাকার বসবাসের পরিবেশ হচ্ছে নষ্ট।

দেখা গেছে, পুকুরটির প্রকৃত আকার এখন অর্ধেক হয়ে গেছে দখলের প্রতিযোগিতায়। যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা-ও অযত্ন আর অবহেলায় আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরে গেছে। দেড় একরের এই পুকুরের মালিক রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এর চারপাশে রাস্তা আছে। রাস্তার চারপাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে দোকানপাট। সংস্কার হলে এলাকার সৌন্দর্য বর্ধন ও এলাকাবাসীর বিনোদনের উৎস হতে পারে পুকুরটি।

স্থানীয় প্রবীণ মুহিবুল্লাহ জানান, পাকিস্তান আমলে এই পুকুরের পানি আমরা পান করতাম। আগে পুকুর এত গভীর ছিল যে ডুব দিয়ে সহজে মাটি পাওয়া যেত না, এখন ১০ ফুট পানিও নেই। মাছ তো নেই-ই। গোটা পুকুর কচুরিপানা আর ইটের খোয়ায় ভর্তি। তিনি আরো বলেন, ১০ বছর আগেও মহল্লার মানুষ এই পুকুরে গোসল করত। রান্নাবান্নায় এই পুকুরের পানি ব্যবহারের স্মৃতিও বেশি পুরনো নয়।

পাশে থাকা ডিআইটি এলাকার বাসিন্দা সাইদুর জানান, এই ওয়ার্ডে কোনো পার্ক নেই। নেই কোনো বিনোদনকেন্দ্র। খেলাধুলা, এমনকি হাঁটাচলার জন্য কোনো উন্মুক্ত জায়গা নেই। পুকুরটি সংস্কার করে এর পাড়ে হাঁটাচলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে সহজেই। পুকুরে শিশু-কিশোররা সাঁতার শিখতে পারবে।

ডিআইটি পুকুরটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। যা গেণ্ডারিয়াসহ শহীদনগর, ফরিদাবাদ লেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি, হরিচরণ রায় রোড, বাহাদুরপুর লেন, লালমোহন পোদ্দার লেন, গ্যাস ফ্যাক্টরি রোড, গেণ্ডারিয়ার সতীশ সরকার রোড, ডিআইটি প্লট রোড, নবীন চন্দ্র গোস্বামী রোড, ঢালকানগর লেন এলাকা নিয়ে গঠিত। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার এই ওয়ার্ডে খোলা জায়গা বলতে আছে ডিআইটি পুকুরটি। কিন্তু বর্তমানে এর অবস্থা করুণ।

পূর্ব পাশের পুকুরপাড়ের বাসার মালিক হেলাল জানান, ‘যারা যেভাবে পেরেছে পুকুরটি দখল করে রেখেছে। পুকুরের চতুর্দিকের পার্শ্ববর্তী বাসার মালিকরা যার যার ইচ্ছামতো দখল করেছে পুকুর। কেউ কেউ আবার দোকান তুলে ভাড়াও দিয়েছে।’ রিকশা গ্যারেজের দায়িত্বে থাকা স্বপন বলেন, ‘এখানে ৬০-৭০টি রিকশা আছে।’ কার রিকশা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই রিকশা ও গ্যারেজের মালিক ‘শহিদ চেয়ারম্যান’। শহিদ চেয়ারম্যানের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনে তিনি হাতি মার্কায় নির্বাচন করেছিলেন। তবে তিনি তাঁর মোবাইল নম্বর দিতে রাজি হননি। তিনি আরো বলেন, ‘এই জমিটির মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে, তাই এখানে অস্থায়ীভাবে রিকশা গ্যারেজ করা হয়েছে।’ শহিদ চেয়ারমানের বাড়িতে গেলে বাড়ির দারোয়ান বলেন, ‘চেয়ারম্যান বাড়িতে নেই।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ডিআইটি পুকুরটি দখলমুক্ত ও সংস্কার করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষে মো. জুবায়ের রাজউকের কাছে আবেদন করেছিলেন। এর পর প্রায় দুই বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি চিঠিও চালাচালি হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি রাজউক। এদিকে খোদ রাজউকের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই জানেন না এই পুকুরের অস্তিত্ব। অভিযোগ আছে, রাজউকের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নতুন কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করা যাচ্ছে না।

বিষয়টি জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসির আহম্মদ ভূঁইয়া বলেন, ‘পুকুরটি রাজউকের। তাদেরই এটা সংস্কার করতে হবে। চার পাড়ের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। তবে আমি যতটুকু জানি, এর মালিকানা নিয়ে সমস্যা আছে। এখন আমি চাই, যারই হোক—একটা সমাধান প্রয়োজন। যাতে এর একটি বিহিত হয়।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ‘পুকুরটির ব্যাপারে আমি আসার পর খবর নিয়েছি। এটি সংস্কার করার জন্য আমরা একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করব। তবে এর আগে মালিকানার বিষয়টি সমাধান করতে হবে। ওই এলাকার পুকুরটি বিনোদনকেন্দ্র কিংবা ব্যবহার উপযোগী করার চিন্তা আমাদের আছে।’ মালিকানা ঠিক হওয়ার আগে কেন পুকুর ভরাট করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ওখানকার স্থানীয় লোকজন হয়তো করে থাকবে। তবে এই জায়গার যেহেতু এখনো মালিকানা নির্ধারণ হয়নি, তাই এটি ব্যবহার করা ঠিক হবে না।’


মন্তব্য