kalerkantho


অদম্য মানসিকতাই এনে দিয়েছে তানিয়ার সফলতা

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন তানিয়া ওয়াহাব। ১০টা-৫টার একঘেয়েমির চাকরিতে তাঁর সায় ছিল না। চেয়েছেন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে, চ্যালেঞ্জ নিতে। সেই বাসনা থেকেই শুরু করেন চামড়াশিল্প নিয়ে কাজ। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প জানাচ্ছেন ফরিদা শেলী

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অদম্য মানসিকতাই এনে দিয়েছে তানিয়ার সফলতা

‘আমি আমার কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিই। প্রতিদিন একই রকম কাজ করতে গিয়ে কোনো একঘেয়েমি আমাকে পেয়ে বসুক, সেটা চাইনি। আর দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে অফিস করাও একঘেয়েমি লাগে আমার কাছে। আমি সব সময় মনে করতাম আলাদা কিছু করব। চাইতাম প্রতিদিন নতুন কিছু করব। সেই চিন্তা থেকেই ব্যবসায় আসা।’ নিজের ব্যবসা শুরুর কথা এভাবেই বললেন তানিয়া ওয়াহাব। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় চামড়া শিল্প নিয়ে কাজ করা একমাত্র নারী উদ্যোক্তা। পরিচালনা করছেন দুটি প্রতিষ্ঠান। তার একটি অনলাইন গিফটশপ ট্যান-এর স্বত্বাধিকারী তিনি।

চামড়াশিল্প ও তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘ধার্মিক পরিবারের মেয়ে হয়ে আমি ব্যবসা করব, মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে—এটা কেউ মেনে নিতে পারছিল না। তখন হাজারীবাগের স্থানীয় মানুষজনও চিন্তা করতে পারেনি একটা মেয়ে এখানে দোকান নিয়ে ব্যবসা করবে। কারণ হাজারীবাগে এর আগে কোনো মেয়ে ব্যবসায়ী ছিল না। চামড়াশিল্পে তো নেই-ই। তাই দোকান পেতেও সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু পরে দোকানের মালিক আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।’

তানিয়া পড়াশোনা করেছেন লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে। সে সময় থেকেই টুকটাক ব্যবসা শুরু করেন। আর যেহেতু নিজের পড়াশোনার বিষয়ই লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, তাই সেখান থেকে চামড়াজাত পণ্য নিয়ে ভাবনার কথা মাথায় আসে তাঁর। পরিবারের কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে না থাকলেও নিজের মনোবল নিয়ে কাজ শুরু করেন ২০০৫ সালে। তখন হাজারীবাগ এলাকায় কোনো মেয়ে ব্যবসায়ী ছিল না। অনেক সংগ্রাম করে এখানে তিনি নিজের জায়গা করে নেন। এরপর ধীরে ধীরে পূরণ হতে থাকে তাঁর স্বপ্ন। মানুষের কটূক্তি, অসহযোগিতাসহ নানা প্রতিকূলতা তাঁকে দমাতে পারেনি। নিজের সৎসাহস আর মনোবলই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এখন তাঁর পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে কানাডা, সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তানিয়া শুরু করেছিলেন করপোরেট উপহার সরবরাহ দিয়ে। পরে সেটা শুধু চামড়ার পণ্যে সীমাবদ্ধ না হয়ে কৃত্রিম চামড়া, পাট, কাপড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ডায়েরির মলাট, কনফারেন্সব্যাগ, ওয়ালেটসহ নানা রকম উপহারপণ্যে রূপ নেয়। দেশজ পণ্যে তাঁর ভালোবাসা বরাবরের।

তানিয়ার কারখানায় চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরা

তানিয়া ওয়াহাব বলেন, ‘নতুন উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যবসায়ী পরিবারের না হলে পরিবারের সমর্থন পায় না। মূলধনের একটা অভাব তো থাকেই। তা ছাড়া নতুন ও সৃজনশীল কাজের জন্য অনেক সময় যথাযথ প্রযুক্তির অভাবে সেটি করা হয়ে ওঠে না। অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।’ একটা সময় তিনিও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। এ ছাড়া প্রাথমিক অবস্থায় নতুন কাজের সুযোগ পাওয়া কম কষ্টের ব্যাপার নয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞতা তো কম নেই। তবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে চামড়াজাত দ্রব্য সরবরাহের কাজ পেতে আমাকে দুই বছর ঘুরতে হয়েছে। দিনের পর দিন তাদের অফিসে বসে থাকতে হয়েছে। কিন্তু শেষমেশ কাজটি পেয়েছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল, যত কষ্টই হোক আমাকে কাজটি পেতে হবে। এখন আমি বেসিক ব্যাংক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কাজ করি। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর ব্যাগ তৈরি করি। সেটা চামড়া বা পাটের হতে পারে।

ব্যবসার প্রথম দিকে একটু বেশিই ধকল পোহাতে হয়। আমি যখন ঠিক করলাম চামড়াশিল্প নিয়ে কাজ করব, তখন চামড়াজাত পণ্য তৈরির কারখানাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতাম। কোথায় কাঁচামাল পাওয়া যায় সেটাও নিজে গিয়ে দেখতাম। ছেলেরাও যেসব জায়গায় কখনো যাবে না, মেয়ে হয়ে আমি সেসব জায়গায়ও গেছি। আমার ব্যবসার সব কাগজপত্র আমি নিজে করেছি। কারো ওপর যেন নির্ভরশীল হতে না হয় সেই চেষ্টা করেছি। তা ছাড়া নিজের টাকার প্রতি মায়াও ছিল।’

তাঁর ব্যবসার শুরুর মূলধন জোগানোর সংগ্রামী গল্পটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিউশনির জমানো ১০ হাজার টাকা দিয়ে হাজারীবাগে শুরু করি ‘এথিনি’ নামে একটি ১০০ বর্গফুটের দোকান কাম ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি মানে একটি সিঙ্গার সেলাই মেশিনকে এদিক-ওদিক করে লেদারের জন্য উপযোগী করা। তখনো গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়নি। চামড়ার জ্যাকেট, জুতা, মানিব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি কখনো নিজে আবার কখনো কাউকে দিয়ে বানিয়ে নেওয়া।’

একপর্যায়ে তানিয়া শুরু করেন নানা রকম ব্যাগের ডিজাইনের কাজ। তারপর দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোয় সেগুলো সরবরাহ করা হয়। এখন দেশের খ্যাতনামা অনেক ফ্যাশন হাউসে তাঁর পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। সে সময়ই অনলাইন শপ ট্যান প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তানিয়া জানান, ‘দেশ ও বিদেশে ব্যাগ ও জুতার নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করা এবং কারখানাকে আরো আধুনিক করে তোলা।’ নিজের কাজকে ভালোবেসেই এগিয়ে যেতে চান তিনি।

২০০৮ সালে ইতালির বিখ্যাত ডিজাইনার বারবারা গার্দুসি ঢাকায় এসে প্রায় ছয় মাস অবস্থান করেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিংয়ের একটি প্রকল্পে। ১১ জন ডিজাইনারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ তানিয়ারও সুযোগ হয় বারবারার সঙ্গে কাজ করার ও শেখার। এরই মধ্যে লেদারশিল্পে নিজেই একটা উদাহরণ হয়ে গেছেন তানিয়া। শুরু করলেন অন্যদের পথ দেখানো। ব্যাগ আর জুতার ডিজাইনার হিসেবে আরো এগিয়ে যেতে পারবেন এবং তাদের কাজের মাধ্যমে একসময় করপোরেট গিফট আইটেমের বাজারটা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের দখলে আসবে, গুণে ও মানে।

২০০৮ সালে পেয়েছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের সেরা এসএমই নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার। ২০১১ সালে পেয়েছেন এফবিসিসিআইয়ের সেরা এসএমই নারী উদ্যোক্তা। ২০১৩ সালে ডেইলি স্টার-ডিএইচএলের আউটস্ট্যান্ডিং ওম্যান ইন বিজনেস পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি

বলেন, ‘এই পুরস্কারগুলো আমাকে আমার পথচলার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’


মন্তব্য