kalerkantho


বেড়িবাঁধের পরিবেশ নষ্ট করছে ময়লা-আবর্জনা

কবীর আলমগীর   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বেড়িবাঁধের পরিবেশ নষ্ট করছে ময়লা-আবর্জনা

সরেজমিনে গিয়ে দেখা হলো গাবতলী-বাবুবাজার রোডে সুনিবিড় হাউজিং বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা। এখানে রাস্তার পাশে নিয়ম না মেনে বানানো হয়েছে ময়লা ফেলার ভাগাড়। প্রতিদিনই সুনিবিড় হাউজিংয়ের ময়লা এসে জমা হয় সেখানে। বেওয়ারিশ কুকুর এ ময়লার স্তূপে দাপিয়ে বেড়ায়। মাঝেমধ্যে ময়লা পলিথিন নিয়ে দৌড়ে চলে আসে রাস্তায়। একটা অস্বস্তিকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের এ সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে হাজারো মানুষ।

ফেলে যাওয়া ময়লা-আবর্জনায় নষ্ট হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। শুধু তা-ই নয়, সেই ময়লা-আবর্জনা সরাসরি গিয়ে পড়ছে তুরাগ নদের ভেতর (গাবতলী অংশ)। ময়লা-আবর্জনার কারণে ওই সড়ক দিয়ে চলাচল দায় হয়ে পড়েছে, দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারীদের, আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের।

ক্রমেই ময়লা ফেলায় ভরে যাচ্ছে নদ। ময়লায় আটকে যাচ্ছে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি। পয়োবর্জ্য, তরকারির খোসা, অব্যবহৃত পানির বোতল, অব্যবহৃত কাচের বোতলসহ নানা ধরনের ময়লা ফেলা হচ্ছে এই নদের ভেতর। ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি বেড়িবাঁধ ও নদের পরিবেশ নষ্ট করছে রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ ভাঙ্গারির দোকান। এসব ভাঙ্গারি দোকানের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে রাস্তায়। কোথাও কোথাও পড়ে থাকে ভাঙা কাচের টুকরা। অনেকটা দখলকারী মনোভাব নিয়েই বসানো হয়েছে এসব ভাঙ্গারি দোকান। নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার জন্য রাস্তার পাশে বসানো হয়েছে বাঁশ-টিনের তৈরি দোকানঘরও।

এ রকম একটি ভাঙ্গারি দোকানে কাজ করছিলেন প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক নারী। ভাঙ্গারি দোকানে কাজ করতে করতে তিনি হাতুড়ি দিয়ে টুকরো করছিলেন কাচের বাতিল বোতলগুলো। এরপর সেটি একটি ছোট ঝুড়িতে নিয়ে ফেলে এলেন রাস্তার ধারে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাচের টুকরার স্তূপ দেখা গেল আরো কয়েক জায়গায়। এভাবে অপ্রয়োজনীয় ভাঙ্গারি রাখার কারণ জানতে চাইলে খোদেজা নামে ওই নারী বলেন, ‘কী করব, এগুলো কোনো কাজে লাগবে না, তাই রাস্তার পাশেই রাখি। কোনো একসময় মাটির নিচে এগুলো চাপা পড়বে কিংবা নদে পড়বে।’

ভাঙ্গারির দোকান যেখানে বসিয়েছেন সেটি তো নদের জায়গা—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটি মালিক জানে। কার জায়গায় দোকান হয়েছে মালিক বলতে পারে। আমি তো এখানে কাজ করি।’ মালিকের মোবাইল নম্বর আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না নেই।’ পাশের দোকানে গিয়ে কথা হয় অপর ভাঙ্গারি দোকান মালিক মো. লিটনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে ব্যবসা করছি। তবে সরকারি লোকজন এসে মাঝেমধ্যে তুলে দেয়। বছরে দুবার এ রকম হয়। গাবতলী থেকে বাবুবাজার পুরো রাস্তার কোথাও না কোথাও এ রকম দোকানপাট আপনি পাবেন। শুধু তো আমাদের একার দোষ না।’ এ রকমভাবে তো পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে? উত্তরে লিটন বলেন, ‘কী করব, দোকানভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালানোর সামর্থ্য নেই, তাই এখানে দোকান দিয়েছি। আমরা তো গরিব মানুষ।’

পরিত্যক্ত ময়লা-আবর্জনার বিষয়ে লোকমান নামে স্থানীয় এক ট্রাকচালক বলেন, ‘এখানে যত ময়লা সব ভাঙ্গারির আর হাউজিংয়ের। হাউজিংয়ের লোকজন নিজেদের ইচ্ছামতো এই ময়লা ফেলছে। সিটি করপোরেশনের ট্রাক এসেও সব ময়লা নিতে পারে না। ফলে দিনের পর দিন এখানে ময়লা পড়ে থাকে।’

যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার বিষয়ে সুনিবিড় হাউজিং সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যে ময়লা ফেলানো হচ্ছে তা সাময়িক। সিটি করপোরেশনের ট্রাক এসে ময়লাগুলো সাভারে নিয়ে যায়।’ নদের অংশে ময়লা ফেলা হচ্ছে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খেয়াল করব। যারা ময়লা ফেলে তাদের আরো দায়িত্বশীল হতে বলব।’

স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত স্থানীয় কয়েকজন নেতা এখানে ভাঙ্গারির দোকান বসিয়েছেন। এ ছাড়া হাউজিং থেকে ময়লা ফেলে এখানকার পরিবেশ দূষিত করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও অপ্রয়োজনীয় ভাঙ্গারির অংশ রাখা হচ্ছে তা তুরাগ নদের অংশ। টঙ্গী থেকে তুরাগ নদ গাবতলী এলাকা হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। বেড়িবাঁধের অংশটি হলো তুরাগ নদের প্রবাহমুখ। যেটি কিছুদূর গিয়ে মিশেছে বুড়িগঙ্গায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনা ফেলে রেখে বেড়িবাঁধ এলাকায় তুরাগ নদের প্রবাহমুখ প্রায় বন্ধ করে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া নদের অংশটি এখন পরিণত হয়েছে খালে। তিরতির করে শুধু বয়ে যাচ্ছে পানি, তার সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে ময়লার প্যাকেট, পলিথিনের টুকরো।

মো. বিল্লাল নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘আমরা এই এলাকায় বেশ কয়েক বছর ধরে আছি। চোখের সামনে এগুলো দেখলেও কিছু বলি না। কিছু বললেই মানুষের শত্রু হতে হয়। যেচে কে ঝামেলায় জড়াতে চায় বলুন।’ এ বিষয়ে সুনিবিড় হাউজিংয়ের মুদি দোকানি মো. রাশেদ বলেন, ‘এভাবে ময়লা ফেলে নদ ও এলাকার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। দেখছেন না, দোকান বসিয়ে সরকারি জায়গা দখল করা হচ্ছে। কয়েক দিন পর ইটের গাঁথুনি তুলে বলবে, এই জায়গা আমাদের।’ তিনি আরো বলেন, একসময় এ নদে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বছরপাঁচেক আগেও এখানে কেউ কেউ নৌকায় এসে মাছ শিকার করে যেত। কিন্তু ময়লা ফেলার কারণে নদের পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়েছে। এই নদে এখন মাছের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’ রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি সরানো দরকার। ময়লার দুর্গন্ধে থাকা যায় না।’



মন্তব্য