kalerkantho


অনেক কিছুতেই প্রথম তিনি

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অনেক কিছুতেই প্রথম তিনি

ছবি : শুভ্র কান্তি দাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী ডিন নির্বাচিত হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। বাংলাদেশের প্রথম নারী তথ্য কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এই কীর্তিমান নারীকে নিয়ে লিখেছেন স্বপ্নীল আর্য

 

বাবা ফজলুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। বাবার স্বপ্ন সত্যি করে পড়াশোনা শেষে সাদেকা হালিম শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। দেশের প্রথম নারী তথ্য কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন সফলভাবে। ১৯৭০ সালে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ প্রতিষ্ঠার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম নারী ডিন হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষদের ডিন হিসেবে দ্বিতীয় নারী তিনি। তাঁর আগে শুধু বিজ্ঞান অনুষদে একজন নারী ডিন নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

ভারপ্রাপ্ত থেকে নির্বাচিত

গত বছরের ১৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নিবার্চিত হয়েছিলেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি অবসরে যাওয়ার পর ২ জুলাই অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন করা হয় টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়াকে। তাঁর মেয়াদ শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত ডিনের দায়িত্ব পান অধ্যাপক সাদেকা হালিম। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনের আড়াই মাসের মাথায় শিক্ষকদের ভোটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নির্বাচিত হলেন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। নির্বাচনে নীল দলের প্রার্থী ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাদা দলের প্রার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারীকে হারিয়ে ডিন নির্বাচিত হন তিনি। এই অনুষদে ২৩৮ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২২২ জন শিক্ষক। এর মধ্যে ১২৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন সাদেকা হালিম।

 

শিক্ষক পরিবার

অধ্যাপক সাদেকা হালিমের মা-বাবা দুজনই শিক্ষক। বাবা অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। মা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। সাদেকা হালিমের তিন বোন, সবাই আছেন শিক্ষকতা পেশায়। একমাত্র ছোট ভাই ব্যাংকার হলেও তাঁর স্ত্রী শিক্ষক। তাঁর পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী ইউনিয়নে। সাদেকা হালিম ১৯৭৮ সালে ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন প্রথম বিভাগ পেয়ে। ১৯৮০ সালে হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতেও প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন। ১৯৮৩-৮৪ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। ১৯৮৮ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিজ বিভাগে। পরবর্তী সময় কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিতে। সেখান থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি নেন তিনি। এরপর কমনওয়েলথ স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে পোস্ট-ডক্টরেট করেন যুক্তরাজ্যের বাথ ইউনিভার্সিটি থেকে।

 

প্রথম নারী তথ্য কমিশনার

ড. সাদেকা হালিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করছেন প্রায় তিন দশক ধরে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য কমিশনে প্রথম নারী তথ্য কমিশনার পদে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম নাজমুল করিম গোল্ড মেডেলিস্ট সাদেকা হালিম ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিন মেয়াদে শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও তিনবার সিনেট সদস্য ছিলেন। এবারও শিক্ষক সমিতির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অধ্যাপক সাদেকা হালিম জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি ২০০৯-এর ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের কমিটিতে অন্যতম সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে সাদেকা হালিম অতিথি অধ্যাপক হিসেবে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার বকু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ বিভাগ ও আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হায়ার এডুকেশন লিংক প্রগ্রামের অধীনে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন কিছু দিন। বাংলাদেশ সোশিওলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইমেন ফর উইমেনের নির্বাহী সদস্য তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর লেখা প্রায় ৫০টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। লিঙ্গ-সমতা, বন ও ভূমি, উন্নয়ন, আদিবাসী ইস্যু, মানবাধিকার এবং তথ্য অধিকার প্রভৃতি তাঁর গবেষণার বিষয়। ডিএফআইডি, ইউএনডিপি, অক্সফাম, নোরাড, আইএফডি, এসডিসি, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউএসএইড প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থায় গবেষণা ও পরামর্শকের কাজ করেছেন। এ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি ও ফাও-এর জেন্ডার পলিসিতে কাজ করেছেন।

 

কাজপাগল একজন শিক্ষক

পরিশ্রম, একাগ্রতা, সময়নিষ্ঠ সাদেকা হালিমকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে সাফল্য এনে দিয়েছে। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে একের পর এক প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে পৌঁছেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায়। বাবার শিক্ষকতা, মায়ের শিক্ষকতা—এসবই সব সময় আদর্শ হিসেবে কাজ করেছিল তাঁর। একে একে স্কলারশিপ পাওয়া, পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করা, শিক্ষক হিসেবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই যোগদান করা—স্বপ্নগুলো যেন এক এক করে অনেকটাই পূরণ হয়ে গেছে সাদেকা হালিমের। তিনি বলেন, ‘আমি সহজে সব কিছু পেয়েছি, ভাবা ঠিক হবে না। আমার পেছনে আমার পরিবার, সঠিক পরিবেশ ছিল বলেই এতটা পথ আসা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সমাজ নারীদের এখনো সেকেন্ড পারসন হিসেবে দেখে। নারীরা যোগ্য হলেও উচ্চতর পদে যেতে তাঁদের পেরোতে হয় পাহাড়সম বাধা। নানা অন্তরায়, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই এ পর্যায়ে এসেছি। আমি আমার অর্জনকে দেখি নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক দিক হিসেবে।’

 

নিত্যজীবন

নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস। এ ছাড়াও অবসরে গান শুনতে আর বাইরে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন তিনি। পড়াশোনা ও নানা কাজে অনেক দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে সাদেকা হালিমের। তবে ভালোলাগার দিক দিয়ে বাংলাদেশের পর পরই ভারতকে এগিয়ে রাখেন এই নারী। ‘ভারতের পরতে পরতে ইতিহাস। আর এটা সত্যি যে ইতিহাস কথা বলে। ভারতে ঘুরতে তাই সবচেয়ে ভালো লাগে আমার’—তিনি বলেন। প্রচুর টেলিভিশন দেখেন, ভালোবাসেন আড্ডা দিতে। গানের ব্যাপারে সব সময় রবীন্দ্রসংগীতকেই এগিয়ে রাখেন তিনি। চেষ্টা করেন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার। এত ব্যস্ততার মাঝে কি পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ হয়? ‘শিক্ষক বা গবেষকদের জীবনে ঘর আর বাইর বলতে পৃথক কিছু নেই। দুটিই একসঙ্গে চলে। আমার ঘরজুড়ে লাইব্রেরি। বাইরে গিয়ে যেমন কাজ করি, তেমনি ঘরে বসেও কাজ করি। বিশেষ করে আমার গবেষণা তো সেখানেই পূর্ণতা পায়। তাই পরিবারকেও অনেকটাই সময় দিতে পারি।’ একমাত্র সন্তান সামির রহমান আইন বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে কাজ করছেন একটি বেসরকারি সংস্থায়।

 

স্বপ্ন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ গড়ার

দেশের জন্য কিছু করতে চান সাদেকা হালিম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণ আর দেশের জন্য কাজ করতে চাই। আদিবাসী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী—এ ব্যাপারগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন থাকবে। সবাই ক্ষমতায়িত হবে।’



মন্তব্য