kalerkantho


ইট-কাঠ-পাথরের পাঁজরে হারিয়ে যাচ্ছে আমার ঢাকা

জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ। জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর এই ঢাকায়ই। ঢাকার যাপিত জীবনের অতীত-বর্তমানের নানা বিষয় নিয়ে বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইট-কাঠ-পাথরের পাঁজরে হারিয়ে যাচ্ছে আমার ঢাকা

জন্ম ঢাকার সিএমএইচে। বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সে সুবাধে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্টে ছিল তাঁদের বাস। ঢাকায় যাপিত জীবনে শৈশবের অনেক কিছুই মিস করেন। তিনি বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্ট আগে অনেক নিরিবিলি সবুজের ছায়াঘেরা এলাকা ছিল। এখনো কিছুটা তার ছোঁয়া পাওয়া যাবে। আমাদের কোয়ার্টারের সামনে যে জায়গাটা ছিল, সেখানে আমরা গাছ লাগাতাম। শাকসবজির চাষ করতাম। এখন যদি ওই জায়গাগুলোতে যাই, অনেক তফাতই চোখে পড়ে। আমাদের বাসার পাশে অনেক বড় একটা লেক ছিল। লেকের পাশেই বাগান ছিল—কামরাঙা, আমলকী, আম, পেয়ারা, জলপাইসহ নানা ধরনের ফলের গাছ ছিল। এখন দেখি, লেকের ওই বাগান কেটে বিশাল একটি ইমারত গড়ে উঠেছে।’

তবে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে শৈশবে ঘোরাঘুরিটা একটু কমই হয়েছে তাঁর। সে হিসেবে ঢাকাটা কেমন ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে মৌসুমী বলেন, ‘রাস্তাঘাটে গাড়ি কম ছিল, আজকের মতো এত অসহ্য জ্যাম ছিল না। রাজধানীজুড়ে এত ঘিঞ্জি ইমারত ছিল না। এখন তো ঢাকা কংক্রিটের শহর। ইট-কাঠ ও পাথরের পাঁজরে হারিয়ে যাচ্ছে আমার শৈশবের সেই ঢাকা। আমাদের ছোটবেলায় রমনা পার্কের বেশ নাম ছিল। ওখানে পিকনিক করতে যেতাম। ঘুরতে যেতাম। শহরজুড়ে একটু খোলামেলা পরিবেশ ছিল। সেটি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। খাবারের মধ্যে আব্বু মিরপুর থেকে শিক কাবাব নিয়ে আসতেন। কোন দোকান থেকে সেটি ঠিক জানি না। কিন্তু সেই কাবাবের কথা আজও ভুলতে পারি না। এখন অনেক রেস্টুরেন্ট হয়েছে। সেই কাবাবের মতো টেস্ট পাই না।’

সেই ঢাকা আর আজকের ঢাকার মধ্যে পার্থক্য কী? ‘একটি চিত্র কল্পনা করা যাক, আপনার অফিস উত্তরা, আপনি থাকেন কাঁটাবন। আপনার অফিসে সকাল ৮টার দিকে রিপোর্ট করতে হয়। তাই আপনি সকাল ৭টার দিকে বের হলেন এবং সাড়ে ৭টার মধ্যে অফিসে প্রবেশ করলেন। এরপর কাজ শুরু করলেন। এখন আপনি বলবেন, এই শহরে এটা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। ঢাকায় বসবাস করে এত সহজভাবে জীবন যাপন করা অসম্ভব। বাস্তবজীবনের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’

উন্নতির জোয়ারে ভাসছে গোটা বিশ্ব! সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তি, সেই সঙ্গে মানুষের জীবনেও আসছে পরিবর্তনের জোয়ার। সে মোতাবেক ঢাকা কি যথাযথভাবে আগাচ্ছে বলে মনে করেন? ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বর্তমান চেহারা অনেক দুর্বিষহ। যানজট যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। ফুটপাতের দোকান, রাস্তায় ময়লা, ভাঙা রাস্তা, পরিবেশ দূষণ, নিয়ম ভঙ্গ—সব কিছু মিলিয়ে ঢাকা বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে একটি বলে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক যেকোনো শহরে সড়ক থাকে ২৫ শতাংশ, কিন্তু বাংলাদেশের মহানগরী ঢাকায় রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ, তা-ও বেশির ভাগ ফুটপাত হকারদের দখলে, যত্রতত্র পার্কিংয়ের দখলে। তাহলে ঢাকার লোকজন চলবে কী করে? এর জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে তার বিকল্প নেই। আমরা যখন দেশের বাইরে বিভিন্ন উন্নত শহরে যাই, সেখানে নিত্যনতুন পরিবর্তন চোখে পড়ে। কর্তৃক্ষের সদিচ্ছা থাকলে ঢাকাকেও কিন্তু সেভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব।’

প্রিয় শহর ঢাকাকে নিয়ে তিনি অনেক বেশি আশাবাদী। তাঁর মতে, ‘বিশ্বের কোনো শহরই এক দিনে নির্মাণ হয়নি। সময়ের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয় শহর, জাতি। জনসংখ্যাও এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমেরিকা, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো কম সময়ে সাজানো সম্ভব হয়েছে তাদের কম জনসংখ্যার কারণে। সে তুলনায় আমাদের রাজধানী ঢাকার চিত্র পুরো ভিন্ন। ঢাকার মতিঝিলে যত মানুষ রয়েছে, মালদ্বীপ, ভুটানেও মনে হয় তত মানুষ নেই। কোন পত্রিকায় যেন এমন একটি রিপোর্ট দেখলাম। ঢাকার লোক সার্কের অনেক দেশের থেকে বেশি। এর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক ঢাকাকেই সারা বাংলাদেশের ভরসা করে রাখা যাবে না। তাতে ক্রমাগত ভিড় বাড়তেই থাকবে। একটা সময় ঢাকা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। এর জন্য ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। অর্থাৎ মানুষের গন্তব্যের কেন্দ্রগুলো ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া।’


মন্তব্য