kalerkantho


ক্যামেরার ইশারায় চলবে ঢাকার গাড়ি

কবীর আলমগীর   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ক্যামেরার ইশারায় চলবে ঢাকার গাড়ি

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকার পরও তা না মানার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। ধরা যাক, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেই কোনো গাড়ি ছুটে গেল তার গন্তব্যে। কিংবা কোনো বেপরোয়া গাড়ি সড়কে একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিল ছুট। এসব হরহামেশাই ঘটা অপরাধ ঠেকাতে ঢাকায় আসছে নতুন প্রযুক্তি। ক্যামেরার চোখে থাকবে পুরো শহর। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হবে পুরো ট্রাফিকব্যবস্থা। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

কমবে যানজট

এ বছর জুলাইয়ে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। তীব্র যানজটের সময় গাড়ির আগে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর কাছে অপরিচিত নয়। যানজটের পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। যানবাহনের পরিমাণ যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। যেখানে মানুষের হাঁটার গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। এমন পরিস্থিতিতে ক্যামেরা ট্রাফিকিংব্যবস্থা যানজট নিরসনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

 

ক্যামেরা হবে ট্রাফিক সার্জেন্ট

পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) গাজী মোজাম্মেল হক বলেন, সারা পৃথিবীতে সিটিটিভি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল অর্ডার ও কন্ট্রোলের জন্য উচ্চমানের ক্যামেরা বসানো হবে, যা অনেক দূর থেকে চিত্র ধারণ করতে পারবে। পাশাপাশি ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাংগেলে ভিডিও ধারণ করতে পারবে। ক্যামেরাগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য ট্রাফিক কন্ট্রোলরুমে পাঠিয়ে দেবে। এরপর কন্ট্রোলরুম সেই তথ্য অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনগুলোকে শনাক্ত করা যাবে। সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি উঠবে ক্যামেরায়। কোনো গাড়ি যদি আইন লঙ্ঘন করে অন্য পথে চলেও যায়, তাহলে ক্যামেরার সামনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল দেবে। এ থেকে ওই অপরাধী গাড়িটির বিরুদ্ধে সহজেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের প্রকল্প ডেভেলপমেন্ট অব ঢাকা সিটি ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের তদারক কর্মকর্তা গাজী মোজাম্মেল হক। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি গাড়িকে ট্রাফিক সিগন্যালের মার্জিন বরাবর অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে কোনো গাড়ি যদি মার্জিন অতিক্রম করে, তাহলে সেই গাড়ির ছবি তুলে রাখবে ক্যামেরা এবং তা কন্ট্রোলরুমে পাঠিয়ে দেবে। ওই গাড়ির মালিক ও মালিকের ঠিকানাও বিআরটিএর মাধ্যমে আমাদের হাতে আসবে। আমরা মামলা দিলে ওই ঠিকানায় কাগজ যাবে। এখন তো ট্রাফিক সার্জেন্টরা মামলা দেন। একজন ট্রাফিক সার্জেন্টকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে নানা বিষয় সামলাতে হয়। স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা পদ্ধতি থাকলে ট্রাফিক সার্জেন্টদের পেশাগত চাপ অনেক কমে আসবে।’

 

জানা যাবে কোন রাস্তায় কত গাড়ি

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিকব্যবস্থা কার্যকর হলে ক্যামেরা জানিয়ে দেবে কোন সড়কে কত গাড়ি পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে। কোন সড়কে গাড়ির সারি কতক্ষণ অপেক্ষায় আছে তা-ও ক্যামেরার রেকর্ডে জানা যাবে। এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক গাজী মোজাম্মেল হক বলেন, ‘একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বা কোনো ট্রাফিক সদস্য যখন দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভব না কোন সড়কে কত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তখন ক্যামেরাই বলে দেবে কোন রুটের গাড়ি ছাড়া দরকার। ক্যামেরা নির্দিষ্ট সময় পর পর সিগন্যাল দেবে।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ট্রাফিকব্যবস্থায় এরই মধ্যে প্রসিকিউশন-ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখন ঘরে বসেই মামলা-জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যায়। মানুষের সুবিধা চিন্তা করেই এবার পুরো ট্রাফিকব্যবস্থাই সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের আধুনিক ট্রাফিকব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

 

প্রকল্পের আদ্যোপান্ত

প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী ২০১৫ সালে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু করে পুলিশ প্রশাসন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য এরপর আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হয়। দরপত্রে ১৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও চীনের হুয়াজিন নামের এক প্রতিষ্ঠান যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি এক বছর জরিপ করার পর যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তার আলোকেই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন মোড় ও সড়কে মোট ১৬ হাজার ক্যামেরা বসানো হবে। ক্যামেরাগুলো পর্যবেক্ষণ বা মনিটর করা হবে আবদুল গনি রোডের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে। আবদুল গনি রোডের এই নিয়ন্ত্রণকক্ষকে চারতলা থেকে ১৫তলা করা হবে। প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ছাড়াও রাজধানীর ৪৯টি থানাসহ ৭০টি স্থানে ছোট আকারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকবে। এসব নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে স্থাপন করা সব ক্যামেরার দৃশ্য দেখা যাবে। এই ক্যামেরা মানুষ ও বস্তুর চেহারা শনাক্ত করতে পারবে। ক্যামেরা দিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও গাড়ির ভুয়া নম্বর প্লেটও শনাক্ত করা যাবে। যোগাযোগের জন্য থাকবে ফোর-জি মডেলের ওয়াকিটকি। এতে অডিও-ভিডিও তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে। এই প্রকল্পে দেড় হাজার জনবল লাগবে, এর মধ্যে ১০৭ জন থাকবেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। পুরো প্রকল্পটি হবে প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে। এ ব্যয় সংকুলান হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট থেকে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা।

 

রয়েছে নানা শঙ্কাও

ঢাকায় ই-ট্রাফিক সিস্টেম চালু হলে তাতে নানা সমস্যার শঙ্কা করেছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ঢাকার মোহাম্মদপুর-মতিঝিল রুটে চলাচলকারী রাজা সিটি বাসের চালক আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘ক্যামেরা যে ছবি তুলবে সেটার ওপর নির্ভর করে মামলা দেওয়া হবে। ট্রাফিক পুলিশ যখন থাকে তখন অনেক সময় তাঁকে বুঝিয়ে জরিমানা বা মামলা থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু এ ব্যবস্থায় হয়রানি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’ ঢাকার শ্যামলী-আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী ভুঁইয়া পরিবহনের মালিকদের একজন মো. বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাইলে অবশ্য ট্রাফিকব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করার বিকল্প নেই। তবে আমাদের ঢাকা শহরের বেশির ভাগ চালকই অশিক্ষিত। তাঁরা আইন-কানুম, নিয়ম-শৃঙ্খলা তেমন জানেন না। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হলে আগে চালকদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।’


মন্তব্য