kalerkantho


ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড

নিরাপত্তাহীনতা ও বেদখল ফুটপাতে বাড়ছে ভোগান্তি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন মতিঝিল, দিলকুশা, ফকিরাপুল ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু বলে খ্যাত। এ এলাকায় রয়েছে একাধিক ব্যাংক-বীমার প্রধান ও করপোরেট শাখা। রয়েছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নানা দপ্তরও। বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিপরীতে রয়েছে বেশ কিছু সমস্যাও। সরেজমিনে গিয়ে ওয়ার্ডটি ঘুরে সবিস্তারে জানাচ্ছেন কবীর আলমগীর

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিরাপত্তাহীনতা ও বেদখল ফুটপাতে বাড়ছে ভোগান্তি

ছবি : শেখ হাসান

কয়েক দিন আগে সকালে কমলাপুর থেকে রিকশায় স্বামীবাগের বাসায় যাচ্ছিলেন লিপিকা রানী। রিকশাটি মতিঝিল এলে প্রাইভেট কার আরোহী কয়েকজন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি। এরপর হাতে থাকা ব্যাগটি ছোঁ মেরে ছিনতাইকারীরা নিয়ে যায়। ব্যাগ টান দেওয়ার সময় তিনি রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে আহতও হন। ওই ব্যাগে ১০ হাজার টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) ছিল। শুধু লিপিকা রানী নন, মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় প্রায় তাঁর মতো অনেককেই ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে হয়। বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় সকাল ৮টার আগে এই এলাকা তেমন জমজমাট হয়ে ওঠে না। আবার সন্ধ্যা হতে না-হতেই এলাকা ফাঁকা হতে শুরু করে। এই সুযোগ নিয়ে থাকে ছিনতাইকারী কিংবা দুর্বৃত্তরা। সুযোগ বুঝেই তাঁকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে তারা। এমন তথ্য জানালেন ৭২ মতিঝিল এলাকার চা দোকানি আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকার নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ নেই। বেশির ভাগ জায়গাই অনিরাপদ থেকে যায়। আর সেই সুযোগে ছিনতাইকারীরা সহজেই তাদের কাজ করতে পারে।’ ফকিরাপুল এলাকার ছাপাখানার মালিক শিকদার ইয়াসিন বলেন, ‘দু-এক দিন পরপরই শোনা যায় এখানে ছিনতাই হয়েছে, ওখানে ছিনতাই হয়েছে। কিংবা গুলি করে কারো টাকা নিয়ে গেছে। বছরের পর বছর এ রকম হচ্ছে, কিন্তু সমাধান নেই।’ মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক এ বিষয়ে বলেন, ‘ওই এলাকায় বিটভিত্তিক পুলিশের টহল থাকে। কোনো অঘটন যাতে না ঘটে এ জন্য পুলিশ সব সময়ই সতর্ক। যারা ছিনতাই বা অন্য কোনো সমস্যা করে, তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েই মূলত এটা করে। ছিনতাইয়ের সমস্যা তো সারা ঢাকায়ই। কোনো অভিযোগ এলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

 

অবৈধ পার্কিংয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত এই এলাকায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে প্রাইভেট কারের দখলে চলে যায় জনসাধারণের চলাচলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও ফুটপাত। সে সময় জনসাধারণের চলাচলও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। মতিঝিলে প্রতিদিনই অফিসে আসেন কৃষি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি গাড়ি সমানতালে পার্কিং হয়। ইচ্ছামতো যে যেখানে পারে গাড়ি রাখে, কোনো শৃঙ্খলা নেই।’ অবৈধ পার্কিংয়ের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘কেবল পুলিশ কিংবা ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে অবৈধ পার্কিং নিরসন সম্ভব নয়। মতিঝিল-দিলকুশা-ফকিরাপুল অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, সেখানে গাড়ির চাপ অন্য এলাকার চেয়ে তুলনামূলক বেশি। যেসব পার্কিং এরিয়া আছে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি যাঁরা পার্কিং করছেন তাঁদের সচেতন থাকতে হবে, যাতে জনভোগান্তি না হয়।’

৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেশির ভাগ রাস্তার ফুটপাতই থাকে এমনিভাবে হকারদের দখলে

হকারদের দখলে ফুটপাত

দিনের বেলা ফকিরাপুল, দিলকুশা, মতিঝিলের প্রায় সব ফুটপাতই থাকে হকারদের দখলে। বহুকাল থেকেই হরেক রকম পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে ঢাকার ফুটপাতগুলো। কোথাও কোথাও ফুটপাত থেকে রাস্তা অবধি ছড়িয়ে পড়ে এসব অস্থায়ী দোকান। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে ডান দিকে রামকৃষ্ণ মিশনের রাস্তায় যেতে চোখে পড়বে রাস্তার দুই পাশে বসানো নতুন-পুরনো জুতা-স্যান্ডেলের দোকান। এভাবেই দখল করে রাখা হয়েছে মতিঝিল, দিলকুশা, ফকিরাপুলের সব ফুটপাত। দিলকুশায় জুতার ব্যবসা করেন মুন্সীগঞ্জের রাসেল। তিনি বলেন, ‘সাত বছর ধইরা ব্যবসা করি। আগের দোকানদারের কাছ থাইকা এই পজিশন ২০ হাজার টাকায় কিনছি। আর দিন শেষে লাইনম্যানরে টাকা দিই। লাইনম্যান ঠিক থাকলে কোনো সমস্যা হয় না।’ অন্যদিকে রাস্তার দুই পাশের দোকানের সামনের ফুটপাতও দোকানিদের কেউ কেউ মালামাল বিক্রির জন্য রাখেন। ফকিরাপুল কালভার্ট রোডের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস আলী বলেন, ‘ফুটপাত তো জনসাধারণের চলাচলের জন্য। কিন্তু ঢাকা শহরের বেশির ভাগ ফুটপাতই দেখবেন চলাচলের অনুপযোগী। ছোট-বড় নানা দোকানে ভরা ফুটপাতগুলো। বছরের পর বছর চোখের সামনে এসব কারবার চলে। মনে হয় এসব দেখার কেউ নেই!’

রাস্তাজুড়ে বসানো হয়েছে অবৈধ কাঁচাবাজার

রাস্তা দখল করে কাঁচাবাজার

সরেজমিনে গিয়ে দেখলাম দিলকুশার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ভবন। ঠিক এই ভবনের সামনেই বসে কাঁচাবাজার। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের সমারোহ। তবে এই বাজারের কারণে দিলকুশা সড়কে যানচলাচলে বিঘ্ন ঘটে বলে জানায় ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া বাজারের ময়লা-আবর্জনা, নোংরা পানিতে নষ্ট হয় আশপাশের পরিবেশ। কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা জুরাইনের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘অফিস শেষে চাকরিজীবীরা এখান থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে ঘরের পথে যাত্রা করেন। সারা দিনই বাজার থাকে। তবে সন্ধ্যার পর বাজার উঠে যায়।’ বাজারের অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে এ বিষয়ে আরেক দোকানি আরিফুল হক বলেন, ‘না, যতদূর জানি এই বাজারের কোনো অনুমোদন নেই। তবে লোকজনের প্রয়োজন বলেই তো বাজার বসেছে। আমরা মিলেমিশে বাজার চালাচ্ছি।’ বাজারের কারণে লোকজনের দুর্ভোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা জায়গা রেখে দিয়েছি। রাস্তার একপাশ দিয়ে গাড়ি ঠিকমতো যেতে পারে!’

 

টেবিল বসিয়ে খাবার হোটেল

সরেজমিনে গিয়ে দেখলাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের রাস্তা। এই রাস্তাটি সোজা মিলেছে ফকিরাপুল কালভার্ট রোড এলাকায়। রাস্তাটি রিকশা চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও রাস্তার অর্ধেক জায়গাজুড়ে বসানো হয়েছে ভাতের হোটেল। এ রাস্তায়ই অন্তত ৩০টি খাবার হোটেল রয়েছে। হোটেল ব্যবসায়ী মালেক গাজী বলেন, ‘ফকিরাপুল, মতিঝিল, দিলকুশা এলাকায় এ রকম ২০০ হোটেল আছে। সবাই রাস্তায়ই হোটেল বসিয়েছে।’ মেয়র সাঈদ খোকন এ হোটেলগুলো উদ্বোধন করেন বলেও জানান তিনি। রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই রাস্তায় রিকশা চলাচল কম। তা ছাড়া সিটি করপোরেশন আমাদের পারমিশন দিয়েছে।’ ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘পথে ব্যবসা করার জন্য সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্সও দিয়েছে।’ বলাকা ভবন, কৃষি ব্যাংক ভবন, রূপালী ব্যাংক ভবনের পাশের ফুটপাতজুড়ে এসব ভাতের হোটেল জমজমাট থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি।

 

অনেক কিছুরই অভাব

বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এই ওয়ার্ডে জনবসতি কম। সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, এখানে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তবে এই লক্ষাধিক মানুষের জন্য নেই সরকারি কোনো কাঁচাবাজার, কমিউনিটি সেন্টার, ব্যায়ামাগার, পার্ক ও খেলার মাঠ। মতিঝিলে মোহামেডান ও ভিক্টোরিয়া ক্লাব থাকলেও সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এ ছাড়া রয়েছে মশার উপদ্রব, ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ। মাঝেমধ্যে গ্যাস সংকটও থাকে এ এলাকায়। গ্যাস সংকটের বিষয়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মেস ম্যানেজার নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘গ্যাস-পানির সংকটে মাঝেমধ্যেই পড়তে হয়। এই সমস্যাটা অনেক দিন ধইরাই।’ গরম পানির গলির বাসিন্দা ইয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৫ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ওয়ার্ডে একটি আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ। নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’ কিউট গলির বাসিন্দা স্থানীয় ছাপাখানার মালিক রিয়াজ খন্দকার বলেন, ‘আমাদের এখানে স্থায়ী কোনো বাজার নেই। এতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। তা ছাড়া মহল্লার দোকান থেকে কেনাকাটা করতে হলে অনেক সময় খরচও বেশি হয়। স্থায়ী কোনো বাজার না থাকায় গজিয়ে উঠছে ছোট ছোট বাজার-দোকানপাট। এতে অনেক সময় ময়লা-আবর্জনাও ছড়িয়ে পড়ে।’

 

দাবি খেলার মাঠের

শুক্রবার সকালে মতিঝিলের দিলকুশা রোডে দেখা যায় ব্যাট ও বল নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন কিশোর ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত। এগিয়ে গিয়ে কথা হয় বল কিপার সুজনের সঙ্গে। সে বলে, ‘ছুটির দিনে বাসা থেকে আমরা বেরিয়ে পড়ি। রাস্তা ফাঁকা থাকে বলেই এখানে এক দিনের জন্য ক্রিকেট খেলে সময় কাটাই।’ আরামবাগের বাসিন্দা ইদ্রিস মৃধা বলেন, ‘আগে খেলাধুলা করার জন্য আরামবাগ বালুর মাঠ ছিল। ওখানে মহল্লার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করত। এই মাঠটি এখন ফুটবল ফেডারেশনের অধীনে।’ এ বিষয়ে ফকিরাপুল পানির ট্যাংক এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। ছুটির দিনে তাদের কোথাও খেলাধুলা করার জন্য পাঠাব, সে উপায়ও নেই। মাঠ নেই, তারা খেলবে কোথায়?’ পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক না থাকায় এলাকাবাসী হাঁটাচলা, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় স্থান পায় না। খেলার মাঠ না থাকায় খেলাধুলা ও সামাজিকীকরণের সুযোগ কমে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খেলাধুলা ও নির্মল বিনোদনের সুযোগ থাকলে এই পরিস্থিতি তৈরির প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।’

 

আমি নামমাত্র জনপ্রতিনিধি আমার কোনো ক্ষমতা নেই

এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ

ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর

অনেক আশা নিয়ে জনগণ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। এ জন্য জনগণের কাছে আমি ঋণী। তবে আমি নামমাত্র জনপ্রতিনিধি। সত্যিকার অর্থে আমার কোনো ক্ষমতা নেই। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম, তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। ভেবেছিলাম নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আমার হাতেই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়েছি। আমার আসলে কিছুই করার নেই। আমার তো কোনো ক্ষমতা নেই, সব ক্ষমতা মেয়রের দপ্তরের। আমার কাজ হলো বসে বসে সার্টিফিকেট দেওয়া। একাধিকবার জনগণের পক্ষে দাবিদাওয়া দিয়েছি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়রের দপ্তরে নোট দিয়েছি। কিন্তু আমার নোট মেয়র দেখেন না। আমি অনেক সময় নিজের টাকা খরচ করে ছোটখাটো উন্নয়নকাজ করেছি। শতাধিক ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করেছি। বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়াই-ফাই সুবিধা দিয়েছি। কিন্তু এখন আর পারছি না। এলাকার রাস্তাঘাট দখল হচ্ছে, ফুটপাত দখল হচ্ছে। স্থানীয় কিছু নেতাকে সুবিধা দিতে গিয়ে মেয়র এ জনদুর্ভোগ ডেকে আনছেন। আমি নিজেও কয়েকবার উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু আবারও বসেছে। যেখানে রাস্তা দখল করে বসানো ফুটপাতের হোটেল মেয়র নিজে এসে উদ্বোধন করেন, সেখানে আর কিছুই বলার নেই।


মন্তব্য