kalerkantho


হারিয়ে যাচ্ছে শিং দরিয়ার অস্তিত্ব্ব

মো. হারুন অর রশিদ   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হারিয়ে যাচ্ছে শিং দরিয়ার অস্তিত্ব্ব

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা ছড়িয়ে আছে দেশের আনাচে-কানাচে।

কিন্তু কালের পরিক্রমায় অযত্ন, অবহেলা আর দখল-দূষণের কারণে বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে। আর যে কয়টা এখনো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে, তা-ও নিশ্চিহ্নের পথে। শিং দরিয়া ওই সব খাল-বিল, নদ-নদীর মতো তেমনই একটি খাল। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাপুরে এই খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। খালটি নারায়ণগঞ্জের পাগলা-ফতুল্লা দিয়ে বুড়িগঙ্গার একটি শাখা ‘সিন্ধু নদী’ নাম ধারণ করে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, কলাতিয়া, রুহিতপুর হয়ে আবার বুড়িগঙ্গায় মিলেছে। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আজকের এই সরু খালটি পঞ্চাশের দশকেও ছিল খরস্রোতা।  

স্থানীয় বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব শহর আলী বলেন, ‘এটি খাল নয়, এটি শিং নদী। এর বিশালতা ছিল অনেক। এই নদীকে একসময় অনেকে ‘সিন্ধু নদী’ বলেও ডাকত।

তবে এর বিশালতা ও খরস্রোত এত বেশি ছিল যে এক পার থেকে অন্য পার দেখা যেত না। এই কারণে শিং দরিয়া নামে পরিচিতি পায়! আজও শিং দরিয়া নামেই সবাই চেনে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘দখলের কারণে এটি আজ ক্রমেই সরু খালে পরিণত হয়েছে। আমার বয়স যখন ১০-১২ বছর, তখনো এর প্রবাহ দেখেছি। আমি নিজেও এই নদী দিয়ে নৌকায় চলাচল করেছি। আমার চোখের সামনেই এটি একটি মরা খালে পরিণত হয়েছে। ’

প্রায় ৮০ বছর বয়সী আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রমিজ আলী বলেন, ‘আমি নারায়ণগঞ্জের জুটমিলে চাকরি করতাম। আমি স্পিডবোটে চলাচল করতাম এই নদী দিয়ে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাবার মুখে শুনেছি, একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় বিদেশি জাহাজ চলাচল করত। এই দেশে ব্যবসা করতে আসা বিদেশি বণিকদের বড় বড় বাণিজ্য নৌকা ও জাহাজ এই নদী দিয়েই যাতায়াত করত। এই নদীর প্রশস্ততা ও খরস্রোতের কারণে বিদেশি বণিকরা এটিকে সিন্ধু নদের সঙ্গে তুলনা করে ‘সিন্ধু নদী’ নামেও ডাকতেন। কিন্তু আজ দখল আর কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। খালটিতে এই এলাকার যাবতীয় আবর্জনা ফেলার কারণে গভীরতাও কমে গেছে। যথাশিগগির যদি এই খাল সংস্কার না করা হয়, তবে একসময় এর বাকি অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া বলেন, “আমি এই নদীর প্রবাহ দেখি নাই। তবে আমার বাপ-চাচারা এই খাল নিয়ে প্রায়ই গল্প করতেন। তাঁরা এই নদীতে নৌকা নিয়ে মাছ মারতেন। এর খরস্রোতের কারণে ভয়ে বেশি দূর যেতে পারতেন না। আমার বাবা বলতেন, ‘আমি বিয়ে করে তোর মাকে নৌকা করে এই নদী দিয়েই আসছিলাম, হঠাৎ করে আকাশে মেঘ করে জোরে বাতাস বইতে থাকে। নৌকায় আমরা আটজনের মতো ছিলাম। নদীতে ঝড় ওঠায় নৌকা কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বলতে পারব না। তোর মাকে নিয়ে কোনো রকম আমার নৌকার মাঝি নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে আমাদের প্রাণে রক্ষা করে। ’ আমার বাবা তাঁর অতীত স্মৃতি বলতেন আর আফসোস করতেন। সেই খরস্রোতা শিং দরিয়া আজ সরু খালে পরিণত হয়েছে। আমার বাবা আজ বেঁচে নেই। তবে তাঁর বলা গল্প আমার আজও মনে পড়ে এই খালটির দিকে তাকালে। ” স্থানীয় বাসিন্দা আবু রাসেল মিয়া বলেন, ‘ভূমিদস্যুদের দখলের কারণে খালটি তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ’ এই ভূমি দখলদার কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই দখল তো আজ হয়নি। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সেই দলের নেতারা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতার বলে দখল করে আসছেন। আবদুল্লাপুরের কাঁচাবাজার, মার্কেটসহ পুরো এলাকাই এই খালের বুকের ওপর। অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সাহায্যে এই জায়গার কাগজপত্র তৈরি করে আজ ভোগ করছেন। যেমন বজলু মার্কেটসহ এখানে আরো সাত-আটটি মার্কেট আছে, সবই দখল করে করা হয়েছে। ’ কথা হয় দখলদার বজলু মার্কেটের মালিক হাজি বজলু মিয়ার সঙ্গে। দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এটি পৈতৃক সম্পত্তি। আমার বাবার সূত্রে এই জায়গা পেয়েছি। আমার বাবা এই জায়গা কিনে নিয়েছিলেন। আমার কাছে দলিলপত্র আছে। ’ কার কাছ থেকে কিনেছিল জানতে চাইলে বজলু মিয়া বলেন, ‘আমি জানি না। আপনি চাইলে দলিল দেখাতে পারব। ’ আরেক দখলদার হাজি জিন্নাহ বলেন, ‘এই জায়গা আমার, দলিল আছে। এই জমি ছিল আমার বাবার। ’

এ বিষয়ে আবদুল্লাপুর ইউপি চেয়ারম্যান জজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের মুরব্বিদের কাছে এই নদীর ইতিহাস শুনেছি। যা আজ সরু খালে পরিণত হয়েছে। এই দখল প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য আমি অনেকবার কর্তৃপক্ষের কাছে লেখালেখি করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। খালের দেখভালের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তাদের কর্তব্যের অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে খালের জায়গা। অন্যদিকে এলাকাবাসী অসচেতনতার কারণে ময়লা-আবর্জনা ফেলে খালটি ভরাট করে ফেলছে। ফলে খালে পানির বদলে ঘাসে ভরে গেছে। আর পাড় দখল করে বাড়িঘর, দোকানপাট উঠতে উঠতে খালটি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আমি সাধ্য অনুযায়ী খাল রক্ষা করার চেষ্টা করছি। ’


মন্তব্য