kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

রুপালি পর্দার হাতছানি

সিনেমা হলকে জোসেফ ক্যাম্পবেল বলেছিলেন শিল্পায়িত দুনিয়ার মন্দির। যেখানে একই উদ্দেশ্যে বহুজন একত্র হয়, একটা নিবেদন নিয়ে বহুক্ষণ অপেক্ষা করে, বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে কোনো না কোনোভাবে ভিন্ন কিছুর খোঁজ করে এবং বিনোদিত হয়ে একটা তৃপ্তি নিয়ে বের হতে চায়। সিনেমা হল আবেগের ঐক্য আর ভাগাভাগির জায়গা। আধুনিক নগরীর এক অনিবার্য অনুষঙ্গ

আবুল হাসান রুবেল   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রুপালি পর্দার হাতছানি

১৯৫৪ সালে গুলিস্তান সিনেমা হলে ভিড় করা জনতা

বািড়িতে লুকিয়ে চুরিয়ে হোক আর বলে কয়ে, দল বেঁধে সিনেমা দেখার মজাই আলাদা। নতুন সিনেমা এলে ক্যানভাসাররা একসময় জানিয়ে দিয়ে যেত পাড়াময়।

খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোত। তাতে কোন কোন হলে তা দেখানো হবে তা-ও থাকত অনেক সময়, আবার কখনো শুধু থাকত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে শুভমুক্তি। সিনেমার পোকারা বেশ দেখে দেখে ছক কাটত কোথায় যাওয়া যায়; কিন্তু আমার মতো অপোকা লোকও অনেক সিনেমা দেখে ফেলেছে হলে গিয়ে। সেটা আসলে সিনেমা দেখার সাধারণ সংস্কৃতির কারণেই সম্ভব হয়েছে, অনেকটাই বন্ধুদের হুল্লোড়ের অংশ হওয়ার তাগিদে। একা একা সিনেমা দেখার যুগ তখনো প্রবল হয়নি। আসলে একা একা সিনেমা দেখা আর হলে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা দুটোকে মেলানো কঠিন। অনেক লোক একসঙ্গে হাসছে, কাঁদছে, ভাসছে, হাততালি দিচ্ছে, শিস দিচ্ছে, মাঝেমধ্যে চিৎকার করছে, হেলছে-দুলছে; সব মিলিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অন্য জগতে চলে যাওয়া। আর সেটা সম্ভব আসলে সিনেমা হলে। সিনেমা হলকে জোসেফ ক্যাম্পবেল বলেছিলেন শিল্পায়িত দুনিয়ার মন্দির। যেখানে একই উদ্দেশ্যে বহুজন একত্র হয়, একটা নিবেদন নিয়ে বহুক্ষণ অপেক্ষা করে, বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে কোনো না কোনোভাবে ভিন্ন কিছুর খোঁজ করে এবং বিনোদিত হয়ে একটা তৃপ্তি নিয়ে বের হতে চায়। সিনেমা হল আবেগের ঐক্য আর ভাগাভাগির জায়গা। আধুনিক নগরীর এক অনিবার্য অনুষঙ্গ।

ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই ঢাকা তার জৌলুস হারাতে শুরু করে। বাইরে থেকে আসা লোকেরা ঢাকা ছাড়তে থাকে। ঢাকায় আবারও নাটকীয়ভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটতে থাকে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর। ১৮৮১ সালে ৭৯ হাজার ৭৫ জন, ১৯১১ সালে এসে দাঁড়ায় এক লাখ ২৫ হাজার জন, এরপর বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থেকে দুই লাখ ৩৯ হাজারে দাঁড়ায় ঢাকার জনসংখ্যা। আর এই নতুন করে নগরায়ণের কালেই ঢাকায় সিনেমা হলের আবির্ভাব। ঢাকায় প্রথম সিনেমা হল হয় ১৯১৫ সালে আরমানিটোলায়, নাম ছিল ‘পিকচার হাউস’। তখন ছিল নির্বাক ছবির যুগ। শুরুতে দেখানো হতো মূলত ইংরেজি ছবি। হলটি ছিল এক তলা এবং মহিলাদের বসার জন্য এক কোণে পর্দাবেষ্টিত আলাদা জায়গা ছিল। পরে এই হলের নাম হয় ‘শাবিস্তান’। কিরণশঙ্কর রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, চল্লিশের দশকে ঢাকায় ছিল তিনটি সিনেমা হল। পিকচার প্যালেস তো ছিলই, সঙ্গে যুক্ত হয় সদরঘাটের সিনেমা প্যালেস এবং জনসন রোডে মুকুল সিনেমা। তত দিনে বাংলা ছবিও চলে এসেছে। তাঁর বর্ণনায় মনে পড়ে দেখেছিলাম ‘পাপের পরিণাম’, ‘কৃষ্ণ সুদামা’, ‘দেবদাস’ প্রভৃতি নির্বাক বাংলা ছবি। সিনেমা হলের সামনের দিকে একাধারে পিয়ানো ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য যন্ত্রীরা উপস্থিত থাকতেন এবং গল্পের সিচুয়েশন অনুযায়ী যন্ত্রসংগীত বেজে চলত, যাতে দর্শকের হৃদয় উদ্বেলিত হয়। ইংরেজি ও বাংলা দুই ধরনের সুরই যন্ত্রীদের নখদর্পণে ছিল। তবে কোনো দৃশ্যের সিচুয়েশন অনুযায়ী গৎ বাদ্যযন্ত্র সহযোগে বাজাতে না পারলে সিনেমা হলের দর্শকরা মাঝেমধ্যে চিৎকার করে আপত্তি জানাত। (চল্লিশের দশকের ঢাকা, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও সরদার ফজলুল করিম)

এরপর আসে টকিজের অর্থাৎ সবাক ছবির যুগ। তখনকার যুগে সন্ত্রাসবাদ ও স্বদেশি আন্দোলনের প্রভাবে ঢাকার তরুণদের ওপর সিনেমা দেখায় বেশ বিধিনিষেধ ছিল। (প্রাগুক্ত) এ সময় উঁচু মানের বেশ কিছু বিদেশি ছবি আসে ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে, তুলনায় দেশীয় ছবির মান ছিল বেশ খারাপ। এরপর ঢাকায় দেশীয় ছবির স্বর্ণ যুগ আসে। ঢাকায় প্রথম বাংলা ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ আসে ১৯৫৬ সালে। এরপর তৈরি হয় বেশ কয়েকটি মানসম্মত চলচ্চিত্র। ‘আকাশ আর মাটি’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালের ২৪ জুলাই। এ ছবিতে সুমিতা দেবীর বিপরীতে ছিলেন আমিন ও প্রবীণ কুমার। ‘মাটির পাহাড়’ ছবির পরিচালক ছিলেন। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালের ২৮ আগস্ট। ১৯৬০ সালে ঢাকা থেকে মুক্তি পায় দুটি বাংলা ছায়াছবি। ‘আছিয়া’ ও ‘রাজধানীর বুকে’।

‘আছিয়া’ ছবির পরিচালক ছিলেন ফতেহ লোহানী। ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিটির পরিচালক ছিলেন এহতেশাম। ছবিটি খুব জনপ্রিয় হয়। ছবিটিতে অভিনয় করেন সুভাষ দত্ত। তা ছাড়া এই ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন গোলাম মোস্তফা।

এ বছর ঢাকা থেকে মোট চারটি ছবি মুক্তি পায়। ‘হারানো দিন’, ‘যে নদী মরু পথে’, ‘কখনো আসেনি’, এবং ‘তোমার আমার’। জহির রায়হানের পরিচালনায় একই বছরে মুক্তি পেয়েছিল ‘কখনও আসেনি’। এটাই তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র।

‘তোমার আমার’—পাকিস্তান ফিল্ম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুসারে এই ছবিটিও মুক্তি পায় ১৯৬১ সালে। ছবির পরিচালক ছিলেন মহিউদ্দীন। এটাই আনোয়ার হোসেন অভিনীত প্রথম ছায়াছবি। তিনি খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। মো. আনিস নামে তখনকার এক ফিল্মের সহকারী পরিচালক তাঁকে প্রথম ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সাল ১৯৬২, ঢাকা থেকে এ বছরও মুক্তি পায় আরো চারটি ছবি। ‘জোয়ার এলো’, ‘নতুন সুর’, ‘সোনার কাজল’ ও ‘সূর্যস্নান’।

‘চান্দা’—তেসরা আগস্ট ১৯৬২, দুই ভাই এহতেশাম ও মুস্তাফিজের ছবি ‘চান্দা’ ঢাকা, করাচি ও লাহোরে মুক্তি পায়। করাচির নিশাত সিনেমা হলে ছবিটি সুপার হিট গোল্ডেন জুবিলি সফলতা পায়। ঢাকা থেকে নির্মিত সর্বকালের সেরা মেগা হিট ছবি ‘চকোরি’ (১৯৬৭)। ছবিটির প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজ। সুর ও সংলাপে ছিলেন উর্দুভাষী কবি ও গল্পকার সরুর বরাবনকি।

১৯৬৩ সালে ঢাকা থেকে দুটি ছবি মুক্তি পায়। ‘ধারাপাত’ ও ‘কাঁচের দেওয়াল’। এ সময় সংগীত পরিচালক হিসেবে নাম করেন খান আতাউর রহমান। সাবিনা ইয়াসমিন ছিলেন শিশু শিল্পী। এ সময় নায়ক-নায়িকা হিসেবে নাম করেন রহমান, আনোয়ার, সুমিতা দেবী, শবনম প্রমুখ। এরপর কিছুদিন বাংলাদেশের পরিচালকদের মধ্যে একটা উর্দু ছবি নির্মাণের ঝোঁক লক্ষ করা যায়। তানহা (১৯৬৪), বেহুলা (১৯৬৬), ফির মিলেন্দে হাম দোনো (১৯৬৬), সঙ্গম (উর্দু ১৯৬৪), বাহানা (উর্দু ১৯৬৫) ইত্যাদি ছবি নির্মিত হয় সে সময়। ছবি নির্মাণের সময়কাল থেকে অনুমান করা যায়, সে সময় ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি দেশপ্রেম হয়তো এ দেশীয় চলচ্চিত্রকারদেরও ছুঁয়ে গিয়েছিল। তবে দ্রুতই তাঁরা বাংলায় ফিরে এসেছিলেন এবং অধিকতর গ্রামবাংলা-ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোযোগী হয়েছিলেন।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)


মন্তব্য