kalerkantho


দূষণ, দখল ও ভরাটের কবলে ঝিলটি

জাহিদুল ইসলাম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দূষণ, দখল ও ভরাটের কবলে ঝিলটি

চারদিকে ফেলে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। ঝিলের দক্ষিণ প্রান্তে পানির ওপর জন্মেছে কচুরিপানা।

উত্তর পাশের অংশে নেমেছে নোংরা ড্রেনেজ। আর পশ্চিম পাশে ধীরে ধীরে ছোট ছোট স্থাপনার মাধ্যমে দখলের কবলে যাচ্ছে মতিঝিলের মূল ভূখণ্ড। ঝিলের আবদ্ধ পানি থেকে ছড়াচ্ছে অসহ্য দুর্গন্ধ। এসব মুখ বুজে সহ্য করেই নৌকায় পারাপার হচ্ছে কর্মব্যস্ত মানুষগুলো।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝিলের উভয় পাশে ময়লার স্তূপ। ঝিলের মধ্যে আছে ড্রেনেজ লাইন আর বদ্ধ পানিতে এসব ময়লা-আবর্জনা পচে সৃষ্টি করছে দূষণ। এভাবে দখল-দূষণ আর ভরাটের কবলে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে ঝিলটি। মতিঝিলের বর্তমান উভয় প্রান্তের দূরত্ব ৬০ গজের একটু বেশি, যা যুক্ত করেছে আরামবাগ, কমলাপুর ও মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকাকে। এ ঝিলের পানিতে চলাচল কিংবা পাশে থাকায় দুষ্কর হয়ে গেছে পানির দুর্গন্ধের কারণে।

তবু কর্মব্যস্ত মানুষ সময় বাঁচাতে মতিঝিলে নৌকায় পার হচ্ছেন। পারাপারের জন্য ঘাটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে আরো ১০-১২ জন। নৌকার মাঝি একপাশ থেকে লোক নিয়ে অপর পারে রেখে আসছেন। ঝিলের পশ্চিম পারে মতিঝিল, অন্য পারে দক্ষিণ কমলাপুরের দেওয়ানবাগের রওজা শরিফ।

কথা হয় আরামবাগে বসবাসকারী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আব্দুল কাদিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই মতিঝিলে আসা-যাওয়া করতে হয়। এদিক দিয়ে না এলে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়। তখন সময় বেশি লেগে যায়। সময় বাঁচাতেই এই পথ ধরে যাতায়াত করি। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে, এই খেয়াঘাটের বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর। আগে এটি অনেক বড় ছিল, এখন চারদিকে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি, দোকান করার কারণে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ’

নৌকায় পারাপাররত মতিঝিল কম্পিউটার মার্কেটের ব্যবসায়ী রেজাউন রাব্বী জানালেন, তাঁর বাসা আরামবাগে। তিনি প্রতিদিন এই পথেই যাতায়াত করেন। এই পথে যদি একটি সাঁকো নির্মাণ করা যেত তাহলে মানুষজন উপকৃত হতো। এই পথে না এলে প্রায় এক কিলোমিটার পথ ঘুরে শাপলা চত্বর হয়ে আসতে হয়। অথচ এখানে সাঁকো নির্মিত হলে তা হবে মাত্র ১৫০ গজ। একই দাবি করলেন নৌকায় পারাপারকারী যাত্রী নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল।

বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত আশিক ইকবাল বলেন, ‘ঝিলটি যেভাবে দূষিত আর দখল হচ্ছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটি বেশি দিন আর জীবিত থাকবে না। ’ ঝিলের নৌকায় পারাপার করছেন ষাটোর্ধ্ব নান্টু মাঝি। তিনি এখানে সেই কিশোর বয়স থেকেই মাঝির কাজ করে আসছেন বলে জানালেন। তিনি দিনে ৩০০-৪০০ টাকা ইনকাম করেন। এই আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলে। ঝিলের পূর্ব ঘাটে একটি ছোট ঘরে বসে নৌকা পারাপারের ভাড়া আদায় করছেন আমির হোসেন। তিনি জানালেন, এখানে প্রায় ২২ জন মাঝি চারটি নৌকায় বিভিন্ন সময়ে পারাপারের কাজ করে থাকেন। যাঁরা পারাপার করান তাঁদের প্রতিজন দিনে ৪০০ টাকার মতো আয় করতে পারেন। এই জায়গাটির মালিক কে জানতে চাইলে তিনি একটি সাইনবোর্ড দেখিয়ে দেন। সাইনবোর্ড অনুযায়ী ঝিলের ১.৫২ একর জমির মালিক পরীবানু, যারা এখানকার স্থানীয়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জমির মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পরীবানুর মধ্যে বিরোধ আছে, যার ফলে এই ঝিলটি কেউ ভরাট করতে কিংবা এখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারছে না। আর এই সুযোগে আস্তে আস্তে উভয় পারে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিনের ঘর। ধীরে ধীরে ভরাট করা হচ্ছে ঝিলের উভয় পাশ।

ঝিলের ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কমন সার্ভিস’ বিভাগের একজন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বলেন, ‘ঝিলের মালিকানা নিয়ে একটু ঝামেলা আছে। তা ছাড়া এ জায়গাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হওয়ায় এখানে যাতে কোনো ধরনের অবৈধ্য ও অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে না ওঠে সেটা দেখতে হবে। আপাতত বিষয়টি ঝুলে আছে, তবে শিগগিরই এর সমাধান হবে। ’

তবে এ জায়গাটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে পিডাব্লিউডি ডিভিশন-১ (সরকার পক্ষ)-এর সঙ্গেও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে ওই জমিতে সরকারপক্ষকে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ঝিলের মালিকানা নিয়ে জানতে চাইলে ঝিলে মালিকপক্ষের লোক আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা যদিও মালিকের কাছ থেকে প্রতিবছর এ ঘাটটি নিলামের মাধ্যমে নিয়ে থাকি। তবে এর মালিকানা এখন পরীবানু গংদের দখলে। এর কারণ আদালত থেকে তাদের এ সম্পত্তিকে বৈধ করা হয়েছে। তাদের জমির সিট নং ২২, খতিয়ান নং ৪৩০০ (ছ) সিএস দাগ নং ৩৭২। ’ 

ঝিলের ওপর সাঁঁকো নির্মাণের জন্য স্থানীয় অনেকেরই দাবি। মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে প্রায় ১০০ গজ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫০ গজ কিংবা পূবালী ব্যাংকের বৈদেশিক শাখা থেকে মাত্র ২০ গজ দূরত্বে অবস্থিত এ ঝিলটিতে সাঁকো নির্মাণের দাবি অনেক দিনের। এখানে একটি সাঁকো নির্মিত হলে হাজার হাজার মানুষ নির্বিঘ্নে পারাপার হতে পারে, যা প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার দূরত্ব কমিয়ে দেবে। তা ছাড়া এখানকার নৌকা ছোট হওয়ায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনায় পড়তে হয় পারাপারকারীকে। এমনও হয়েছে, নৌকায় ১০ জনের বেশি মানুষ উঠলে হঠাৎ মাঝপথে নৌকায় পানি উঠে ডুবে যেতে থাকে, আর সঙ্গে সঙ্গে ভিজে যায় নৌকার সব মানুষ। যদিও পানি কম থাকায় কারো কোনো ক্ষতি হয় না, তবে সেদিন আর অফিসে যাওয়া হয় না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঝিলের ওপর একটি সাঁকো নির্মাণের দাবি করে আসছেন আরামবাগ, কমলাপুরের লক্ষাধিক চাকরিজীবী মানুষ।   

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আট নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার সুলতান মিয়া বলেন, ‘এ জায়গাটিতে একটি সাঁকো বা রাস্তা নির্মাণ করা গেলে ভালো হতো। কিন্তু যেহেতু মালিকানা নিয়ে একটু বিরোধ আছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিডাব্লিউডি এ জমিটির দবিদার, তাই কোনো কিছু করা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। ’


মন্তব্য