kalerkantho


নিজে বাঁচি অন্যকে সহায়তা করি

মো. শফিকুল ইসলাম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিজে বাঁচি অন্যকে সহায়তা করি

ছবি : শুভ্র কান্তি দাশ

জহিরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে একজন পেশাদার গাড়িচালক। প্রায় আট বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন। কৌতূহল নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। সারা দিন কত কিলোমিটার গাড়ি চালান। হিসাব দিতে পারলেন না। জানালেন, বাসাবো থেকে কমলাপুর, সেখান থেকে মতিঝিল, এরপর ধানমণ্ডি হয়ে আবার আগের জায়গায় দিয়ে বাসাবো ফিরি। শব্দদূষণ সম্পর্কে জানেন। মাথা নেড়ে কী বলল তা বোঝা গেল না। প্রশ্ন করলাম এই জায়গাগুলোতে আপনি কত সময় ধরে হর্ন বাজান। তাঁর উত্তর, সারা দিনে কখনো ২০০ বার, আবার কখনো আড়াই শ বার।

কথা হলো আরো দুজন গাড়িচালকের সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্যও অনেকটা একই রকম।

পেশাদার গাড়িচালকরাই যদি দিনে গড়ে ২০০ বার হর্ন বাজান, তাহলে অপেশাদার গাড়িচালকরা কী করছেন? রাজধানীতে কী পরিমাণ শব্দদূষণ হচ্ছে সেটা চিন্তা করেই আঁতকে উঠলাম। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন করপোরেশন বিআরটিএর কাছে তথ্য চেয়ে জানা গেল, সারা দেশে গত নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ২৮ লাখ ৪২ হাজার ৩১৯টি গাড়ি। এর মধ্যে একই সময় ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১০ লাখ ৫০ হাজার ১২৪টি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (রাস্তার তুলনায় গাড়ি চলার হার) রাজধানীর রাস্তায় সর্বোচ্চ দুই লাখ ১৬ হাজার গাড়ি থাকার কথা ছিল। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, ১২ লাখ গাড়ি রাস্তায় চলাচল করছে নিবন্ধনহীন বা অপেশাদার চালকের হাতে। যাঁদের নেই কোনো গাড়ি চালানোর অনুমতি।

ধরে নিলাম গড়ে প্রশিক্ষিত একজন চালক দিনে ২০০ বার হর্ন বাজান। সে হিসাবে মাসে (২৬ দিনে) তিনি হর্ন বাজান, পাঁচ হাজার ২০০ বার। বছরে তিনি হর্ন বাজান ৬২ হাজার ৪০০ বার। শুধু ঢাকা শহরে যদি ১০ লাখ ৫০ হাজার ১২৪টি গাড়ি থাকে এবং সেগুলোর প্রশিক্ষিত চালকরাই এক দিনে হর্ন বাজাচ্ছেন ২১ কোটি ২৪ হাজার ৮০০ বার। মাসে (২৬ দিনে মাস) ৫৪৬০৬৪৪৮০০ বার। আর বছরে ৬৫৫২৭৭৩৭৬০০ বার।

এ বছরের ২০ জুন সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে পরিবেশ অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরেছে। তারা দেখেছে, রাজধানীতে শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ১৩০ ডেসিবল পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। এসব জায়গায় বাস করা মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

শব্দদূষণের জরিপটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ইশতিয়াক আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডলসহ অন্যরা। শব্দদূষণের জন্য তাঁরা প্রথমেই দায়ী করছেন প্রাইভেট কারকে, পরে রয়েছে মোটরসাইকেল ও বাস।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, ৬৫ ডেসিবলের ওপরের শব্দ হৃদরোগ, ৯০ ডেসিবলের ওপরে শব্দ আলসার এবং ১২০ ডেসিবলের বেশি শব্দে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তিহীন করতে পারে। অর্থাৎ বধির হয়ে যেতে পারে।

সেখানে জানানো হয়, জরিপের পরিচালনায় শব্দ পরিমাপ ও হর্ন গণনার জন্য স্থান নির্বাচন এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য দৈবচয়নের মাধ্যমে নমুনা বাছাই করা হয়েছে। এই জরিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ শহরের মোট ২০৬টি স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। শহরগুলোতে নির্ধারিত স্থানে দুটি কর্মদিবস এবং একটি ছুটির দিনে তিনবার এক ঘণ্টা করে পাঁচ মিনিটের বিরতিতে ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ২০০টি আকস্মিক শব্দের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। নির্ধারিত প্রতিটি স্থানেই শব্দের উৎস পর্যবেক্ষণ ও হর্ন গণনা এবং আটটি শহরে মোট ১৮ হাজার ৫৪০ জনের মধ্যে মতামত যাচাই করা হয়। এ ছাড়া ৪১ জন বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি গড় শব্দদূষণ দেখা মিলেছে পল্টন এলাকায়। এখানে সর্বোচ্চ ১৩০ ডেসিবল শব্দ মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৩০ ডেসিবল এলাকা আরো আছে। সেগুলো হলো—মগবাজার মোড়, গাবতলী, ফার্মগেট, হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়, জুরাইনের মাদরাসা সড়ক, ডিআইটি টাউন রোড রামপুরা, নিকুঞ্জ, ধানমণ্ডি, আরামবাগ, উত্তরা জসীমউদ্দীন সড়ক, রায়েরবাজারের মুক্তি সিনেমা হল, মোহাম্মদপুরের তাজমহল সড়ক, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, মিরপুর, কাজীপাড়া, শংকর, শাপলা চত্বর, পল্লবী, নিউ মার্কেট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়, গুলিস্তান মোড়, ইংলিশ সড়ক, বাংলা মোটর, শাজাহানপুর, যাত্রাবাড়ী ও বংশাল। এসব স্থানে শব্দের গড় মাত্রা ১৩০ ডেসিবল। এ ছাড়া আছে গুলশান-১ ও গুলশান-২।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, আকস্মিক তীব্র শব্দ অথবা দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দ-কোলাহলপূর্ণ স্থানে অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিক কিংবা ধীরে ধীরে অন্তঃকর্ণের ক্ষতির কারণে মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। শব্দদূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃৎস্পন্দনে পরিবর্তন, স্মৃতিভ্রম, হৃৎপিণ্ডে ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, আলসার, হৃদরোগ, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা তৈরি করে।

এই যখন অবস্থা। তাহলে কী করা যাবে এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে। গবেষকরা বলছেন, একমাত্র জনসচেতনতাই পারে এ থেকে আমাদের রক্ষা করতে। সরকারি, বেসরকারি, এমনকি সংগঠন বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে শব্দদূষণের ভয়াবহতার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। মাসিক বা বছরজুড়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশসহ সামাজিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। যারা পেশাদার গাড়িচালক তাদের লাইসেন্স দেওয়ার আগেই এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। এরপর আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। তাই সবাই সচেতন হন, নিজে বাঁচেন, অন্যকে বাঁচতে সহায়তা করুন।


মন্তব্য