kalerkantho


ঢাকার অতিথি

ঢাকার রাস্তাগুলো সামাজিকতার বিশাল জায়গা

প্রায় সব কিছুতেই তিনি মুগ্ধ, এমনকি ঢাকার বিরক্তিকর ট্রাফিক জ্যামেও। ঢাকা সফরের অভিজ্ঞতার কথা বললেন নেদারল্যান্ডসের ডলফ ইভেনবার্গ। লিখেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকার রাস্তাগুলো সামাজিকতার বিশাল জায়গা

ডলফ ইভেনবার্গের বয়স ৭০। আগে শিক্ষকতা করতেন আণবিক জীববিজ্ঞান বিষয়ে।

বাড়ি নেদারল্যান্ডসে হলেও তাঁর জন্ম ইন্দোনেশিয়ায়। এখন কাজ করছেন ‘পাম’ নামের একটি সরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে। ওই সংস্থাটি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে। এ সুবাদেই তিনি বাংলাদেশে আসেন। তখন ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকায় নামার পরের অভিজ্ঞতাটা বললেন ইভেনবার্গ, ‘আমস্টারডাম থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু পরে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়েছে। চলে আসি ঢাকায়। ’

ইভেনবার্গ বললেন, ‘খুব সকালে আমি বিমানবন্দরে নামি।

স্যুটকেস সংগ্রহ করতে লাগেজবাহী ফিতার কাছে যাই। কিন্তু অনেক সময় অপেক্ষা করেও সেটা পেলাম না। বন্দরের কর্মকর্তারা সহযোগিতাপূর্ণ ছিলেন। পরে যোগাযোগ করার জন্য তাঁদের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন আমাকে। এর পর বন্দর থেকে বেরিয়ে ঢাকার রাস্তায় পা রাখি। স্যুটকেসে দুটি ল্যাপটপ ও চৌগাছা মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট ফর টেকনোলজির (সিএমআইটি) শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু উপহার ছিল। ওই প্রতিষ্ঠানটিতে এক বছর আগে আমি লেকচার দিয়ে গিয়েছিলাম। ’

লাগেজের পরিণতি কী হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার হোস্ট জাফর তুহিনের চেষ্টায় ওটা ফিরে পেয়েছিলাম। জাফর যখন এই করুণ অবস্থার কথা জানল, তখন থেকেই চেষ্টা-তদবির শুরু করল। পরদিন সকালে তার ফোন পেলাম। জানলাম স্যুটকেস উদ্ধার হয়েছে। দুজনে মিলেই বিমানবন্দর থেকে নিয়ে এলাম। এর পর থেকে জাফরের বেশ ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম আমি। সে দয়ালু ও সহানুভূতিশীল লোক এবং বেশ বন্ধুবৎসল। সে আমাকে যশোর যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে দিল। ’

ঢাকায় ছিলেন কেমন? ‘ভালোই ছিলাম। এই শহরের ট্রাফিক জ্যাম খুব উপভোগ করেছি। বাস থেকে শুরু করে ট্রাক এবং মানুষচালিত রিকশাসহ বিলাসবহুল তিন চাকার যান দেখে আনন্দ পেয়েছি। এদের নিয়েই শহরটা কোলাহলে ভরা। ভেঁপুর অশ্লীল শব্দ, গাড়ির তাচ্ছিল্য গতি আর ধোঁয়া সমান তালে ঘুরপাক খায় ঢাকার বাতাসে। ওদের কাজ ইন্দ্রিয়কে ত্যক্তবিরক্ত করা। তবে ওসবে আমি কিছুই মনে করিনি। চোখ ভরে শহরের ঘিঞ্জি অট্টালিকা আর জ্যামে ভরা রাস্তাগুলো দেখেছি। এক রাস্তায়ই চলছে বেচাবিক্রি, ফুটপাতের ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ চা খাচ্ছে, দল পাকিয়ে গল্পগুজব করছে। আসলে ঢাকার রাস্তাগুলো যেন সামাজিকতার বিশাল এক জায়গা। ’

ইভেনবার্গ আরো বললেন, ‘ঢাকায় আকর্ষণীয় একটা বইমেলা হয়। জাফরের সঙ্গে ওখানে গিয়েছিলাম। তবে আসা-যাওয়ার সময় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খুব ভুগিয়েছিল। ’ আপনার ভোগান্তির তালিকায় আর কী কী আছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে ভোগান্তির কোনো তালিকা নেই আমার। ’ তাহলে যে বললেন ‘ভুগিয়েছিল’! ‘ওটা হলো মুখের কথা। হ্যাঁ, লম্বা সময় ধরে ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকলে তোমার কাছে সেটা ভোগান্তি মনে হতে পারে, আমার কাছে নয়। আমি বরং সময়টাকে উপভোগ করেছি। ওই অবস্থায় লোকজনের প্রতিক্রিয়া দেখেছি। কেউ চুপ করে, মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যরা চেঁচামেচি করছে। এসব আরকি। কিন্তু এমন চরম মুহূর্তেও কাউকে আগ্রাসী ভূমিকায় যেতে দেখিনি। বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই খুব উষ্ণ। খোলা মনের এবং উদার অতিথিপরায়ণ। ’

ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথায় গিয়েছেন? ‘ঢাকায় তিন দিন থাকার পর আমি যশোর চলে যাই। প্রথমে শীতাতপ বাসে যেতে চেয়েছিলাম। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বিমানে যাই। যশোর বিমানবন্দরে এক কর্মকর্তা আমাকে থামিয়েছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর তথ্য ফরম পূরণ করার পর ছাড়া পাই। বাংলাদেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা খুব উচ্চ! বন্দর থেকে বেরিয়েই আমার জন্য অপেক্ষমাণ বন্ধুকে পেয়ে যাই। তাকে নিয়ে সিএনজিতে করে যশোর শহরটা দেখেছি। তার পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়। ওখানে চা-টা খাই। নারিকেলের পানি দিয়ে আমাকে আপ্যায়ন করেছিল ওরা। ’

যশোরে আর কী কী দেখলেন? ‘ওখানে আমার পরিচিতদের বন্ধুবান্ধবের বিশাল লটবহর। তাদের সঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখেছি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অনেকে মিলে রাতের খাবার খাই। চৌগাছায় আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে যাই। ওদের পরিবারের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ সময় কেটেছে। চৌগাছায় সিএমআইটি পরিদর্শন করি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলি। শিক্ষার প্রসারে তাঁর বিশাল পরিকল্পনাগুলো তিনি আমাকে দেখিয়েছেন। তিনি ও তাঁর শিক্ষকদের পরিকল্পনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একদল ছাত্রীর দেখা পেয়েছিলাম, ওরা যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ছে। সবাই বেশ অতিথিকে কদর করতে জানে। ’


মন্তব্য