kalerkantho


নগরে নারী রূপান্তরের চাপ

বাংলাদেশের নগরজীবন ও নারীসমাজ উভয়ই একটা গভীর রূপান্তরের কাল অতিক্রম করছে। ঢাকার রাস্তায় একঝলক তাকিয়ে টের পাওয়া যাবে না বর্তমানে এই নগরটির প্রায় অর্ধেক নারী; বিভিন্ন সূচকে পশ্চাত্পদতা দিয়েও হয়তো বোঝা যাবে না অর্থনীতির রূপান্তর নারীর ভূমিকাকে যেভাবে সামনে ঠেলে দিচ্ছে, তাতে চিরকাল এই অচলায়তন টিকে থাকবে না। রাজধানী ঢাকায় নারীর যাপিত জীবনের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন ফিরোজ আহমেদ

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নগরে নারী রূপান্তরের চাপ

ছবি : লুৎফর রহমান

দৃশ্য সর্বদা বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। যেমন—ঢাকার নারীদের কথাই বলা যাক।

ঢাকার প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা নারী। ভোটারের হিসাব ধরলে উত্তর ঢাকায় তারা প্রায় সমান, দক্ষিণ ঢাকায়ও খুব পিছিয়ে নেই। কিন্তু ঢাকার গণপরিবহন, বাজার, উদ্যান, বিনোদনকেন্দ্র, খেলার মাঠ প্রভৃতি জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি দেখে ঢাকার নারী-পুরুষের এই অনুপাত সম্পর্কে ধারণা নিতে গেলে মারাত্মক ভুল হবে। পোশাক কারখানাগুলোতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা প্রায় সমানে সমান, অন্যান্য কর্মক্ষেত্রগুলোতেও ক্রমবর্ধমান হারে তারা এগিয়ে আসছে—এগুলো খুবই সত্যি। কিন্তু যেখানে তাকে যেতেই হবে—এমন অত্যাবশ্যকীয় জায়গাগুলোর বাইরে আর সব জায়গাতে যদি নারীর সংখ্যাটা মাপার চেষ্টা হয়, পরিসংখ্যান ঢাকার নারীদের সংখ্যা নিয়ে সম্পূর্ণ ভুল তথ্য দেবে।

ঢাকায় সবচেয়ে বেশি নারীদের দৃশ্যমান আকারে মিলবে পোশাকশিল্প এলাকাগুলোতে। সকাল, দুপুর আর সন্ধ্যা বেলা; কর্মস্থলে যাওয়া, খাদ্য বিরতি আর বিকেলে ছুটির সময়টাতে দলবেঁধে তারা রাস্তা দখল করে আছে। গণপরিবহনেও কাজের জায়গায় যাওয়ার বা ফেরার সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি নারীকে দেখা যাবে। রিকশা নামের পরিবহনটিতে তুলনামূলকভাবে তাদের বেশি দেখা যাবে আর সব গণপরিবহনের তুলনায়।

যদিও রিকশার ভাড়া বাসের চেয়ে বেশি। মোটরসাইকেল বা সাইকেল আরোহী নারীর সংখ্যা একজন-দুজন করে বাড়তে থাকলেও পুরুষের তুলনায় তা এখনো নগণ্য। কাঁচাবাজারে তুলনামূলক বেশি উপস্থিতি দেখে বোঝা যায়, এই ক্লান্তিকর কাজটিও তাদের ঘাড়েই চাপে। আর বিপণিবিতানগুলোতে তাদের ভিড় স্মরণ করিয়ে দেয় কার্যত এ নগরে প্রায় কোনো খোলা পরিসর তাদের জন্য কতটা প্রতিকূল। কেনাকাটায় তাদের উপস্থিতি কাজটি না করে তাদের উপায় থাকে না। বিদ্যালয়ের সামনে তাদের বিপুল ভিড় আর অপেক্ষা দেখে মনে হয়, একটা বড় অংশের কাজ কিংবা বিনোদন কিংবা একঘেয়ে অপেক্ষার কথা। খেলার মাঠগুলোতে তারা প্রায় শূন্য। উদ্যানগুলোতে যদিও তাদের সংখ্যা সামান্য কিছুটা বেড়েছে।

দিনে আর রাতে নারীর উপস্থিতির মস্ত যে ফারাকটি ঢাকায় দেখা যাবে, সেটাও তাত্পর্যপূর্ণ। রাত মানেই নারীর অনিরাপদ—এই প্রাচীন ধারণাটির প্রাবল্য ঢাকায় দেখে বোঝা যায় এ নগরটি কতখানি সবার হতে পেরেছে। বিশেষ করে যারা বাস্তুহীন, সড়কের পাশে থাকে, তারা অধিকাংশ গবেষণা, জরিপ ও পরিকল্পনারও আওতার বাইরে থাকে। নাগরিক অস্তিত্বে তাদের গোনারই রীতি নেই।

বস্তুত সব অর্থেই ঢাকা একটি ‘সবলের নগরী’। শেষ বিচারে হয়তো নগরটি কারো জন্যই সম্পূর্ণ উপযোগী নয়, প্রতিটি বাসিন্দাকেই তা অসুস্থ বানায় শরীর ও মন উভয় দিক থেকেই। কিন্তু এই নগররূপী প্রায় আদিম প্রতিযোগিতার মল্লভূমিটিতে তুলনামূলক বেশি টিকে থাকার জটিল হিসাব-নিকাশে কতগুলো শর্ত কাজ করে নিয়ামক হিসেবে, পুরুষ নারীর তুলনায় বহু গুণ স্বাভাবিক থাকতে পারবে এই পরিবেশে, তরুণ বহু গুণ বাড়তি সুবিধা পাবে বৃদ্ধের তুলনায় এবং বিত্তবান বিত্তহীনের তুলনায়। নগরের প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা এ ধরনের সুবিধাগুলোর একটা সাম্য এনে প্রত্যেকের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেন নিরাপত্তা, পরিবহন, দূষণ, বিনোদন এসব ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রতিকূলতাকে অপসারণ করে সবাই যথাসম্ভব নগরজীবনে ভূমিকা রাখতে পারে, নিজের নগরবাসকেও যথাসম্ভব অর্থপূর্ণ করতে পারে। এই বিবেচনায় ঢাকা নগরী এখনো কোনো বাসযোগ্য নগরী নয়। যদিও নারীর জন্য গৃহও নিরাপদ নয়, এ কথাটি অজস্র ঘটনা ও গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ঢাকা শহরে জনপরিসরে নারীর জন্য প্রায়ই আরো অনেক বেশি অস্বস্তি ও অনিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।

গণপরিবহনের বিষয়টিই ধরা যাক। বাসে সংরক্ষিত আসনসংখ্যার চেয়ে বেশি নারীর উপস্থিতি দেখা যাবে ব্যস্ত সময়গুলোতে, যদিও তা মোট যাত্রীর তুলনায় অনেক কম। গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি বাসে নিতান্তই বাধ্য না হলে চলাফেরা কঠিন। এর পরও দেখা যাবে বিপুল পরিমাণ নারী-বৃদ্ধ ও শিশু নিরুপায় দাঁড়িয়ে থাকছে। কেননা প্রতিযোগিতায় নামাটাই তার পক্ষে বহুক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গণপরিবহন ঢাকাবাসী সবার জন্যই এক অভিশাপ, কিন্তু গড়ে একজন নারী একজন পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সময় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সচ্ছল তুলনামূলক বেশি নারীদের দেখা যায় রিকশা ও সিএনজিতে। এভাবে যাতায়াতের জন্য একই শহরে তাদের পুরুষের তুলনায় বহু গুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। গণপরিবহনের এই সূচকের বিবেচনায় ঢাকার নারীরা দুনিয়ার অধিকাংশ নগরী থেকে পিছিয়ে থাকবে। এবং বাসে যৌন হয়রানি আর অন্য বিকল্প পরিবহনের এই বিপুল ব্যয় নারীকে যথাসম্ভব নড়াচড়া না করতেই উৎসাহিত করছে। পরিবহন একটি অন্যতম কারণ, যার ফলে রেস্তোরাঁ-বিনোদনের জায়গা-উদ্যানের মতো জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশ কম।

সুস্থ থাকার জন্য প্রতিটি মানুষেরই খেলাধুলা করা প্রয়োজন। ঢাকা শহরে কিন্তু মাঠ বলতে ছেলেদের মাঠই বোঝানো হয়, নারীদের জন্য একটা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের চেয়ে বেশি কিছু এই নগরীতে নেই। এই বিপুলসংখ্যক নারী, যাদের অনেকেরই নিশ্চয়ই ক্রীড়ায় আগ্রহ আছে, যাদেরও স্বাস্থ্য রক্ষা প্রয়োজন, তাদের জন্য কোনো বন্দোবস্ত নেই এবং কর্তৃপক্ষের আয়োজনে কখনো এই বিবেচনাটি থেকেছে বলে মনে করার কোনো উপায়ও নেই। তুলনামূলকভাবে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোতেও এই অভাব একই রকম দেখা যাবে। খেলার অভাব ব্যায়ামে পূরণ বড় অংশের কাছেই একঘেয়ে ঠেকবে; কিন্তু সচ্ছলতর অংশের সেটুকুই ভরসা। ঢাকার নগরপরিকল্পনার পুরুষালি চোখে এই সমস্যার তেমন কোনো তাত্পর্য নেই। কিন্তু খেলার সুযোগ না থাকা অনেক পরের বিষয়, স্বাভাবিকভাবে তো একজন নারী প্রাতর্ভ্রমণ বা হাঁটাচলা করতেই যথাসম্ভব অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কেননা নিরাপত্তাভীতি বাদ দিলেও যে বিপুল পরিমাণ কৌতূহলী কৌতুকের চোখ তাকে ঘিরে রাখে, তা অতিক্রম করা বহু মানুষের পক্ষে কঠিন।

শ্রমজীবী পরিবারগুলোতে গ্রাম ও শহর-নির্বিশেষে নারীদের কর্মব্যস্ততা পুরুষের তুলনায় বেশ বেশি—বহু জরিপেই তা জানা। মধ্যবিত্ত কোনো কোনো পরিবারে এর ব্যতিক্রম দেখা যাবে। তবে চাকরিজীবী পরিবারগুলোতে বাস্তবতা একই। একই নারীকে শিশুপালন, রান্নাবান্না, ধোয়ামোছাসহ গেরস্থালি সামলাতে হয়, চাকরিও করতে হয়। সচ্ছল পরিবারগুলোতে গার্হস্থ্য সহকারীরা এটা করে, যারা নিজেরাও ছুটিহীন, বিনোদনহীন; প্রায়ই নানা নির্যাতনের শিকার নারী। শিশুপালনসহ এই কাজগুলোকে সহজ করে দেওয়ার যে নানা নাগরিক আয়োজন থাকে, সেগুলোর বড় অংশই ঢাকা শহরে এখনো অনুপস্থিত। এদের মাঝে বড় বড় বিষয় হতে পারত শিশুর দিবাযত্ন কেন্দ্র। কর্মজীবী মায়েদের জন্য একটা বড় আশ্রয় হতে পারত এই কেন্দ্রগুলো। এমনকি আরো বহু নারীকে কর্মজীবী হতে উৎসাহ জোগাতে, সব নারীর বিনোদনের পরিমাণটাকেও বাড়াতে দিবাযত্ন কেন্দ্র বিশাল ভূমিকা রাখতে পারত।

অন্ধকারাচ্ছন্নতাও ঢাকা নগরীতে নারীর নিরাপত্তাহীনতাকে বহু এলাকায়, গলিতে কিংবা রাজপথে অনিরাপদ করে। আলো নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরাধী ও শিকার উভয়ের মনস্তত্ত্বেই এর প্রভাব বিশাল। প্রকাশ্য দিবালোকে হয়রানি ও নিপীড়ন অজস্র হয় বটে, অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় এর প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধী সাহসী হয়ে ওঠে। কারণ তার চেহারা দেখা যায় না, অন্ধকারের কারণে আক্রান্তের পক্ষে আগে থেকে প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব হয় না। দেখা যাবে তাই নারীরা অন্ধকার গলিগুলো এড়িয়ে যেতে স্বস্তি পায়। এই নগরীর বিপণিবিতানগুলো আলোঝলমলে, পাশের গলি কিংবা মোড়টি হয়তো অন্ধকারে ঢাকা।  

এ সব কিছু মিলেই ঢাকার যে অধিকাংশ মুহূর্তের আলোকচিত্র নিয়ে গড় করলে অর্ধেক ঢাকাবাসী নারীর উপস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ আভাস পাওয়া যাবে না। এই অদৃশ্যমানতার পেছনে প্রকাশ্য ও নীরব উভয় ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাস ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই অদৃশ্যমানতা ও অনুপস্থিতি অন্যদিকে যারা বাইরে আসছে কিংবা আসতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের প্রতি নিপীড়নমূলক পরিবেশটাকে আরো পাকাপোক্তই করছে। নিপীড়ক ও নিপীড়নের সমর্থক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাতেও প্রলম্বির করছে এই অনুপস্থিতি। আর সব মেয়ে যখন চার দেয়ালের ভেতর, এরা কেন বাইরে—এ প্রশ্নটি যতবার উচ্চারিত হয়ে নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে, তার চেয়ে বেশিবার অনুচ্চারিত থেকেই নারীকে নিরুৎসাহিত করে। এ যেন এক দুষ্টচক্র।

আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশনএইড পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে বাংলাদেশের যথেষ্ট খারাপ একটি চিত্রই পাওয়া গেছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার হার উচ্চ। নগরে নারীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো নয়। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা, আইনের বাস্তবায়ন না হওয়া, জেন্ডারবান্ধব নগর-পরিকল্পনার অভাব, নারী ও মেয়েশিশুর জন্য সীমিত এবং অনিরাপদ গণপরিবহনব্যবস্থার কারণেই বাংলাদেশ অন্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে।

নগরে নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক ‘কার শহর?’ শীর্ষক গবেষণায় ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। ‘এ’ থেকে ‘ডি’ গ্রেডের মধ্যে বাংলাদেশ আছে ‘ডি’ গ্রেডে। বাংলাদেশে মোট স্কোর ৩৯ দশমিক ৩২। নগর-পরিকল্পনায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়ে বাংলাদেশের স্কোর ০। নারীর প্রতি সহিংসতা ও মোকাবেলার দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, কঙ্গো, জর্ডান, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়ের চেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।

অ্যাকশন এইডের এই গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের ৫৪ শতাংশের বেশি নারী নানাভাবে সহিংসতার শিকার। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫ শতাংশ নারীর মতে, অভিযুক্তকে নয়; বরং পুলিশ অভিযোগকারীকেই দোষারোপ করে। পরিস্থিতি এই হলে কেন তারা নিপীড়নের ঘটনায় মামলা করে উলটো হয়রাানির শিকার হতে চাইবে? আরো আছে, ৫৭ শতাংশ নারী ধরেই নেয়, তাদের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে না। এ কারণেই তারা মামলা করার বা ব্যবস্থা নেওয়ার উৎসাহও হারিয়ে ফেলে। গবেষণাটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘গণপরিসরে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনও বাংলাদেশে না থাকাটা এর একটা বড় কারণ। বিদ্যমান আইনগুলোতে যৌন হয়রানি বন্ধে সরাসরি কোনো বিধান রাখা হয়নি। ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহনে ও ৪৮ শতাংশ নারী গণসেবা গ্রহণে নিরাপত্তার অভাবে ভোগে। গণপরিবহনে নারী হয়রানির শিকার হলেও প্রতিবাদের সংস্কৃতি এখনো অনুপস্থিত। ’

নারীর প্রতি সহিংসতার সামগ্রিক পরিস্থিতি, সহিংসতা প্রতিরোধে আইন কাঠামোর উপস্থিতি, সহিংসতা নিরসনে বাজেট বরাদ্দের পরিকল্পনা, জেন্ডার সংবেদনশীল নগর-পরিকল্পনা, জেন্ডারবান্ধব গণপরিবহন পরিকল্পনা ও নকশা—এই পাঁচটি বিষয়ে কোন দেশ কেমন করছে, সে তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অ্যাকশনএইড যে ৪৫টি দেশে কাজ করছে, তার অধিকাংশ দেশেই কম-বেশি নারীর প্রতি বিরূপ নগরচিত্রই পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যে একই প্রতিকূল নারীর জন্য, সেটা এই গবেষণায় স্পষ্ট। বাংলাদেশ, ব্রাজিল, কঙ্গো, জর্ডান, লাইবেরিয়া, নেপাল, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে নগরে নারীর নিরাপত্তার বিভিন্ন সূচকের তথ্য নিয়ে এ গবেষণাটি করা হয়েছে। গবেষণায় নেপালের অবস্থান সবচেয়ে ভালো। দেশটি ‘বি’ গ্রেডে আছে। ৭২ দশমিক ৬৫ স্কোর নিয়ে দশটি দেশের মধ্যে এর অবস্থান প্রথম। গবেষণায় ৮১ থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে কোনো দেশ নেই, অর্থাৎ ‘এ’ গ্রেডে কেউ নেই।

এসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই নগরে নারীরা ধীর অথচ ক্রমবর্ধমান হারে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই আমরা পেলাম ঢাকার প্রথম পেশাদার নারী মোটরসাইকেল চালকের সংবাদ। তিনি নারী যাত্রীদের সেবা দিচ্ছেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে যে দিবাযত্নকেন্দগুলো সুলভে ভালো মানে মিলত, বাণিজ্যিক আকারে তা দেখা দিয়েছে। সামাজিক গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির প্রতিবাদে নারীদের দলবেঁধে কোনো স্থানে প্রতিবাদ করা অথবা প্রতিরোধের চেষ্টা। ঢাকার নগর পরিকল্পনায় পুরুষ-শিশুদের জন্যই বিনোদনের বন্দোবস্ত রাখা হয়নি, ফলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এটা ভবিষ্যতে আরো বড় একটা চাহিদা আকারে দেখা দেবে। অর্থনীতির যে চাপ পুরনো সমাজ ও প্রথা ভেঙে নারীকে জনপরিসরে আনছে, নারীর সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যুদয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে, বিভিন্ন সূচকে আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে থাকলেও তা ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও বহন করে।

ছবি : শেখ হাসান


মন্তব্য