kalerkantho


দক্ষিণ সিটির ৩৭ ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড

বহুমুখী অব্যবস্থাপনার বিপাকে এলাকাবাসী

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বহুমুখী অব্যবস্থাপনার বিপাকে এলাকাবাসী

দুর্ঘটনা এড়াতে ও যানজট নিরসনে ফুট ওভারব্রিজ থাকলেও নেই ব্যবহার

রাজধানী তথা সারা দেশের কাপড় ও বইয়ের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র ও নদীবন্দরের জন্য সদরঘাট-বাংলাবাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। সে পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ সিটির ৩৭ ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের আধুনিকায়নের প্রত্যাশা থাকলেও উল্টো সমস্যা নিরসন তো দূরের কথা, ক্রমান্বয়ে তা বাড়ছেই।

ওয়ার্ড দুটির বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন জাহিদুল ইসলাম

 

রাজধানীর জনবহুল ও ব্যস্ততম এলাকার মধ্যে সদরঘাট, বাংলাবাজার ও ইসলামপুর অন্যতম। এ এলাকার স্বাভাবিক চলাচলের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ফুটপাত ও রাস্তাজুড়ে হকারদের উৎপাত। সদরঘাট মোড়ের ফুটপাত ও রাস্তা যেন হকারদের স্বর্গরাজ্য। যে যেখানে পারছে, নির্বিচারে দোকান ও টুকরি নিয়ে বসে পড়ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, লিয়াকত এভিনিউ, মায়া কাটরা সড়কের দুই পাশের ফুটপাত এবং মূল রাস্তার কিছু অংশ দখল করে বসেছে অসংখ্য দোকানপাট। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হকার্স মার্কেটের সামনের সারিতে প্রায় ৩০টি দোকান ড্রেনের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি থানার ডিউটি পুলিশ সদস্যরা বখরা আদায় করেন। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার ব্যাপারে আমরা সব সময়ই জিরো টলারেন্সে বিশ্বাসী। সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে আমরা তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করি।

রাস্তা দখল করে লেগুনাস্ট্যান্ড

সদরঘাট-বাংলাবাজারের রাস্তাগুলো এত সরু যে পাশাপাশি দুটি রিকশা যাতায়াত করতে পারে না। এ রকম স্থানে দুটি জায়গায় সম্পূর্ণ অননুমোদিতভাবে বসানো হয়েছে লেগুনাস্ট্যান্ড। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হওয়ায় বারবার উদ্যোগ নিলেও সরানো যাচ্ছে না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেট দখল করে বাহাদুর শাহ পরিবহন নামে একটি সার্ভিস জুরাইন ও যাত্রাবাড়ী এবং হিউম্যান হলার গুলিস্তান রুটে চলাচল করে। অন্যদিকে দোয়েল পরিবহন নামে লেগুনাগুলো বাংলাবাজার ফুট ওভারব্রিজের গোড়া থেকে সূত্রাপুর হয়ে জুরাইনে যাতায়াত করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দোয়েল পরিবহনের কোনো রুট পারমিট নেই বা নেই কোনো পরিবহন অনুমতিও। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘এরা সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে স্ট্যান্ড দিয়েছে বলে শুনেছি। ’

 

যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ

ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের জন্য অন্যতম প্রধান মাধ্যম সদরঘাট। বিআইডাব্লিউটিএর তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যাত্রী চলাচল করে এই নৌপথ দিয়ে। এত বিপুল লোককে সদরঘাটে স্বাগত জানানো হয় বাংলাবাজার মোড়ে রাখা দুটি বড় বড় ডাস্টবিন দিয়ে। এসব ডাস্টবিনের গন্ধে বমি আসে অনেকের! কাউন্সিলর বলেন, ‘সুইপাররা পরিষ্কার করতে না করতেই আবার ময়লা-আবর্জনায় ভরে যায়। বিশেষ করে মৌসুমি ফল ও সবজির বর্জ্য সবচেয়ে বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা চলছে। ’ তবে একজন ফল বিক্রেতা বলেন, অন্য আবর্জনাও নিয়মিত পরিষ্কার না করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

সদরঘাট চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য

সদরঘাট যেন চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য। এখানে কেউ মালামাল নিয়ে গ্রামে যেতে চাইলে বা গ্রাম থেকে কোনো মালামাল আনলে দিতে হয় ঘাট ফির নামে চাঁদা। এ রকমই একটি চিত্র দেখা গেল মঙ্গলবার রাতে। মাঈনুদ্দিন নামের একজন ব্যাটারি নিয়ে ভোলায় যাচ্ছিলেন। গ্যাংওয়েতে পথ আটকালেন রাজু, হাসানসহ বেশ কয়েকজন। তারা তাঁর কাছ থেকে ১২০ টাকা চাঁদা দাবি করলে তাদের সঙ্গে মাঈনুদ্দিনের বাগিবতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে তাদের কথা হলে তারা জানায়, রসিদ ছাড়াই তারা টাকা তোলে। এই টাকা বিআইডাব্লিউটিএর অফিস মতিঝিলে জমা হয়। রসিদ ছাড়া কিভাবে টাকা তোলে জানতে চাইলে তারা এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এ ছাড়া সাধারণ হকার ও কুলিদের কাছ থেকে চাঁদাসহ বিভিন্ন উপায়ে চাঁদা তোলে এখানকার বেশ কিছু সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আব্দুর রহমান মিয়াজি বলেন, ‘সদরঘাটে দৃশ্যমান কোনো চাঁদাবাজ নেই। তবে বেশ কয়েকটি চক্র আছে, যারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নানা উপায়ে টাকা আদায় করে। আমাদের নজরে এলে আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা  নেব। ’

 

খাম্বা আছে—লাইট নেই

সদরঘাট ও বাংলাবাজার প্রবেশের প্রধান রাস্তা হলো জনসন রোড। রাস্তাটি বাহাদুর শাহ পার্ক পার হয়ে লিয়াকত এভিনিউ পর্যন্ত। এ রাস্তায় ডিভাইডারের ওপর লাইটপোস্ট থাকলেও নেই লাইট। আবার কোনো কোনোটিতে লাইট থাকলেও জ্বলে না। কবিরাজ লেন, আহসানউল্লাহ রোড, লিয়াকত এভিনিউ, ওয়াইজঘাট, আনন্দমোহন দাস লেন, ঈশ্বর দাস লেন, উল্টিগঞ্জ লেনসহ ৩৭ ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের অনেক স্থানেই ল্যামপোস্ট থাকলেও মেলেনি লাইট। সন্ধ্যা নামলে বিদুৎ থাকলেও জ্বলে না বাতি। ফলে এসব রাস্তায় ছোট-বড় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।

 

মাদকের আখড়া

রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় বাংলাবাজার ও ইসলামপুর মোড়ে অবস্থিত অনেক দিনের পুরনো একমাত্র ফুট ওভারব্রিজ। তবে ওভারব্রিজ থাকলেও এর নেই কোনো ব্যবহার। দিনের আলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় ওভারব্রিজের চিত্র। সন্ধ্যার পরেই জনবিচ্ছিন্ন এ ব্রিজের ওপর বসে মাদকের আখড়া। শুরু হয় ভাসমান পতিতা ও খদ্দেরের রমরমা বাজার! কেউ দেখার নেই, কারো কিছু বলার নেই। অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে বলে সন্ধ্যার পর এখানে জমে মাদকসেবীদের ভিড়। এ ছাড়া সদরঘাট ও ওয়াইজঘাট এলাকায় কয়েকটি সিন্ডিকেট আছে বলে জানা গেছে। এসব সিন্ডিকেটই মূলত এলাকায় মাদক সরবরাহ করে থাকে। এলাকায় মাদক ব্যবসার বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি বলেন, ‘আমার জানা মতে, এ রকম কোনো সমস্যা এখানে নেই। আমরা সব সময়ই মাদক বা এজাতীয় অপরাধের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর। ’

ময়লা-দুর্গন্ধময় ওয়াসার পানি

পুরান ঢাকায় এ সমস্যাটি প্রায় সাধারণ সমস্যা হলেও এর আজও স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কিংবা সিটি করপোরেশন। ফলে এসব এলাকার ওয়াসার পানি পান অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পানিতে শুধু সাধারণ গৃহস্থালি ও গোসলের কাজ করা হয়। পাতলা খান লেনের স্থায়ী বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের এখানে পানির যে সমস্যা আছে, তা অনেক দিনের পুরনো। আমরা বিভিন্ন সময়ে কাউন্সিলর ও ওয়াসার লোকদের মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছি কিন্তু এটা আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ আছে, এখনো কোনো ফলাফল আসেনি। ’

 

সরবে কি ফলের আড়ত?

বাদামতলী ঘাট থেকে দেশের অন্যতম বড় ফলের মার্কেট সরানোর পরিকল্পনা করছে সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বাদামতলী থেকে ফলের আড়তগুলো স্থানান্তরের কথা জানিয়ে বলেন, ফলের আড়ত স্থানান্তরের ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও প্রাথমিক আলোচনা হয়ে গেছে। স্থানান্তরের লক্ষ্য বুড়িগঙ্গা তীরের সৌন্দর্য বর্ধন ও আহসান মঞ্জিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এরই মধ্যে একটি পক্ষ এর বিরোধিতা করেছে। বাদামতলীর ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাধন চন্দ্র দাস বলেন, ‘পুরান ঢাকার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সরকার বাজার স্থানান্তরের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা না মেনে উপায় থাকবে না। এ জন্য ব্যবসায়ীরা যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরের বসিলায় এ বাজার স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ওয়ার্ড কমিশনার আবদুর রহমান মিয়াজী বলেন, ‘এ রকম একটি ঘোষণা মেয়র দিয়েছিলেন, তবে এখন কেন জানি সেটি আলোচনায় নেই। এটা হলে সদরঘাট-বাংলাবাজার আর ইসলামপুরে কোনো জ্যাম থাকবে না। ’

 

বেহাল ড্রেনেজব্যবস্থা

সদরঘাট-বাংলাবাজার ও এর আশপাশের এলাকার ড্রেনেজব্যবস্থা ভালো হওয়ার কথা। কারণ পাশেই বুড়িগঙ্গা হওয়ায় সব লাইন যেহেতু বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে, তাই এই এলাকাগুলোতে পানি জমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ঠিক এর উল্টো। সামান্য বৃষ্টিতেই জমে যায় হাঁটু পানি। এসব পানি সরতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। বাংলাবাজারে মল্লিক টাওয়ারের দোকানদার সবুজ মিয়া বলেন, ‘রাস্তায় বড় পাইপ বসানো থাকলেও এসব পাইপ যখন বসানো হয়, তখন উঁচু-নিচু কোনো কিছু না ভেবে বসানো হয়েছে। এতে পানি সহজে তো নেমে যায়ই না, বরং ম্যানহোল দিয়ে পানি মাঝেমধ্যে ওপরে উঠে আসে। ’ এ বিষয়ে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার হাজী আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমার এলাকায় গত ১৮ বছরের জলজট সমস্যা সম্প্রতি একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। আশা রাখি, আগামী বর্ষায় এলাকাবাসীকে জলজটে পড়তে হবে না। ’

 

শ্যামবাজারের দোকানদারদের আকুতি

শ্যামবাজার কাঁচাবাজারের আড়তদাররা দাবি করেছেন তাঁদের ওখানে একটি হিমাগার নির্মাণের জন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচসহ সব ধরনের মসলার পাইকারি বাজার হিসেবে রাজধানীতে পুরান ঢাকার শ্যামবাজার বিখ্যাত। বুড়িগঙ্গার তীরে ঐতিহ্যবাহী লালকুঠির পাশেই পাইকারি এই বাজারের অবস্থান। ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা মসলা এই বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলায়। এ ছাড়া ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনাসহ ঢাকার আশপাশের সব জেলা থেকে আসা বিভিন্ন সবজি ও মসলাজাতীয় পণ্যও এখানে পাইকারি বিক্রি হয়। বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পান-সুপারিও। শ্যামবাজার বণিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি মো. মাজেদ বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য কৃষিপণ্যের ভাণ্ডার থাকতে হবে। পণ্য সংরক্ষণে হিমাগার খুবই জরুরি। এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষক, ভোক্তা, ব্যবসায়ী—সবাই উপকৃত হবেন। ’

নিজ ওয়ার্ডের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আবদুর রহমান মিয়াজী বলেন, ‘এখন আমার এলাকায় বড় কোনো সমস্যা নেই। একমাত্র যানজট সমস্যাই বলতে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর ওয়ার্ড পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আমার কঠোর নির্দেশ আছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি, যেন তারা কাজে গাফিলতি না করে। ’ অন্যদিকে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমার এলাকায় পানির সমস্যা ছিল, সমাধান করা হয়েছে। এ ছাড়া কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে এলে বা চিহ্নিত করে দিলে আমরা তা তাত্ক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করব। ’


মন্তব্য