kalerkantho


ডাস্টবিনের নামে গচ্চা গেছে ছয় কোটি টাকা!

রাতিব রিয়ান   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ডাস্টবিনের নামে গচ্চা গেছে ছয় কোটি টাকা!

সরেজমিন ঢাকা দক্ষিণ সিটির সর্বশেষ সীমানাসংলগ্ন এলাকা বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানগুলোয় যাওয়ার সড়কে ঢুকতেই চোখে পড়ে ডাস্টবিন হ্যাঙ্গার। ময়লা ফেলার ডাস্টবিনটি সেখান থেকে চুরি হয়ে গেছে।

এর একটু দূরে বাঁ পাশে দেখা যায় আরেকটি ডাস্টবিন উল্টো হয়ে আছে। এর কিছু দূরে আরেকটি দোমড়ানো-মোচড়ানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ডাস্টবিনগুলোর করুণ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় বইবিক্রেতা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘তা-ও ভালো যে এখানকার ডাস্টবিন এখনো চোখে পড়ে। অন্য এলাকার ডাস্টবিন তো চোখেই পড়ে না। সব চোরে নিয়ে গেছে। ’

সরেজমিন বাবুবাজার ব্রিজ এলাকা। ব্রিজের ঠিক ডান পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বসানো হয়েছিল এ রকম একটি ডাস্টবিন। সেটিও দুমড়ে-মুচড়ে আছে। ব্রিজের বাঁ পাশে দেখা যায় সেখানে ডাস্টবিন নেই, পড়ে আছে হ্যাঙ্গারটি।

পরিচ্ছন্ন রাজধানী গড়ার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বসানো হয় ১০ হাজার ডাস্টবিন। কিন্তু সেগুলোর ব্যবহার না হওয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অবহেলায় বেশির ভাগ ডাস্টবিন দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ও চুরি হওয়ায় ভেস্তে গেছে দুই সিটির মিনি ডাস্টবিন প্রকল্প।

দুই সিটি করপোরেশন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ডাস্টবিনই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কিছু ডাস্টবিন চুরি হয়ে গেছে, কোথাও ডাস্টবিনের বক্স ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আবার কোথাও নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা জমে তা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, মিনি ডাস্টবিনগুলো রাস্তার পাশে বসানো হয়েছে এবং রিকশা, লেগুনার কারণে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক ডাস্টবিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা দোকানের সামনে বসানোয় তারা কৌশলে সেটি ব্যবহার অনুপযোগী করে রেখেছে। কেউ বা ডাস্টবিন উল্টো করে রেখেছে। ঢাকার নাখালপাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ‘ডাস্টবিন বসানোর উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কিন্তু এগুলো দেখাশোনা করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা গচ্চা গেল। ’ আরজতপাড়ার বাসিন্দা সম্রাট হোসেন বলেন, ‘আমার দোকানের সামনে ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল, দুর্গন্ধ আসত। তাই সেটি সরিয়ে ফেলেছি। দুর্গন্ধের কারণে লোকজন আসতে পারত না। ’

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, দুই সিটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০ হাজার ডাস্টবিন বসানো হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রয়েছে প্রায় ছয় হাজার ডাস্টবিন। ছোট ডাস্টবিন প্রতিটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ছয় হাজার টাকা এবং বড় ডাস্টবিন তৈরিতে খরচ ১২ হাজার টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ডিএসসিসি এলাকায় ২২০টি বিন চুরি হয়েছে। ৭০০টি বিন নষ্ট বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ডাস্টবিন ব্যবহার হচ্ছে না। বাকিগুলো ঠিকঠাক চলছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ৫০০ থেকে ৭০০ ডাস্টবিন নষ্ট হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই ডাস্টবিনগুলো বসানো হয়। কিন্তু সর্বস্তরের মানুষ সচেতন না হওয়ায় ডাস্টবিনগুলো কোনো কাজে আসেনি। ’ রাজধানীর মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত কর্মী বুলবুলি আক্তার বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলো বসানোর পর পর সবাই এখানে ময়লা ফেলত। রাস্তায় ময়লা, খালি বোতল কম পড়ে থাকত। কিন্তু এখন যা তাই। আগের মতোই রাস্তার ওপর ময়লা পড়ে থাকছে। ’ সায়েন্স ল্যাব এলাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মী মিজানুর রহমান বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলোর বেহাল অবস্থা দেখে খারাপই লাগে। পরিকল্পনামতো কাজ না করায় কোটি কোটি টাকা নষ্ট হলো। ’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। অনেক জায়গায়, বিশেষ করে যেসব এলাকায় রাতের বেলায় জনসমাগম কম সেসব এলাকার ডাস্টবিনের ঢাকনা চুরির ঘটনা ঘটছে। টোকাই শিশুরা এ রকম করছে। আমরা বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ’

ডিএনসিসির উপপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘অনেক বিন চুরি হয়ে গেছে। কিছু নষ্ট হয়েছে। যে এলাকায় চুরি বা নষ্ট হয়েছে সেখানে নতুন ডিজাইনের বিন বসানো হবে। চুরি ঠেকাতে নতুন চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। নষ্ট বিনগুলো আবার মেরামত করা হবে। যেগুলোতে বিন নেই সেখানেও নতুন বিন বসানো হবে। ’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার দুই পাশে ডাস্টবিন বসানো হয়। এসব ডাস্টবিন মূলত শুকনা ও কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য বসানো হয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, টুকরা কাগজজাতীয় বর্জ্যই এ ডাস্টবিনগুলোতে ফেলার জন্য বসানো হয়েছে। আসলে বিষয়টা নগরবাসীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এসব ডাস্টবিন ব্যবহারের জন্য জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও হয়েছে। যাতে নগরবাসী নিজ উদ্যোগে এগুলো ব্যবহার করে। তার পরও যদি এগুলো ব্যবহার না হয় তাহলে তো জোর করে ব্যবহার করানো যাবে না। ’ ডাস্টবিনের ঢাকনা চুরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো হচ্ছে। সবাই সচেতন থাকলে চুরির বিষয়টি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সিটি করপোরেশনের পক্ষে তো একা এসব সমাধান করা সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া একটি পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা যায় না। ’


মন্তব্য