kalerkantho


দখল, দূষণ ও অবহেলায় মরণাপন্ন চিলাই নদী

মো. মনির হোসেন   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দখল, দূষণ ও অবহেলায় মরণাপন্ন চিলাই নদী

একসময়ের প্রশস্ত ও বিশালাকার চিলাই নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে

ভাওয়াল গড়ের চুইয়ে আসা পানির ধারা থেকে সৃষ্ট ও বেলাই বিল বিধৌত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী চিলাই। গাজীপুর শহরের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত চিলাই নদী জেলার অন্যতম প্রধান একটি নদী।

চিলাই একসময় আরো প্রশস্ত ও বিপুলাকার নদী ছিল। জনশ্রুতি আছে, এ নদী পাড়ি দিতে চিল ক্লান্ত হয়ে পড়ত, যে কারণে এর নাম হয় চিলাই। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দক্ষিণ সীমান্তে শুরু হওয়া নদীটি বিভিন্ন পথ অতিক্রম করে গাজীপুর সদরের পুবাইল এলাকায় বালু নদে গিয়ে মিশেছে। ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীকে স্থানীয়রা অনেকেই চিলাই খাল হিসেবে জানে। খাল বা নদী এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও নদীটি যে গাজীপুরের হৃৎপিণ্ড—এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। সম্প্রতি নদীর বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করে দেখা যায়, নদীর তীরের কিছু অবিবেচক মানুষ দখল ও দূষণের মাধ্যমে নদীটির যেন টুঁটি চেপে ধরেছে। নদী দখল করে গড়ে উঠেছে বড় বড় কারখানা। যার ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে শহরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া এ নদীটি। পরিবেশবাদী ও সচেতন মানুষ নদীটি উদ্ধারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ নদীর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে গাজীপুরের বিখ্যাত বেলাই বিলের। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রবল ভূমিকম্পে চিলাই তার বিশালত্ব হারালেও অস্তিত্ব হারায়নি। কিন্তু বর্তমানে চিলাই তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। দখল ও দূষণের কবলে পড়ে নদী পরিচয়ের স্বাভাবিকতা হারাতে বসেছে। শহরের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত অংশে দখলদারি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়েছে। এ জেলা শহরের পয়োনিষ্কাশনের সব ধারা চিলাই আর তার শাখায় মিশেছে। তাই শহরের আশপাশের পানি প্রবাহের নালা-জলাশয়সহ চিলাই নদী বর্তমানে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে জেলা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা জজ কোর্ট, গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ, কাজী আজিমউদ্দিন কলেজ এবং আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, সার্কিট হাউস, জেলা জজ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সব পদস্থ ব্যক্তির বাসভবনে যাওয়ার পথে যে ব্রিজটি রয়েছে তার নিচের প্রবাহটি দিয়ে যে পরিমাণ এবং যে ভয়াবহ দূষিত বর্জ্য প্রবাহিত হয়, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আর এ প্রবাহটি ধীরে ধীরে সব বর্জ্য চিলাই নদীতে নিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দূষণের মাত্রা আরো বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি গাজীপুরের গর্ব ও ঐতিহ্যের ধারক বেলাই বিলও ক্রমান্বয়ে দূষণের করাল গ্রাসে আক্রান্ত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ, মোগল আমল, ঈশা খাঁ, ভাওয়ালের ইতিহাসসংশ্লিষ্ট চিলাই নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয়রা খুবই শঙ্কিত। স্বভাব কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাসের সমগ্র লেখায় চিলাই নদীর ছাপ ছিল। এ বিষয়ে গোবিন্দ গবেষক অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গোবিন্দ দাসের প্রতিটি লেখায় কোনো না কোনো অংশে চিলাইয়ের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ভাওয়াল গড়ের লালমাটি বিধৌত পানি প্রবাহ ধারণ করত চিলাই নদী। আর এ নদীটি খুবই খরস্রোতা ছিল। তাই কবি গোবিন্দ দাস বলেছিলেন, ‘সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী। ’

চলছে অবাধে নদী দখলের প্রতিযোগিতা

চিলাই নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন ভাণ্ডারী বলেন, ‘গাজীপুরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া চিলাই নদী বাঁচাতে এখনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ’ ভাওয়াল গড় বাঁচাও আন্দোলনের মহাসচিব এ কে এম রিপন আনসারী বলেন, ‘গাজীপুর শহর ঘিরে থাকা ঐতিহাসিক চিলাই নদী দখলের কবলে পড়ে এখন মৃতপ্রায়। চিলাই নদীর ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই। প্রতিনিয়ত চিলাই নদী দখল করে নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় স্থাপনা। ফলে ঐতিহাসিক চিলাই এখন মৃত্যুর হাতছানি দিচ্ছে। এ ছাড়া নদীর পাড় ও বন কেটে প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে। নদী ও বনের আয়তন কমে যাচ্ছে দিন দিন। এসবের সঙ্গে অপরিকিল্পত শিল্পায়ন, বিশেষ করে নদীর পাড়ে ইটের ভাটা পরিবেশ দূষণের জন্য মারাত্মক হুমকি। এ অবস্থা চলতে থাকলে গাজীপুরে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে। পরিবেশ রক্ষায় অচিরেই সমন্বিত ভালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ’

গাজীপুর শহরের বেশির ভাগ শিল্পবর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয় তুরাগ নদে আর চিলাই নদীতে!

এ বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শওকত আলম বলেন, ‘চিলাই নদী রক্ষায় করপোরেশন এরই মধ্যে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে নদী খনন, পাড় বাঁধাই, সবুজায়নসহ সৌন্দর্য বর্ধন। এরই মধ্যে দুই কিলোমিটার খননকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনভুক্ত নদীর বাকি অংশের খনন ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে। ’

 

নদীকে দিতে হবে মানুষের মর্যাদা

অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক

শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী

নদীর পাড় তো বটেই, নদীর ভেতরেও ভূমিখেকোরা তার করাল হাত বাড়াতে বিবেকের একটু দংশনও অনুভব করেনি। লোভ যেখানে প্রবল, বিবেকের শাসন সেখানে দুর্বল। দূষণ কতটা ভয়াবহ আর সর্বগ্রাসী হতে পারে চিলাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। চিলাই নদীকে এই মাত্রাতিরিক্ত দখল-দূষণ থেকে মুক্ত করতে হবে। মারাত্মক এ সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার চেয়ে আর কোনো বড় দাবি এ মুহূর্তে গাজীপুরবাসীর থাকতে পারে না। এটা আমাদের অস্থিত্ব রক্ষার দাবি। আর এর জন্য দরকার বহুমুখী সুদূরপ্রসারী, বাস্তবভিত্তিক ও সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা। দখলদারির দৌরাত্ম্য যেকোনো মূল্যে বিনাশ করে দখলমুক্ত করতে হবে চিলাই নদীকে। নদীকে দিতে হবে মানুষের মর্যাদা আর দখলদারদের জাতীয় শত্রু ঘোষণা করতে হবে।

 

নদী সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

সুমন শামস

চেয়ারম্যান, নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’

প্রতিনিয়ত নদীখেকো দখলদারদের মধ্যে যে হারে নদী দখলের প্রতিযোগিতা বাড়ছে তাতে মনে হয়, এই নদীর কোনো অভিভাবক নেই! গাজীপুর শহরের সব শিল্পবর্জ্য তুরাগ নদ আর চিলাই নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। নানাভাবে চলছে দখল কার্যক্রম। নদীকে রক্ষা করতে হলে কঠোর হস্তে নদী রক্ষা আইনের প্রয়োগ করতে হবে। নদী সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গাজীপুর শহরকে স্বাস্থ্যসম্মত, সুন্দর-পরিচ্ছন্ন ও নদীমাতৃক রাখতে এখনই চিলাই নদী ও তুরাগ নদের দুই ধারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। যারা এই নদীদূষণ করছে সেই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তালিকা তৈরি করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে গাজীপুরের নদীমাতৃক পরিচয়।

 

শিগগিরই দখলদারির বিরুদ্ধে অভিযান

ডক্টর দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর

জেলা প্রশাসক, গাজীপুর

ঐতিহ্যবাহী, ইতিহাসসমৃদ্ধ ও অন্নপূর্ণা গাজীপুরের সব সুখানুষঙ্গের মধ্যে অস্বস্তিতে ফেলেছে নদী-নালা-খাল-পুকুর পরিস্থিতি। পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম ও সচেতন ব্যক্তিদের মাধ্যমে এ বিষয়ে অনেক অসংগতির খবর পেয়েছি। এগুলো আমরা দাপ্তরিকভাবে যাচাই-বাছাই করছি এবং সরেজমিন গিয়ে পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছি। দখল ও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। চিলাই নদী রক্ষার ব্যাপারে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। নদীমাতৃক পরিচয় ফিরিয়ে দিতে শিগগিরই দূষণ ও দখলদারির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হবে। পাশাপাশি গাজীপুর শহরের দেশপ্রেমিক তরুণ-তরুণীদের নেতৃত্বে নদী-প্রকৃতি রক্ষার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে চিলাই নদী ও তুরাগ নদের দুই পাশের স্থানীয় গণমানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।


মন্তব্য