kalerkantho


সংস্কার কাজে বিলম্ব

সীমাহীন দুর্ভোগে শেওড়াপাড়ার মানুষ

আরিফুর রহমান   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সীমাহীন দুর্ভোগে শেওড়াপাড়ার মানুষ

দুর্ভোগ আর ভোগান্তির শেষ নেই রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের। শেওড়াপাড়াজুড়ে এখন চলছে রাস্তা সংস্কার, নর্দমাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ।

তিন মাস ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি কাজ। কবে নাগাদ শেষ হবে তা-ও বলতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রাস্তা সংস্কারের কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। খোঁড়াখুঁড়ির ধীরগতির কারণে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। খোলা ড্রেনে পড়ে চার বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে গত মাসে। কাজের মান নিয়েও এলাকাবাসীর রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তিন মাস ধরে চলতে থাকা রাস্তা সংস্কারের কারণে বহুমাত্রিক সমস্যায় পড়েছেন শেওড়াপাড়ার বাসিন্দারা। শেওড়াপাড়ার বেশির ভাগ অলিগলি বন্ধ থাকায় মূল রাস্তার ভেতরে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে করে গর্ভবতী মাসহ অন্য রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে পড়তে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগে। পণ্যভর্তি মিনি ট্রাক মূল রাস্তার ভেতরে যেতে পারছে না। এতে করে অলিগলিতে যেসব দোকানপাট রয়েছে, সেখানে পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের এখন অনেক দূর থেকে  নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদা আনতে হচ্ছে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ব্যবসায়ীদের ব্যবসাও কমে গেছে। প্রতিদিনই অফিসগামীদের পড়তে হচ্ছে বিপাকে।

এদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতা ফুটে উঠেছে শেওড়াপাড়ায়। এখানকার রাস্তা সংস্কার, নর্দমাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজের তদারকি করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ঠিক একই সময়ে পানির পাইপ লাইন সংস্কারের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কাজে হাত দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এ সময়েই বিদ্যুৎ লাইন সংস্কারের কাজ করছে ডিপিডিসি। তার সঙ্গে মেট্রোরেলের প্রকল্পও চলমান। ঢাকা ওয়াসার সংস্কার কাজের জন্য একসময় নিরুপায় হয়ে সিটি করপোরেশনের কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে সাময়িক সময়ের জন্য। সেবা খাতের এসব সংস্থার নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের। অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। কোন সংস্থা কোথায় কাজ করছে অন্য সংস্থা জানে না, একটির সঙ্গে অন্যটির যোগাযোগ না থাকায় নাগরিকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আজমত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ এক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলে গেলে দুই দিন পর আরেকটি সংস্থা এসে কাজ শুরু করে। এমনও হয়েছে, কয়েকটি সেবাদানকারী সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। এতে আমাদের চলাচলে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। ’ মেয়র আনিসুল হকের অনুপস্থিতির ফলে কাজের গতি এমন ঢিলেঢালা বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মূল সড়ক পেরিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম শেওড়াপাড়ার প্রায় সব রাস্তা এখন বন্ধ। পূর্ব শেওড়াপাড়ার কবরস্থান গলির রাস্তাটি এখন পুরোপুরি বন্ধ। গত তিন মাস ধরে সেখানে সংস্কারের কাজ চলছে। এখনো শেষ হয়নি। ফলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় শামীম সরণি এলাকার প্রায় সব রাস্তা বন্ধ। দুই মাস হতে চলল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো শেষ করতে পারেনি সংস্কারের কাজ। শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিলপাড়, পীরেরবাগ ও কল্যাণপুরের দিকে যাওয়ার রাস্তাও বেহাল। চলছে সংস্কারের কাজ। ইস্ট-ওয়েস্ট রাস্তাতেও একই অবস্থা। পুরো এলাকায় সংস্কারের কাজে দেরি হওয়ায় খুদে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনা-নেওয়ায় দুর্ভোগে পড়ছেন অভিভাবকরা। স্কুলের যানবাহন চলতে পারে না। নিরুপায় হয়ে হেঁটেই সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছেন অভিভাবকরা। আগে ভ্যানে করে বাসার সামনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে আসতেন খুদে ব্যবসায়ীরা। এখন ভ্যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে। ফলে বাজারের জন্য যেতে হচ্ছে দূরে শেওড়াপাড়া বাজারে। হাতেগোনা দু-একটি সড়ক ভালো আছে; যেখান দিয়ে রিকশা, মোটরসাইকেল চলতে পারে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মিনি ট্রাক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। অফিসগামী মানুষ অনেক দূর হেঁটে মূল রাস্তায় গিয়ে গাড়িতে উঠছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, খোঁড়াখুঁড়ির কাজে এত দেরি হওয়ার কথা নয়।

সংস্কারের কাজের গুণগত মান নিয়ে ক্ষোভ আছে স্থানীয়দের মধ্যে। প্রায় প্রতিদিনই ঠিকাদারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছে স্থানীয়দের। শেওড়াপাড়ার এক বাড়ির মালিক আবদুর রহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি যাওয়ার জন্য যে রিং বসানো হচ্ছে, সেটি অনেক ওপরে। মাটি কেটে রিং আরো নিচে বসানো উচিত। কিন্তু ঠিকাদার সেটা করছে না। কাজের মান খুবই খারাপ। দুই মাস শেষ হতে চলল অথচ এখনো রাস্তার কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু করতে পারেনি। আরো কত দিন সময় লাগবে কে জানে!’ রাস্তা সংস্কারের কারণে গত মাসে শামীম সরণিতে বাসার সামনে রাস্তার ওপর দুপুরে খেলতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে মৃত্যু হয় চার বছরের এক শিশুর। ওই সময় রাস্তায় মানুষের চলাচল ছিল না। খেলতে খেলতে শিশুটি কখন ড্রেনে পড়ে গেছে, কেউ বুঝতে পারেনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিকেলে লাশ মিলেছে। আবুল কালাম নামের এক শ্রমিক জানালেন, রাস্তায় কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু করতে আরো সময় লাগবে। কারণ এখনো মাটি বসেনি।

শামীম সরণির মৌমিতা স্টোরের স্বত্বাধিকারী আবু ইউসুফ বলেন, ‘দোকানে পেঁয়াজ, আলু, রসুন নেই অনেক দিন হলো। কারণ রাস্তা বন্ধ থাকায় মিনি ট্রাক দোকানের সামনে আসতে পারে না। মূল রাস্তা থেকে শ্রমিককে দিয়ে পণ্য আনতে গেলে বাড়তি টাকা যাবে। সে টাকা তো পণ্যের দাম বাড়িয়ে আদায় করতে হবে। কিন্তু পণ্যের দাম বাড়ালে সেটা কি ভোক্তা মানবে? তাই পেঁয়াজ, আলু, রসুন এখন দোকানে রাখি না। ’ অন্যদিকে হোটেল ব্যবসায়ও চলছে মন্দা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কুদরত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা শহরটি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। রাজধানী নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নকশা নেই। তাই আমরা জানি না, কোথায় কোন সংস্থার লাইন আছে। সে জন্য আমাদের কাজ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘সিটি করপোরেশন কোথাও কাজ করতে যাওয়ার আগে ওয়াসা, ডেসকো, ডিপিডিসিসহ সবার সঙ্গে বৈঠক করে। যেকোনো কাজ একসঙ্গে করা যায় কি না, সে প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে সেটা মানে না। ’ উদাহরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘শেওড়াপাড়া এলাকায় কাজ করতে যাওয়ার আগে সব সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ওই এলাকায় এ সময়ে কারো কাজ করা হবে কি না তা জানতে চেয়েছি। তখন কোনো উত্তর পাইনি। কিন্তু মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখি সেখানে ওয়াসা খোঁড়াখুঁড়ি করছে। এক পর্যায়ে আমরা আমাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। ’ তিনিও মনে করেন, ‘কাজে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। ’


মন্তব্য