kalerkantho


মাদক, জলাবদ্ধতা ও অবৈধ পার্কিং সংকটে তেজগাঁওবাসী

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মাদক, জলাবদ্ধতা ও অবৈধ পার্কিং সংকটে তেজগাঁওবাসী

ট্রাকের দখলে পুরনো চেহারায় তেজগাঁও

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড তেজগাঁওকে বলা হয় শিল্প এলাকা। উত্তরা মোটরস, নাবিস্কো বিস্কুট, কোহিনূর, এসিআইসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানার অবস্থান সেখানে।

রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিএসটিআই, বিজি প্রেসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস। বড় একটি অংশজুড়ে আছে আবাসিক এলাকাও। আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মিশেলে গঠিত তেজগাঁওয়ের মানুষ কতটা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তা জানার চেষ্টা করেছেন আরিফুর রহমান, ছবি তুলেছেন লুত্ফর রহমান

 

আগের চেহারায় ফিরে গেছে তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা মোড় থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত রাস্তাটি। রাস্তা দখল করে অবৈধভাবে আবারও সারি সারি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ রাখা শুরু হয়েছে। মূল রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। সংকুচিত হয়ে এসেছে রাস্তা দিয়ে রিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচলে। নিরুপায় হয়ে সরকারি কলোনি ও বাসাবাড়ি থেকে হেঁটেই স্কুল কিংবা অফিসে যেতে হয় শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষকে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তেড়ে আসে সংঘবদ্ধ শ্রমিকরা। রাস্তার ওপর ট্রাক রাখার বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই অপমান আর হেনস্থা হতে হয় বাসিন্দাদের।

তাই এখন আর কেউ ভয়ে মুখ খোলে না। নীরবে রাস্তা পার হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে বেশ কয়েকটি বস্তি। রেললাইনের পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা এসব বস্তি ঘিরে চলছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। তেজগাঁও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে মাদকের ব্যবসা অনেকটা নিরাপদ। ইয়াবা আর গাঁজা সেবনে সেখানে কতগুলো হটস্পট আছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ছিনতাই হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে। শিল্প এলাকার কারণে তেজগাঁওয়ের অনেক এলাকা সন্ধ্যা নামলেই নীরব হয়ে যায়। মানুষের আনাগোনা কমে যায়। সেসব স্থানে কাউকে একা পেলেই মোবাইল, মানিব্যাগ, গহনা ছিনিয়ে নিয়ে নিরাপদে সটকে পড়ে ছিনতাইকারীরা। প্রতিবার বর্ষাকাল এলেই দুশ্চিন্তা ভর করে তেজগাঁওয়ের বাসিন্দাদের ওপর। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে বেশির ভাগ এলাকায়, যার ফলে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেশির ভাগ এলাকার রাস্তা এখন খানাখন্দে ভরা। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। একদিকে জমে থাকা পানি আর অন্যদিকে বড় বড় গর্তের কারণে রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার চাকা ভেঙে যাত্রীদের কাদা-পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পুরো বর্ষাকালই জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পোহাতে হয় তেজগাঁওয়ের বাসিন্দাদের। রাস্তার বেহাল পুরো এলাকাজুড়ে।

পুরনো চেহারায় সাতরাস্তা থেকে রেলক্রসিং রোড

২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর। দুপুর ১টা। সাতরাস্তা মোড় থেকে তেজগাঁওয়ের রেলক্রসিং পর্যন্ত অবৈধভাবে রাখা ট্রাক উচ্ছেদ করতে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক। ওই সময় চালক ও শ্রমিকরা মেয়র আনিসুল হককে অবরুদ্ধ করে রাখে। বাংলাদেশ ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠকের পর ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদে রাজি হয় মালিক সমিতি। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ সরে যাওয়ার পর সাতরাস্তা মোড় থেকে তেজগাঁওয়ের রেলক্রসিং পর্যন্ত যাতায়াতে স্বস্তি আসে যাত্রীদের। অল্প সময়ের মধ্যে তেজগাঁও থেকে ফার্মগেট যাওয়ার সুফল পেতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। কিন্তু ‘সুফল পাওয়া’ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মেয়র আনিসুল হক গুরুতর অসুস্থ হয়ে এখন লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আর এই সুযোগে ওই এলাকা আবারও ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের দখলে। সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও যাওয়ার মূল সড়কটি দখল না হলেও পাশের রাস্তাগুলো আবারও দখলে পুরনো চেয়ারায় ফিরে এসেছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে কর্মরত রাকিব আহমেদ পরিবার নিয়ে অফিসের পাশে তেজগাঁওয়ে সরকারি কলোনিতে থাকেন। দুই সন্তানকে সকালে স্কুলে নেওয়ার পথে প্রতিদিনই বিপত্তিতে পড়েন। কারণ কলোনির বাইরে রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ। রাস্তা দিয়ে রিকশা চলাচল করতে পারে না; তাই হেঁটেই সন্তানদের স্কুলে দিয়ে আসেন। রাস্তার ওপর ট্রাক রাখা নিয়ে একবার প্রতিবাদ করতে গেলে শ্রমিকদের কথা ছিল এমন—‘কোনো কথা নয়, সোজা হাঁটেন। ’ শ্রমিকদের কাছে অপদস্থ হওয়ার পর রাকিব আহমেদ এখন অসহায়ের মতো সন্তানদের হেঁটেই স্কুলে দিয়ে আসেন।  

সরেজমিনে গিয়ে স্কুল শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, তাঁরা সবাই শ্রমিকদের সামনে অসহায়। কারণ, শ্রমিকদের ওপর থেকে প্রশ্রয় না দিলে তারা রাস্তার ওপর ট্রাক রাখার সাহস পেত না। কেউ কিছু বলতে গেলে শ্রমিকরা এক হয়ে মারতে যায়। এ কারণে ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। জাহাঙ্গীর নামের এক ট্রাক চালক জানালেন, ‘আমাদের ট্রাক রাখার কোনো জায়গা নাই। বিকল্প কোনো টার্মিনালও নাই। যে কারণে রাস্তার ওপরেই রাখতে হচ্ছে। রাস্তার ওপর ট্রাক রাখার কারণে অনেক সময় পুলিশ আইসা ঝামেলা করে। তাদের ম্যানেজ করতে হয়। ’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাতরাস্তা, তিব্বত, নাবিস্কোসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চোখে পড়ল, রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন কম্পানির ট্রাক ও বাস। পিপিএলসহ কয়েকটি কম্পানির গাড়ি রাস্তার ওপর রাখার কারণে যানজট সেখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। এতে মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। একই সঙ্গে রাস্তার সৌন্দর্যও নষ্ট হয়।

জলাবদ্ধতায় নাকাল এলাকাবাসী

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সমস্যার নাম জলাবদ্ধতা। এখন বর্ষা মৌসুম। একটু বৃষ্টি হলেই মূল রাস্তা পেরিয়ে অলিগলিতেও দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। পানি জমার কারণে রাস্তায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। পূর্ব নাখালপাড়া, পশ্চিম নাখালপাড়া, লুকাস মোড়, লিচুবাগান, সাতরাস্তা মোড়, হ্যাপি হোমস, কুনিপাড়াসহ বেশির ভাগ এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা তানভীর হোসেন জানান, ‘প্রায় এক দশক ধরে তেজগাঁও এলাকায় আছি। এই এলাকায় জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। একটু বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এতে দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কর্মক্ষেত্রে যেতে সমস্যা হয়। ’

 

রাস্তার বেহাল

সাতরাস্তা মোড় থেকে নাবিস্কোর সামনে এলে যাত্রীদের শুরু হয় ভোগান্তি। নাবিস্কো থেকে মহাখালী সিগন্যালের আগ পর্যন্ত পুরো রাস্তা খানাখন্দে ভরা। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে বাস, মিনিবাস ও প্রাইভেট কারের গতি কমে আসে। ফলে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। শুধু নাবিস্কো মোড় নয়, নাখালপাড়া রেলগেট থেকে হলিক্রস কলেজ দিয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত সড়কটিও খানাখন্দে ভরা। বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে সেখানে। টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের রাস্তার অবস্থা খুবই নাজুক। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে সেখানে। চ্যানেল আইয়ের পাশ দিয়ে নাখালপাড়ার দিকে যাওয়া রাস্তার অবস্থাও বেশ খারাপ। তেজগাঁওয়ে সিএনজি রূপান্তর কারখানা সাউদার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডে কর্মরত কর্মকর্তা রাফায়াত হোসেন পাপ্পু জানালেন, ‘নাবিস্কো বাসস্ট্যান্ড ঘিরে অনেক সমস্যা। এখানে রাস্তার অবস্থা খুবই নাজুক। চলাচলে খুবই সমস্যা হয়। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার কারণে হাঁটাও যায় না। ’

মাদকের জমজমাট ব্যবসা!

তেজগাঁওয়ের ভূমি রেকর্ড কলোনি। সন্ধ্যা নামলেই কলোনির ভেতর মাদকের আসর বসে বলে অভিযোগ কলোনির বাসিন্দা আবু তৈয়বের। কলোনির ভেতর উঠতি বয়সী তরুণরা গাঁজা সেবন করে। বেশ কয়েকবার ঠেকানো গেলেও আবার শুরু হয়। শুধু ভূমি রেকর্ড কলোনি নয়, তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে মাদক আর ইয়াবা সেবনের আসর বসে। বিজয় সরণি উড়াল সেতুর নিচে প্রতি রাতে ইয়াবা ও মাদক সেবনের আসর জমার কথা সবার মুখে মুখে। রেললাইনের পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা বস্তিতেও মাদকের জমজমাট ব্যবসা চলছে। এ ছাড়া তেজকুনিপাড়া, ডেনিম গার্মেন্টের সামনের রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মাদকের ব্যবসা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

ছিনতাই ও চুরি

কুনিপাড়ার বাসিন্দা আকাশ। এবারের কোরবানির ঈদে দুই ভাই মিলে বাড়ি যান। বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখেন বাসার তালা ভেঙে সব কিছু নিয়ে গেছে। চুরির বিষয়ে বাড়ির মালিকের কাছে অভিযোগও করেছেন আকাশ। কিন্তু বাড়ির মালিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তেজগাঁওয়ে ছিনতাই ও চুরি নিত্যদিনের ঘটনা। এমন কিছু স্পট আছে, যেখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। দিনে-দুপুরে নাখালপাড়া থেকে গলার গহনা, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কুনিপাড়া, হ্যাপি হোমস ও বেগুনবাড়ি এলাকাও ছিনতাইয়ের জন্য ভালো জায়গা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মনি স্বপন চাকমা বলেন, ‘আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বেশ কয়েকবার তেজগাঁও এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। ’ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ সফিউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাতরাস্তা মোড় থেকে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ না রাখতে আমি বারবার তাগিদ দিয়েছি। বেশ কয়েকবার সরিয়েও দিয়েছি। কিন্তু দেখা যায়, রাতে সরিয়ে দিলে আবার সকালে হাজির। আবার সকালে সরিয়ে দিলে রাতে হাজির। চালকদের অনেক গালিগালাজ করি চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তারা যায় না। অন্যদিকে মাদকের বিষয় মোহাম্মদ সফিউল্লাহ বলেন, ‘আমার এলাকায় মাদকের তেমন সমস্যা নেই। যখনই কোনো অভিযোগ আসে, আমরা পুলিশকে জানিয়ে দিই। ছিনতাই ও চুরির বিষয়েও কোনো অভিযোগ পেলে আমরা পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিই। ’ জলাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর করতে আমরা কাজ করছি। জলাবদ্ধতা এ এলাকার জন্য একটি বড় সমস্যা। চেষ্টা করছি এ সমস্যা সমাধানের। ’ তবে রাস্তাঘাটের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।


মন্তব্য