kalerkantho


বিপন্ন বলধা গার্ডেন

জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ৩৪ বছরে অপার মমতায় গড়ে তুলেছিলেন জীবন্ত উদ্ভিদের জাদুঘর বলধা গার্ডেন। সেটি প্রায় ১০৯ বছর আগের কথা। সেই নান্দনিক বাগানটি বর্তমানে উন্মুক্ত পতিতাপল্লীতে পরিণত হয়েছে! হারিয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির অনেক গাছ। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের আদর্শ স্থানের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে বখাটে, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে। অযত্ন-অবহেলা আর অদূরদর্শিতায় সংকটাপন্ন বলধা গার্ডেনের চিত্র তুলে ধরেছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



বিপন্ন বলধা গার্ডেন

‘সিবলী’ অংশে বিদ্যমান শঙ্খনিধি পুকুর

১৯০৯ সালে বলধা গার্ডেন নির্মাণ শুরু করেছিলেন তদানীন্তন ঢাকা জেলা, বর্তমান গাজীপুর জেলার বলধার জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী। ১৯৪৩ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলে বৃক্ষ সংগ্রহ।

এখানে তিনি দুটি উদ্যান তৈরি করেন। প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন ‘সাইকী’—অর্থ ‘আত্মা’। দ্বিতীয় উদ্যান ‘সিবলী’—অর্থ ‘প্রকৃতির দেবী’। পরবর্তী সময়ে এ দুয়ের সম্মিলনে পূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে ‘বলধা গার্ডেন’ নামে। বলধা বাগানের সঙ্গে আরেকজনের নাম নিবিড়ভাবে মিশে আছে। তিনি হলেন অমৃতলাল আচার্য। ১৯৩৬ সালে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাগানটি আগলে রেখেছিলেন পরম যত্নে। ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত এই বাগানের আয়তন ৩.৩৮ একর। প্রকৃতপক্ষে এটিকে দুর্লভ গাছের স্টোর হাউস বলা যেতে পারে। সে সময় দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা এই বাগান দেখতে আসতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বলধায় এসে ক্যামেলিয়া ফুলের বাহারি রূপে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন—

‘কাঁটাতে আমার অপরাধ আছে

দোষ নাহি মোর ফুলে

কাঁটা অপ্রিয় থাক মোর কাছে

ফুল তুমি নিও তুলে। ’

 

‘সিবলী’ অংশে গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকা বাদুড়

 

বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণের ইতিকথা

নরেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হলে কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি ট্রাস্টের অধীনে বাগান ন্যস্ত হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এর তত্ত্বাবধানে ছিল পাকিস্তান সরকারের কোর্ট অব ওয়ার্ডস। বন বিভাগ এর নিয়ন্ত্রণ পায় ১৯৬২ সালে। বর্তমানে বাগানটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান কর্তৃপক্ষের। প্রবেশ টিকিটের দায়িত্ব ইজারাদারের। প্রবেশ ফি ৩০ টাকা। সিবলী অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। সাইকী অংশ সংরক্ষিত। শুধু বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে দেখার সুযোগ রয়েছে।

 

পুস্তকের হিসাবে বলধার যত গাছগাছালি

বলধা বাগানকে বৃক্ষ, জলাশয়, অর্কিড হাউস ও অন্যান্য উদ্ভিদ কর্নার মিলে এক অপূর্ব উদ্যান বলা চলে। মোহাম্মদ আলী খান (১৯৯৯) রচিত ‘বলধা গার্ডেন ও জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী’ শীর্ষক গ্রন্থে ৮০০ প্রজাতির ১৮ হাজার উদ্ভিদের কথা বর্ণিত হয়েছে। বলধা গার্ডেনে যে গাছপালা আছে, তা শুধু এ দেশের জন্যই নয়, বিশ্বের উদ্ভিদ বিশারদদের কাছেও অমূল্য সম্পদ। ইফতিখার-উল-আউয়ালের (২০০৩) সম্পাদনায় ‘ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী : বিবর্তন ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গ্রন্থে এ উদ্যানে ৬৭২ প্রজাতির ২৫ হাজার উদ্ভিদ রয়েছে বলে উল্লিখিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান গাছ। সরকার ঘোষিত ৯৩টি হেরিটেজের মধ্যে বলধা গার্ডেন অন্যতম।

 

সংরক্ষিত ‘সাইকী’ অংশে বিদ্যমান  ভূর্জপত্র বৃক্ষ

 

উদ্ভিদরাজির বর্তমান স্বরূপ

প্রতিটি গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে লাগানো আছে টিনের নামফলক। জাপান থেকে আনা হয়েছিল ক্যামেলিয়াকে। তার বাহারি রূপ বলধাকে দিয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। বাগানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘সেঞ্চুরি প্লান্ট’। ফোটে শতবর্ষে একবার, ফুটেছিল কয়েক বছর আগে। এ ছাড়া রয়েছে শঙ্খনিধি পুকুর। আছে কৃষ্ণবট, মুচকুন্দ চাঁপা, ধূপগাছ, শ্বেত শিমুল, সুদৃশ্য আমাজন লিলি প্রভৃতি।

আমাজন লিলির রয়েছে অনন্যসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য। দুই মিটারের বেশি ব্যসার্ধের থালার মতো দেখতে লিলির পাতা অনেক পুরু ও শক্ত। রয়েছে হরেক রকমের লতা, গুল্ম, ওষধি, সৌন্দর্যবর্ধক গাছ ও দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছ শারদ মল্লিকা, লতা জবা, কনকসুধা, কণ্টকলতা, উভারিয়া, হিং, রুপেলিয়া, ভূর্জপত্র, বিরল প্রজাতির দেশি-বিদেশি ক্যাকটাস ইত্যাদি। লতা জবারা বেয়ে ওঠে অন্য গাছে, শিমগাছের মতো দোল খায় বাতাসে। বাগানের অর্কিড হাউসে প্রায় ২০০ জাতের অর্কিড সংরক্ষণ করা আছে। বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে নতুন প্রজাতির কিছু উদ্ভিদও সংযোজিত হয়েছে।  

ভূর্জপত্রের দুটি গাছ বাগানের সাইকী অংশে সংরক্ষিত আছে। কবিগুরুর বিভিন্ন লেখায় ভূর্জপত্র এসেছে বারবার। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে পাওয়া বিভিন্ন পুঁথিতেও ভূর্জপত্রের গুণকীর্তন শোনা যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি দুষ্প্রাপ্য গাছ। ভূর্জপত্রের মূল সৌন্দর্য তার বাকলে। ইতিহাসে ভূর্জপত্রের বাকল লেখনীর জন্য সুপরিচিত। বাদুড় অতি পরিচিত একটি প্রাণী হলেও শহরের প্রকৃতি থেকে আজ উধাও। তবে এই গার্ডেনে আজও দেখা মেলে শত শত বাদুড়ের। এলাকাবাসীর মতে, শতবর্ষ ধরে এ উদ্যানে বাদুড়ের বসবাস। লোকছড়ায় বাদুড়কে ভালোবেসে লেখা হয়েছে—

‘আদুড় বাদুড়, চালতা বাদুড়, কলা বাদুড়ের বে

টোপর মাথায় দে, তোরা দেখতে যাবি কে। ’

 

কেমন আছে সেই নরেন্দ্রনারায়ণের বাগান

ওয়ারী ও এর আশপাশের এলাকাকে একসময় অভিজাত এলাকা হিসেবে গণ্য করা হতো। আর এ অভিজাত এলাকার আভিজাত্য অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলধা গার্ডেন। অপ্রিয় হলেও সত্য, বেশ কিছুকাল ধরে এখানে প্রকৃতি প্রেমিক ও রুচিশীল দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা যায় না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের আদর্শ স্থানের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে বখাটে, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে। যেন একখণ্ড পতিতা পল্লী! বন বিভাগের কর্মচারীদের সেখানে দেখা মেলা ভার। ইজারাদারই এখানে সর্বেসর্বা। পরিবার-পরিজন নিয়ে কেউ প্রকৃতির শোভা দেখতে এলে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে নিঃসন্দেহে। আতঙ্কে মুহ্যমান হয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে হবে যেন কারো অশনি খপ্পরে না পড়ে। বর্ষায় গাছগুলো সবুজাভ হয়ে উঠলেও অযত্ন-অবহেলার ছাপ ও পরিচর্যার অভাব সুস্পষ্ট। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সূর্যের আলোর পরশ থেকে বঞ্চিত বৃক্ষ, উদ্ভিদরাজি উঠে আর দাঁড়াতেই পারছে না। পরিবেশের দূষণ থেকেও নিজেদের রক্ষা করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। চারপাশে উঁচু ভবন ও রাস্তা নির্মাণ হওয়ার কারণে বাগানের জমি নিচু হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। আশপাশের বর্ষার জলের সঙ্গে বর্জ্যও ঢোকে বাগানে। পরবর্তী সময় পানি শুকিয়ে গেলেও বর্জ্যগুলো রয়ে যায় বাগানেই। এসব কারণে বলধা গার্ডেনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। ‘সাইকী’ অংশে বাগানের ভেতরেই টিনের শেড দিয়ে অননুমোদিত আবাসস্থল গড়ে তুলেছেন বন বিভাগের কিছু কর্মচারী। আর সূর্যঘড়িটি তো বর্তমানে বিকল।

 

সংরক্ষিত ‘সাইকী’ অংশে থাকা আমাজন লিলি

 

বিলুপ্ত গাছের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে

এরই মধ্যে অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি হারিয়ে গেছে। গোলাপের বাগানে ছিল প্রায় ২০০ জাতের গোলাপ। এর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্ত। ছিল দুষ্প্রাপ্য বাওবাবগাছ, যা মিসরের মমিতে ব্যবহৃত হতো। এখন সেটি নেই। এমনকি বিরল সংগ্রহের একমাত্র প্যাপিরাস গাছটিও আর নেই। দুর্লভ এই গাছ দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেনের সাইকী অংশে সংরক্ষিত ছিল। বাগানের ভেতর জলাবদ্ধতার কারণে বৃষ্টির পানির সঙ্গে আসা পয়োনিষ্কাশন নালার ময়লা গাছের গোড়ায় জমে গাছটির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। একসময় দুষ্প্রাপ্য সুপারপাইন ছিল দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ। সেটিও এখন নেই। তিন-চার বছর আগে ঝড়ে একমাত্র রুদ্র পলাশগাছটি মারা গেছে। এ ছাড়া জীবনচক্র পূর্ণ করায় দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য শতবর্ষী বৃক্ষ শুগার পামের জীবনাবসান ঘটেছে। একমাত্র চন্দনগাছটিও অবহেলিত, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

 

উদ্ভিদবিজ্ঞানী, গবেষক  ও পরিবেশবিদদের দাবি

প্রকৃতিবিষয়ক লেখক, গবেষক, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের মতে, বলধা গার্ডেন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেখানে যা কিছু এখনো অবশিষ্ট আছে, তার পরিপূর্ণ সুরক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। বলধা গার্ডেনের মতো স্পর্শকাতর একটি বিশেষায়িত উদ্যানকে ইজারা দেওয়া এবং টিকিটের বিনিময়ে তা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এভাবে হারিয়ে যেতে থাকলে তখন তাদের দেখা মিলবে শুধু বইয়ের পাতায়। বাগানে এমন অনেক গাছ রয়েছে, যার দ্বিতীয়টি কোথাও সংরক্ষিত নেই। জরুরি ভিত্তিতে এই দুষ্প্রাপ্য গাছগুলোর রিপ্লেসমেন্ট করা প্রয়োজন। বর্ষায় নিয়মিত জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর অনেক গাছের মৃত্যু হচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মোতাবেক মাটি ভরাট করে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন চারা রোপণ, সযত্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে পারে।


মন্তব্য