kalerkantho


জয়িতা

‘স্তব্ধ’ মানুষগুলোর শিল্পকর্ম ও একজন নাতাশার সংগ্রাম

২১ জুন, ২০১৭ ০০:০০



‘স্তব্ধ’ মানুষগুলোর শিল্পকর্ম ও একজন নাতাশার সংগ্রাম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন নাতাশা ইসরাত কবির। এরপর ভারতের পণ্ডিচেরি সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে সাউথ এশিয়ান স্টাডিজে মাস্টার্স। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও বিচার বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন। শুধু এখানেই নাতাশার পরিচয় শেষ নয়। মূক ও বধির শিল্পীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাজিক্যাল আর্টস অব সাইলেন্স।’ মূক ও বধির শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে নাতাশার একজন সংগ্রামী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প জানাচ্ছেন কবীর আলমগীর

 

নাতাশার কর্মী বহর মোট ১০ জন। এর মধ্যে ছয়জনই মূক ও বধির। সমাজের মূল স্রোত যখন গতিশীল তখন এই মূক ও বধির মানুষগুলো সমাজের কাছে স্থির! আশপাশের অগণিত মানুষ যখন মুখ ফুটে তাঁদের স্বপ্নের কথা বলছেন তখন এই মানুষগুলো স্তব্ধ। সমাজের কেউ যখন অন্য মানুষের কাছ থেকে স্বপ্নের কথাগুলো শুনছেন তখনো এসব মানুষ স্তব্ধ। কারো বাক্শক্তি নেই, কারো শ্রবণশক্তি নেই, কেউ বা শারীরিক প্রতিবন্ধী। এসব ‘স্তব্ধ’ মানুষ নিয়েই সংগ্রাম নাতাশা ইসরাত কবিরের।

সমাজের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এরা একেকজন স্তব্ধ মানুষ হলেও শিল্পের বিচারে এরা সবাই শিল্পী। তারা কথা না বলতে পারলেও তাদের শিল্প কথা বলে ওঠে! কেউ ছবি আঁকে রংতুলি নিয়ে, কেউ হাতের কাজ করে, কেউ বানায় পেপার ক্রাফট, আবার কেউ নানা রঙের বাহারি গয়না। সবই বানানো হয় ক্রেতাদের চাহিদামতো। এরপর সেগুলো বিক্রি করে অর্থের জোগান করেন নাতাশা।

কিভাবে এই চিন্তার যাত্রা শুরু জানতে চাইলে নাতাশা বলেন, ‘আমি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যালামনাই। ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ব্রিজ ফাউন্ডেশন গড়ে তুলি। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা হিসেবে একটা প্রজেক্ট উপস্থাপন করি। তা ছিল মূক ও বধিরদের কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন করে তোলা, তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে যাতে তারা সমানতালে এগোতে পারে কিংবা মূলধারায় মিশতে পারে। ওটা ছিল এক বছরের প্রজেক্ট। আইটি খাতের সেই কাজটি করতে গিয়ে আমার ভেতর উপলব্ধি আসে যে কোথাও যেন একটু ঘাটতি রয়ে গেছে। এই যে এদের তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান দিচ্ছি, কিন্তু এই চর্চাটা অব্যাহত না থাকলে তারা একসময় ভুলে যাবে। এর মধ্যে আমাদের প্রকল্পও শেষ। চিন্তা করলাম এসব মূক ও বধির মানুষ নিয়ে ভিন্ন কিছু করা যায় কি না? এর মধ্যে যারা শিল্পী হতে চায় বা শিল্পের প্রতি ঝোঁক ছিল তাদের আলাদা করে আমার কাজটি শুরু করলাম।’ নাতাশা ভাবলেন স্বপ্নটা আকাশছোঁয়া। একার এই যাত্রায় দরকার অন্য কোনো সহযোগী। তিনি আইডিয়াগুলো শেয়ার করলেন অন্য সহযোদ্ধা স্বর্ণময়ী সরকারের সঙ্গে। স্বর্ণময়ী সরকার ঢাকা সিটি কলেজে মাস্টার্স পড়ছেন। তিনিও এগিয়ে এলেন, দাঁড়ালেন নাতাশার পাশে।

স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নাতাশা খোঁজ লাগালেন ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে। খুঁজতে শুরু করলেন স্কুলগুলোয় কোনো মূক ও বধির পাওয়া যায় কি না? সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নাতাশা বলেন, ‘কোনো কোনো স্কুল থেকে আমরা উৎসাহ পেয়েছি, কেউ কেউ আমাদের প্রেরণা দিয়েছে, সাহস দিয়েছে, আবার কোনো কোনো স্কুল থেকে রেসপন্সটা সেভাবে পাইনি। অবশেষে বিজয়নগরে মূক ও বধির স্কুলে গেলাম। স্কুলটি সরকারি এবং সেখানে আমরা বেশ কিছু সমস্যা খুঁজে পেলাম। ভাবলাম এখানকার শিক্ষার্থী দিয়ে আমরা আমাদের কাজটি শুরু করতে পারি। এরপর কয়েকজনকে বাছাই করলাম।’ নাতাশা বললেন, ‘এখন এই কর্মী বহরের কেউ কেউ গ্রাফিকস কলেজ থেকে পাস করে বের হয়েছে। আবার মাশিয়াত তানিন নামে এক কর্মী পড়ছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভে (ইউডা)।’ মূক ও বধির কর্মীদের বাছাই করার পর নাতাশা ভাবলেন, এদের শিল্প সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু জ্ঞান দরকার। যোগাযোগ করলেন চারুকলার কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। এগিয়ে আসেন শিল্পী নাজিব তারেক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক শিশির ভট্টাচার্য, ফটোগ্রাফি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান কাউন্টার ফটো ও নেদারল্যান্ডস এমবাসি। মূলত এদের মাধ্যমে শিল্পের প্রথম পাঠ অর্জন করল মূক ও বধির সহকর্মীরা।

এখন এই স্তব্ধ মানুষরা শিল্পে গতিশীল। এরা এখন মন-মননে শিল্পী, এরা শিল্পের ভাষায় ফুটিয়ে তোলে তাদের স্বপ্নের কথাগুলো। নাতাশা বললেন, ‘এদের কেউ ছবি আঁকে, কেউ পেপার ক্রাফট বানায়, কেউ বানায় মাটির গয়না, কেউ উলের কাজ করে, কেউ মাটি বা তৈজসপত্রে ছবি আঁকে, কেউ বানায় কাগজের গিফট বক্স।’ কাজের অর্ডার কিভাবে হয় জানতে চাইলে নাতাশা বলেন, ‘এদের একেকজনের ঝোঁক একেক দিকে। সেই ঝোঁকের বিষয়টি মাথায় রেখেই মূলত কাজের অর্ডার নেওয়া হয়।’ নাতাশা বললেন, ‘শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চলার পথটি মসৃণ নয়। শিল্পের বিনিময়ে যে অর্থ আসে তা উপকরণ কেনা ও আনুষঙ্গিক খরচেই চলে যায়।’

নাতাশা আরো বলেন, ‘আমার এই কর্মী বহরকে আমি নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় বসিয়ে কাজ করাতে পারি না। কারণ আমার কোনো অফিস নেই, কোনো জায়গা নেই। এ কারণে কর্মীরা যার যার বাসায় থাকে। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে কাজের ধরনটা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাশিয়াত তানিম আছে। কথা বলাটা অস্পষ্ট, তার পরও সে থেমে নেই, দোভাষীর কাজটা সে-ই করে। মাশিয়াতের স্বামী তাইফুর রহমানও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করে থাকেন বলে জানান নাতাশা। তিনিও মাশিয়াতের মতো হেয়ারিং এইড ব্যবহার করেন। পেশাদার দোভাষীর খরচ অনেক আর সে জায়গায় এখন তারাই কাজ করছে।’

উপকরণ বিক্রি সম্পর্কে নাতাশা জানান, কর্মীদের আঁকা জলরং বিক্রি করেন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়, স্কেচ বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়, তেলরং বিক্রি হয় তিন হাজার ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। এ ছাড়া অন্যান্য উপকরণ বিক্রি হয় ২০ টাকা থেকে রকমভেদে ৫০০ টাকায়। নাতাশা বলেন, ‘আমার কর্মীদের কাছ থেকে তাদের কাজগুলো কিনে নিই। এরপর আমি সেটার দাম সমন্বয় করে বিক্রি করি। এদের নিয়ে কাজ করা সহজসাধ্য নয়। কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এদের অনুকূলে নয়। এখনো আমাকে শুনতে হয়, আচ্ছা আপু, আপনার এই কর্মীগুলো কি পাগল? এ ছাড়া শিল্পের কদর দেওয়ার মতো লোক আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। যখন কোনো উপকরণ বিক্রি করি তখন সেখানে দরদাম

করেন কোনো কোনো ক্রেতা। আমি বোঝাতে পারি না শিল্পের দাম দরদাম করে হয় না। এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে সমাজের অবহেলিত মানুষগুলোর অনেক শ্রমের আখ্যান।’

তবে হতাশার মধ্যেও আশাবাদের খবর আছে। তা হলো, এসব স্তব্ধ মানুষের শিল্পকর্মের কিছু কিছু কিনেছে মেক্সিকোয় বাংলাদেশ হাইকমিশন, নেদারল্যান্ডস এমবাসি, শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশি হাইকমিশন, ব্রিটিশ কাউন্সিল। এ ছাড়া বিদেশের মাটিতে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন নাতাশা। ইতালির এক কালচারাল নাইটে ২০১৬ সালে দুই ঘণ্টায় নাতাশা বিক্রি করেছেন ২৫০ ইউরোর শিল্পকর্ম, একই বছর ব্যাংককে এক প্রদর্শনীতেও বেশ সাড়া পেয়েছেন।

এসব ইতিবাচক সাড়ায় অগণিত স্বপ্নের বীজ বুনে চলেছেন নাতাশা। ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে নাতাশা বলেন, ‘আমি এসব মানুষকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্ট দিতে চাই। মূক ও বধির মানুষরা এখানে রান্না করবে, খাবার সরবরাহ করবে। এরাই চালাবে আমার রেস্টুরেন্ট। এ ছাড়া রেস্টুরেন্টের পাশে কোনো একটা রুম থাকবে, যেখানে প্রদর্শনী ও বিক্রির জন্য থাকবে তাদের নিজের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম।’ আর এর জন্য নাতাশার দরকার প্রায় ছয় লাখ টাকা। কোনো বিনিয়োগকারী পেলে নাতাশার স্বপ্ন পূরণের পথ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

 



মন্তব্য