kalerkantho


ইতিহাসের খেরোখাতা

আধুনিক গুলশানে ভোলা গ্রামের খোঁজে

আপেল মাহমুদ   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



আধুনিক গুলশানে ভোলা গ্রামের খোঁজে

ছবি : মঞ্জুরুল করিম, ছবি : লুৎফর রহমান

ভোলাকে গুলশান বানানো হলেও সেই গ্রামের দুটি স্মৃতি এখনো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। এর একটি মসজিদ, আরেকটি স্কুল।

মসজিদটি গুলশান এভিনিউয়ে স্থান পেলেও স্কুলটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বাড্ডায়

 

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় আন্ধারমানিক নামে একটি গ্রাম রয়েছে। ঢাকা থেকে উদ্বাস্তু অনেকেই সেই গ্রামে বসবাস করছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু হয়েছে। অধিগ্রহণের ফলে বিভিন্ন সময় ঢাকার আদি বাসিন্দারা ঘরবাড়ি হারিয়ে সেখানে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তেমনই একজন আখলাকউদ্দিন শেখ। ৯০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ জানালেন, তাঁর আদি বাড়ি ছিল ঢাকার ভোলা গ্রামে। ১৯৫০ সালের পর তাঁদের বাড়িঘর অধিগ্রহণ করার ফলে সেই গ্রামের বাস্তুভিটা ছাড়তে হয়েছে।

আখলাকউদ্দিনের কাছ থেকে ভোলা গ্রামের কথা জেনে তার খোঁজ করতে থাকি। বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও পুরনো দলিলপত্র কিংবা পরচায় ভোলা সামাইর নামে গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

স্থানীয় তহশিল অফিসে তল্লাশি করে মৌজা হিসেবে ভোলা সামাইর নামটি জানতে পারি। দেশের সবচেয়ে অভিজাত আবাসিক এলাকা আজকের গুলশানই হলো ভোলা গ্রাম। পাকিস্তান আমলে গ্রামটি অধিগ্রহণ করে সেখানে ১৯৬১ সালের দিকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেন ডিআইটির (ঢাকা ইমপ্রুুভমেন্ট ট্রাস্ট) প্রথম চেয়ারম্যান পাকিস্তানি আমলা জি এ মাদানি।

ঢাকার ঐতিহাসিক ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের বিবরণ থেকে জানা যায়, গুলশানকে একটি আধুনিক উপশহর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবে রূপ নিতে অনেক দিন লেগে যায়। ফলে গুলশান একসময় একটি ইউনিয়ন ও পরে পৌরসভায় পরিণত হয়। ১৯৭২ সালের দিকে গুলশানসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত হয় গুলশান থানা। ১৯৮২ সালে গুলশান পৌরসভাকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তখন থেকে গুলশান ঢাকা পৌরসভার একটি ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে ওঠে। উল্লেখ্য, গুলশান ইউনিয়ন ও পৌরসভা প্রশাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ এমপি।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভোলা সামাইর গ্রামের ক্ষেতখামার ভরাট করে আর গাছপালা কেটে আধুনিক গুলশান গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শত শত পরিবার তাদের আদি বাসস্থান হারায়। এদের বেশির ভাগই ঢাকার অদূরে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। অনেকেই বাড়িঘর, জমিজমা হারিয়ে নতুন করে আর গৃহস্থ হতে পারেনি। ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা কুলি-মজুরের জীবন যাপন করে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তার বংশধরদের অবস্থাও করুণ। অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন যাপন করছে। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!

রূপগঞ্জের নাওয়ারা গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস খাঁ বলেন, ‘আমার বাবা হরমুজ খাঁ ভোলা গ্রামে প্রায় ১০০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন। গুলশান এলাকা গড়ে তোলার সময় সব জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সেই অধিগ্রহণের এক টাকাও আমার পরিবার পায়নি। আমরা তখন বয়সে ছোট। অনেকটা খালি হাতে বাবা রূপগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অন্যের বাড়িতে রাখালের কাজ করে তাঁর জীবন কেটেছে। তাঁর সন্তান হিসেবে আমরা এখন দিনমজুরের কাজ করছি। ভোলা গ্রামের সেই পুরনো বাড়ি, পুকুর, খেলার মাঠ, ধানি জমি, তরিতরকারির বাগ আর গাছগাছালির কথা মনে হলে আমার দুই চোখ বেয়ে পানি ঝরে। ’

ভোলাকে গুলশান বানানো হলেও সে গ্রামের দুটি স্মৃতি এখনো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। এর একটি মসজিদ, আরেকটি হলো স্কুল। মসজিদটি গুলশান এভিনিউয়ে স্থান পেলেও স্কুলটি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাড্ডায়। মসজিদটির নাম ভোলা জামে মসজিদ। আনুমানিক ১৮৭৫ সাল এর প্রতিষ্ঠাকাল। আর স্কুলটির নাম ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৯২৫ সাল। প্রথমে মাটির ঘরে মসজিদটির সূচনা হলেও পরে তা পাকা করা হয়। বর্তমানে এটি গুলশান জামে মসজিদ নামে পরিচিত। ওই মসজিদের সামান্য উত্তর দিকে গুলশান আজাদ মসজিদ। ওই মসজিদটি ১৯৭৬ সালে গড়ে ওঠে। মূলত গুলশানের প্লটগুলোতে বাড়িঘর নির্মিত হতে থাকলে আজাদ মসজিদটি গড়ে তোলা হয়। অথচ ওই মসজিদ থেকে কয়েক শ গজ দূরেই ভোলা মসজিদটির অবস্থান। নতুন করে আজাদ মসজিদ নির্মাণ না করে ভোলা মসজিদ কমপ্লেক্স হিসেবে বৃহদাকারে গড়ে তোলা যেত বলে অনেকেই মনে করেন। এমনকি বর্তমান গুলশান এভিনিউটির নাম ভোলা এভিনিউ নামকরণ করে পুরনো ইতিহাসকে সম্মান জানানো যেত বলেও স্থানীয় কারো কারো অভিমত শোনা যায়।

কৃষিপ্রধান এলাকা ছিল পুরনো ভোলা গ্রাম। সেখানকার বেশির ভাগ মানুষই নিজের জমি চাষাবাদ, অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে কিংবা গরু চরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। এর মধ্যে লেখাপড়া করা মানুষের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এ কারণে গুলশানে শতবর্ষী কোনো স্কুল-কলেজের সন্ধান পাওয়া যায় না। এর মধ্যে ভোলা গ্রামে ১৯২৫ সালে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়। সেখানে স্থানীয় অনেকেই পড়াশোনা করেছে। কিন্তু গ্রামের জমি অধিগ্রহণের সময় স্কুলটি বেশ কিছু সময় বন্ধ করে রাখা হয়। পরে ভোলা গ্রামের পূর্ব পাশে বাড্ডা গ্রামে সরিয়ে আনা হয়। কিন্তু নাম সেই ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই রাখা হয়।

দক্ষিণ বাড্ডায় অবস্থিত সে স্কুলের সামনে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেবের সঙ্গে। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, বাড্ডায় অবস্থিত ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠল কিভাবে? জবাবে জানালেন, ‘আমার জন্ম বাড্ডায়। কিন্তু স্কুলের নামটি কেন ভোলা হলো, সেটা ঠিক করে বলতে পারছি না। তবে শুনেছি, গুলশানের আগের নাম ছিল ভোলা। হয়তো গুলশান থেকে সরিয়ে আনা ভোলা স্কুলটিই এখানে আশ্রয় পেয়েছে। ’

একাধিক ইতিহাসবিদ জানান, নগরায়ণের ফলে ঢাকার অনেক গ্রামই আধুনিক নামের আড়ালে তলিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের স্বার্থে পুরনো নামগুলো টিকিয়ে রাখা উচিত। অন্তত প্রতিটি এলাকার একটি রাস্তার নাম দেওয়া উচিত সেই পুরনো নামে। কিংবা কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম দিয়ে হারিয়ে যাওয়া গ্রামটিকে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়। এটা হবে ইতিহাসের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা।

 


মন্তব্য