kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

মামাই জানে ঠকলাম কি না

আবুল হাসান রুবেল   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



মামাই জানে ঠকলাম কি না

কার্টুন : মাসুম

শত শত রসিকতার গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকায়। এভাবেই রঙ্গ-রসিকতা, হাসি-কান্নার ভাগাভাগিতে ঢাকায় যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাতেও এখন জোর পরিবর্তনের বাতাস বইছে। নতুন গড়ে ওঠা সুপারশপ আর বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার অনলাইনভিত্তিক নানা ব্যবস্থা হয়তো নগরবাসীর ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে সংগতি রেখেই নতুন করে বিকশিত হচ্ছে। হয়তো তাতে তাদের কিছু স্বাচ্ছন্দ্যও তৈরি হচ্ছে। তবে সেটা পুরনো এই জ্যান্ত আন্তরিক সম্পর্কের দামেই হচ্ছে

 

নগরে একটা প্রধান সম্পর্ক হলো ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক। যারা গ্রাম থেকে শহরে আসে, তাদের প্রথম যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, হয়তো সে একজন মুদি দোকানি। এমনকি যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে নগরে বসবাস করছে, তাদের ক্ষেত্রেও এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কেননা পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক নগরে অপেক্ষাকৃত শিথিল। সাধারণভাবে নগরের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে গ্রাম। সেই খাদ্য গ্রামে কেনা ছাড়াও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু নগরে তা কিনেই খেতে হয়। আর নগর শিল্পোৎপাদনের কেন্দ্র, যা বিক্রেতার মারফতই নগরীর অধিবাসীদের হাতে আসে।

ফলে জীবনযাপনের জন্য নগরের অধিবাসীদের কিনতেই হয়। আর কেউ কিনলে কাউকে না কাউকে তো বেচতেও হয়। কোনো না কোনোভাবে নগর বিকিকিনির একটা সম্পর্কে তাকে যেতেই হয়। ঢাকা শহর সেদিক থেকে কোনো ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ঢাকা আবার অন্য দিক থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমও বটে। ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক বললেই যে নীরস আবেগহীন শুধু হিসাব-নিকাশের সম্পর্ক ভেসে ওঠে কল্পনায়, ঢাকা সে রকম নয় মোটেও। সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে তা শুধু আটকে থাকেনি; বরং এই শহুরে সম্পর্কেও একটুকরো গ্রাম ঢুকে পড়েছে যেন আন্তরিকতার রূপ নিয়ে।

প্রায়ই দেখা যাবে দোকানদার আর ক্রেতা যেন দোস্ত—কখনো মামা, খালা, চাচা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন চা-বিক্রেতা-নির্বিশেষে সবাই মামা বা ভাই ছিল। রিকশাওয়ালা মামা বা চাচা। পাশের মুদি দোকানি সাধারণত ভাই। এ রকমই নানা সম্পর্কের জালে আবদ্ধ ঢাকার ক্রেতা-বিক্রেতারা। তাই বলে মনে করার কারণ নেই যে এখানে জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে লাভের বেলায় বেশ ছাড় দেয় দোকানিরা; বরং এই সম্পর্ক তার ক্রেতা ধরে রাখার সহায়ক। যদিও সরাসরি ক্রেতা ধরে রাখার উদ্দেশ্য সচেতনভাবে তারা এটা করে না। কিন্তু এই সম্পর্ক ছাড়া এখানে ব্যবসা করা বেশ মুশকিল। এটা এখানকার ব্যবহারের সাধারণ রীতি হয়ে উঠেছে। বাজার মানেই যেহেতু ঠকা বা জেতা, কাজেই সেটা তো থাকবেই। কিন্তু সেটাও একটা রসের উপাদান হয়ে উঠেছে ঢাকায়। মুলামুলি বা দরাদরি ঢাকার ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কে একটা বিশেষ দিক হয়ে আছে। সেটা নিয়ে অনেক রস-রসিকতাও তৈরি হয়েছে। অনেক দিন আগে একটা গল্প শুনেছিলাম, এত দিন পর উৎস মনে নেই। তবু গল্পটা বলি। ‘এক ভাগনে ঢাকায় এসেছে বেড়াতে। সে বঙ্গবাজার যাবে জিন্সের প্যান্ট কিনতে। মামা বলে দিয়েছে, বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা ভয়ংকর ঠকায়। কাজেই যা দাম বলবে, তুই তার অর্ধেক দিয়ে শুরু করবি। কোনোমতেই বাড়বি না, বুঝেছিস? তো হুঁশিয়ার ভাগনে গেল বঙ্গবাজারে। প্যান্ট পছন্দ করে দাম জিজ্ঞেস করল। দোকানি দাম বলার পর সে অর্ধেক বলে গোঁ ধরে থাকল; এর বেশি সে দেবে না। দোকানি অনেক রকম দাম বলল, এমনকি তার বলা দামের চেয়ে ২০ টাকা বেশি দিয়ে নিয়ে যেতে বলল। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। অবশেষে সেই দামেই দিতে সে রাজি হলো। কিন্তু সমস্যা হলো দোকানি সেই দামে রাজি হওয়ার পর সেটা তো দোকানির দাম হয়ে গেল। ঠকার ভয় তাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তখন সে তারও অর্ধেক দাম বলল। দোকানি তখন বিরক্ত হয়ে বলল, ঠিক আছে এই দামেই লইয়া যান। তখন আবার পুরনো ঠকার আশঙ্কা মাথায় নড়ে উঠল তার। সে তখন তারও অর্ধেক দাম বলল। দোকানি ততক্ষণে বিষয়টা রগড় হিসেবে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত দোকানি তাকে জিনিসটা মাগনা দিতে রাজি হয়ে গেল। তখন তার মনে হলো—আচ্ছা, একটা দিয়ে ঠকাচ্ছে না তো? আমার কি দুইটা চাওয়া উচিত না? কিন্তু দোকানি সে পর্যন্ত আর সহ্য করতে পারল না। প্যান্টটা হাতে ধরিয়ে তাকে ভাগিয়ে দিল। তখন সে ফিরছে আর ভাবছে, মামাই জানে ঠকলাম কি না। ’

এই গল্পটা হয়তো একটু রং চড়ানো। কিন্তু বাস্তবে যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলোও কিন্তু কম নয়। এইতো কয়েক দিন আগে হাতিরপুল বাজারে বাজার করছি সন্ধ্যার পর। মাছের বাজার। বাজারের সব মাছ ব্যবসায়ীই মোটামুটি চেনে আমাকে। জানে আমি কম পয়সার কাস্টমার। ফলে আমাকে নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আমার পাশেই এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বাজার করছেন। আর মাছ ব্যবসায়ীরা তাঁকে নানাভাবে খাতির করছে। হাতিরপুল বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের বিপণন-দক্ষতা মোবাইল কম্পানির বিজ্ঞাপন-দক্ষতার চেয়ে কম নয়। দেখে মনে হচ্ছে, তারা ভদ্রলোককে গেঁথে ফেলবে। কী হয় দেখার জন্য আমি একটু অপেক্ষা করছি। তারা নানাভাবে ইলিশের রূপ, গুণ, আভিজাত্য বর্ণনা করে যাচ্ছে। কিন্তু ভদ্রলোকের মুখে কেমন একটা মিটিমিটি হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম, তিনিও বেশ সেয়ানা লোক। আর সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর দেখার মজাই আলাদা। তো, দোকানিরা নেহাতই জলের দরে এক হালি মাত্র ২০ হাজার টাকায় এই অভিজাত ইলিশগুলো ছেড়ে দিতে চাচ্ছে শুধু সেই ভদ্রলোককে সম্মান করে। ভদ্রলোক করলেন কি, বললেন ইলিশগুলো মাছের পাত্রে সুন্দর করে সাজাতে। তারপর তাঁর দামি সেলফোন দিয়ে একটা ছবি তুললেন মাছগুলোর। জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছবির জন্য কত দিতে হবে?’ বাজারে হাসির রোল পড়ে গেল। তখন তিনি বললেন, ‘না, তোরা যেভাবে ইলিশের রূপ, গুণ বর্ণনা করছিলি, তাতে ভাবলাম এইটা ক্যাটরিনা টাইপ কিছু হইব। তাগো তো আর ঘরের বউ কইরা লইয়া যাইতে পারুম না, তার চাইতে ছবি লইয়া যাই, ঘরে টাঙায়ে রাখুম নে। ’ তাঁর কথা শুনে আমিও আর নীরব দর্শক থাকতে পারলাম না। হেসে উঠলাম হো হো করে। এগুলো ক্রেতার দিক থেকে করা রসিকতা। কিন্তু আসলে বেশি রসিকতা প্রচলিত বিক্রেতার দিক থেকেই।

এখানে খুব বেশি লম্বা করার সুযোগ নেই। তবু একটা গল্প বলার লোভ সামলানো যাচ্ছে না। এক লম্বা ভদ্রলোক আম কিনতে গেছেন। তিনি বলছেন, ‘আম কেমন, ভালো? খুব ছোট মনে হয়। ’ তখন বিক্রেতা বলছে, ‘একটু নিচে নাইমা দেহেন। অত ওপর থন দেখলে ছোট ভি মনে হইব। ’ তখন ক্রেতা নিচু হয়ে টিপেটুপে দেখতে শুরু করল। তারপর রায় দিল, আমগুলো মিষ্টি নয়। বিক্রেতা তখন জোর গলায় বলে উঠল, ‘ছাবধান! আমের ডাক্তর আইছে, নাড়ি টিইপ্যা কইয়া দিতাছে আম মিষ্টি নিহি। ’

এ রকম শত শত রসিকতার গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকায়। এভাবেই রঙ্গ-রসিকতা, হাসি-কান্নার ভাগাভাগিতে ঢাকায় যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাতেও এখন জোর পরিবর্তনের বাতাস বইছে। নতুন গড়ে ওঠা সুপারশপ আর বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার অনলাইনভিত্তিক নানা ব্যবস্থা হয়তো নগরবাসীর ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে সংগতি রেখেই নতুন করে বিকশিত হচ্ছে। হয়তো তাতে তাদের কিছু স্বাচ্ছন্দ্যও তৈরি হচ্ছে। তবে সেটা পুরনো এই জ্যান্ত আন্তরিক সম্পর্কের দামেই হচ্ছে।


মন্তব্য