kalerkantho


ঢাবির ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শ দপ্তরে কাউসেলিং সেবা

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও বিষণ্ন শিক্ষার্থীরা ফিরছে স্বাভাবিক জীবনে

রফিকুল ইসলাম   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও বিষণ্ন শিক্ষার্থীরা ফিরছে স্বাভাবিক জীবনে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের শিক্ষার্থী রোজিনা আক্তার (ছদ্মনাম)। দিনমজুর পরিবারের মেয়ে রোজিনা মেধার স্বাক্ষর রেখে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অচেনা শহরে কোনো কূল-কিনারা করতে পারছিলেন না। কোনোমতে থাকা যায় এমন একটি মেসে ওঠেন। একবুক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর মুখোমুখি হতে হয় আর্থিক সংকটের। অন্য সবার মতো চলতে পারতেন না। অর্থনৈতিক সংকট ও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় ক্রমেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হতাশার মাত্রা বাড়তে বাড়তে অনেকটা বিকারগ্রস্ত হয়ে যান। সামনের পথ ‘অন্ধকার’ দেখে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। তবে বান্ধবীদের চেষ্টায় এযাত্রা বেঁচে যান। সহপাঠীদের সহযোগিতায় রোজিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরে যোগাযোগ করেন।

সেখান থেকে কাউন্সেলিং সেবা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ। টিউশনির ব্যবস্থা হয়েছে, এখন নিজের আয়েই চলতে পারেন রোজিনা।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অন্য একটি বিভাগের মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। ক্যাম্পাসে একসঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি ও দিনভর নানা খুনসুটির সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার শেষ দিকে ভালোবাসার মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। হঠাৎ নয়, পারিবারিক আলোচনায়। বিয়েতে মেয়েটির অমত ছিল। কিন্তু পরিবারের চাপে সেই ইচ্ছা টিকতে পারেনি। মেয়েটির বিয়ে হওয়ার পর শরিফ অনেকটা একা হয়ে যান। কোনো বন্ধুর সঙ্গে তিনি মেশেন না। ক্লাসেও ঠিকমতো যান না। কখনো কখনো তিনি ঠিকমতো খানও না। কোনো উপায় না দেখে শরিফের বন্ধুরা তাঁকে ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরে কাউন্সেলিং সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে সমস্যার কথা বিস্তারিত খুলে বলেন। পরামর্শদান দপ্তরের সাহায্যে এখন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছেন।

শুধু শরিফ কিংবা রোজিনা নয়, প্রতিবছর এমন মানসিক বিকারগ্রস্ত কিংবা হতাশায় থাকা শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং সেবা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছে ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তর। আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীকে খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা করছে। কোনো ভয় কিংবা হুমকিতে থাকা শিক্ষার্থীকে মানসিক সেবা দিয়ে সুস্থ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যার আকার বড় হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়। আর মানসিক যেকোনো সমর্থন দিয়ে থাকে পরামর্শদান দপ্তর।

দপ্তরটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর শিক্ষার্থীরা নানামুখী সমস্যায় পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম থেকে আসা মেয়েরা বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন। অর্থনৈতিক সমস্যা, বসবাস, ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া ও সহপাঠীদের নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সমস্যার কথা বলতেও পারেন না। নিজের দুর্বলতার কথা অন্যকে বলতেও দ্বিধা করেন। তবে নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সমস্যা খুলে বললে মানসিক সেবা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীদের সমস্যাই বেশি আসে। সব ধরনের বিশেষজ্ঞ আছেন, সমস্যা বুঝে সমাধান দেওয়া হয়। প্রতিবছরই অনেক শিক্ষার্থীর সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে ২৮৯ জন ছাত্র-ছাত্রীকে মনোচিকিত্সাসেবা প্রদান করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেন, এ বছর গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২৮৪ জনকে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। এখানে আসা সমস্যার মধ্যে বেশির ভাগই প্রেমঘটিত, আর্থিক সমস্যা, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা ও রাগ নিয়ন্ত্রণ। কারো কারো ক্ষেত্রে ভিন্নতাও আছে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সমস্যার ধরন ঘুমের সমস্যা, পড়ার বিষয় ইচ্ছামতো না পাওয়া (কেউ আইন পড়তে চায়, কিন্তু সে পেয়েছে ইতিহাস), মাদক গ্রহণ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রভৃতি।

ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের কাউন্সেলর সাইফুন্নেসা জামান বলেন, ‘যেকোনো শিক্ষার্থী সমস্যা মনে করলেই সেবা নিতে পারে। কাউন্সেলিং সেবার মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো পড়াশোনাও করছে। ’ শিক্ষার্থী শরিফ বলেন, ‘জীবনে ওই ধাক্কাটি ছিল অনেক বড়। পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। কিছুই করতে পারতাম না। ক্লাস-পরীক্ষা সব বাদ দিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম। ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরে গিয়ে পরামর্শসেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছি। ’ শিক্ষার্থী রোজিনা আক্তার বলেন, ‘এতটাই হতাশাগ্রস্ত হয়েছিলাম, যাতে আত্মহত্যাও করতে উদ্যত হয়েছি। দিনের পর দিন কাউন্সেলিং সেবা নিয়ে এখন সুস্থ। ’ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে কেউ সমস্যা কিংবা বিপদে পড়লে এই সেন্টারে গিয়ে সেবা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেকোনো শিক্ষার্থী ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তর থেকে নির্দেশনা, পরামর্শ ও কাউন্সেলিং সেবা নিতে পারেন। ১৯৬২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সেবা চালু রয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা কোনো শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়েই খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা ও মানসিক সমস্যা কিংবা যেকোনো পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করে এই দপ্তর। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা মাসে ৩০ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে এক হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা এই খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়।

প্রতি রবি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করে। একজন কাউন্সেলর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২৬ জন শিক্ষার্থী এই কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করেন। ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যা ও সেবা প্রদানে মনোচিকিত্সা ও কাউন্সেলিং প্রদান করেন। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের তৃতীয় তলার পূর্বাংশে এই দপ্তর অবস্থিত।


মন্তব্য