kalerkantho


একলা ঘর আমার দেশ...

মারুফা মিতু

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



একলা ঘর আমার দেশ...

ছবি : কাকলী প্রধান

‘তুমি একা মেয়ে থাকবে?’ ফ্ল্যাট মালিকের চোখ কপালে।

‘কেন, আমি তো থাকতেই পারি। আপনার ভাড়া ঠিকমতো দিলে, বাসায় কোনো বিশৃঙ্খলা না করলেই তো হলো। ’ তানিয়ার উত্তর।

‘না না, আমরা কোনো ব্যাচেলরকে বাসা ভাড়া দিব না। তা-ও আবার মেয়ে। ’ একরকম মুখের ওপরই দরজা বন্ধ করে দিলেন ফ্ল্যাট মালিক। বিষণ্ন মনে আবারও নতুন ‘টু-লেট’ এর সন্ধানে বের হতে হয় তানিয়াকে।

তানিয়া এখানে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। রাজধানীতে তাঁর মতো এমন নারী-তরুণীর অভাব নেই, যাঁরা চাকরির কারণে, নয়তো পড়াশোনার জন্য নগরে একা থাকেন। এই একা নারীরা কেউ কেউ মেসবাড়ি অথবা সাবলেট হিসেবেও থাকেন।

আবার যাঁরা স্বাবলম্বী, আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাঁরা নিজেদের জন্য একটা আলাদা বাসাই খোঁজেন। কিন্তু তানিয়ার মতো এমন বিষণ্ন ভাবনা অনেককেই ঘিরে থাকে।

 

এই আমি একলা আমি। পড়াশোনার কারণেই হোক, কর্মক্ষেত্রের কারণে কিংবা জীবনে চলার পথে কোনো জটিলতার বাঁকে একা থাকার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয় নারীকে। একা থাকা। সেখানে থাকে সুখ, থাকে জড়তাও। এই শূন্যতার সৃষ্টি কখনো ইচ্ছাকৃত, কখনো অনিচ্ছাকৃত। পৃথিবীব্যাপী অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা একা আছেন, একাই থাকেন। অনুভূতির পাল্লাটা তাঁদের ভারী, কারো সঙ্গে ভাগ না করার কারণে।

বিবাহিত মেয়েদেরও সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া চোখে পড়ে। সে ক্ষেত্রে পরকীয়া, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন—এ সবই দায়ী। কেউ কেউ আবার কাঙ্ক্ষিত মানুষকে না পেয়ে বিয়েই করেন না কোনো দিন। আবার কেউ কেউ একা থাকতে বেশি ভালোবাসেন। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি একা থাকে এবং এই হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমাদের দেশে মেয়েদের এই একক জীবনযাপন খুব সহজ নয়—সে যত উচ্চপর্যায়েরই হোক না কেন। ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে তার রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক ভোগান্তি। নিঃসঙ্গতা, একঘেয়ে সময় কাটানো, অসুখবিসুখে যত্নহীনতা—এগুলো ব্যক্তিগত ভোগান্তি। মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যন্ত্রণা ধেয়ে আসে, একঘেয়ে লাগে। তখন হয়তো সেভাবে একান্ত কাউকে পাওয়া যায় না। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যাওয়া থেকে শুরু করে সব খরচের ভার নিজেরই। তখন মনে হয় কেউ থাকলে কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকা যেত।

সামাজিক দিক থেকেও যেন ভোগান্তির শেষ নেই। মানুষের বাজে সন্দেহ, কটূক্তি, বিয়ে সম্পর্কিত নানা উল্টাপাল্টা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। সমাজের বাঁকা চোখ উপেক্ষা করে কোনো পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠানেও যাওয়া হয়ে ওঠে না।

পশ্চিমা দেশগুলোতে অবিবাহিত মেয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। সেখানে মোট নারীর প্রায় অর্ধেক অবিবাহিত থাকে। ২০১০ সালে জাপানে ৩০ বছর বয়সী এক-তৃতীয়াংশ নারী অবিবাহিত থেকে গেছে এবং তাদের বিয়ে না করার সম্ভাবনাই বেশি। বিয়ের আগেই তারা লিভ টুগেদারে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সমাজ তাদের অনায়াসে সেই সমর্থন দেয়। বিয়ে ছাড়াই তারা সংসার করে, সন্তান জন্ম দেয়। সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, এশিয়ার মেয়েরা একা থাকে, আবার সচরাচর লিভ টুগেদারে জড়ায় না। জড়ালেও সেটা প্রত্যক্ষ নয়। কারণ, সমাজ এটা ভালো চোখে দেখে না।

একা জীবনযাপনের ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। ভালো দিকগুলোর মধ্যে পড়ে বন্ধু-আড্ডা, নিজস্ব রুচিবোধ, স্বাধীনতা, সিদ্ধান্তের একক প্রাধান্য, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন। আর মন্দ দিকগুলো হলো অসুখবিসুখ, বিপদ-আপদে কাছের মানুষ না পাওয়া। তা ছাড়া বাইরে থেকে কাজ করে এসে সন্ধ্যায় তালা খুলে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করার তিক্ত অনুভূতি। সেই মুহূর্তে স্বভাবতই নিজেকে অসহায় লাগে মানুষের। বেশির ভাগই সংসার, সন্তান, হৈচৈ চায়। কিন্তু স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের ভয়, শেষ বয়সে সন্তানের আশ্রয় পাওয়ার অনিশ্চয়তা আবার বিয়েবিদ্বেষী করে তোলে। আমাদের সমাজের জন্য এই একা থাকার সিদ্ধান্ত ভালো ফল বয়ে আনে না। তবু সামাজিক প্রথার বাইরে টিকে থাকা যেন তাদের একরকম প্রতিবাদ। তারাও পারে জীবনকে যাপন করতে, সে প্রমাণই দেয় তারা জীবনের প্রতিটি বাঁকে।

একা থাকাটা কিছুটা উপভোগ করেন রাজধানীর অনেক মেয়ে। আফরিনা আজিম কর্মক্ষেত্রের কারণে রাজধানীতে একা বাসা ভাড়া করে থাকেন। একা থাকাটা তিনি কিছুটা উপভোগই করেন। তাঁর মতে, ‘একলা থাকলে উদ্যম ফিরে পাওয়া ও নিজেকে রিচার্জ করা যায়। আমাদের প্রত্যেকেরই, এমনকি সবচেয়ে বহির্মুখী স্বভাবের লোকটিকেও উদ্যম ফিরে পেতে এবং নিজেকে রিচার্জ করে নিতে হয়। একাকী সময় কাটানোর মাধ্যমেই একমাত্র এটা সম্ভব। একাকী থাকার সময় আপনি যে শান্তি, নীরবতা ও মানসিক নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন, তা আপনাকে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ধকল থেকে মুক্ত করতে সহায়ক হয়। ’

একা জীবনযাত্রায় যিনি অভ্যস্ত হয়ে যান, তিনি সেটা উপভোগ করলেও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে তাঁর মতো থাকতে দেয় না। সমাজবদলের মাঝে আমরা হয়তো দেখতে পাব, এই শহরেই একদিন একা কোনো নারী নিজের মতো করে জীবন যাপন করছেন। হাজারো বাঁকা চোখ তখন থাকছে না আমাদের এই নগরে।


মন্তব্য