kalerkantho


১০৯ বছর ধরে বাক্সবন্দি হাজার কোটি টাকার রত্নালংকার

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



১০৯ বছর ধরে বাক্সবন্দি হাজার কোটি টাকার রত্নালংকার

নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ

আর্থিক দৈন্যে পড়ে নবাব সলিমুল্লাহ বাধ্য হয়ে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখেন। ধারণা করা হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুমূল্য সেসব সম্পদের বেশির ভাগই লোপাট হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান কোর্ট অব ওয়ার্ডসের দাবি, কোনো কিছুই খোয়া যায়নি। নবাব পরিবারের মহামূল্য সেই সব সম্পদের হদিস নিয়ে লিখেছেন কাজী হাফিজ

 

বহু যুগ আগে রত্নশিল্পীরা তাঁদের সেরা নৈপুণ্য ও অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে যে রাজ ঐশ্বর্য গড়ে তুলেছিলেন, ক্ষমতার লড়াইয়ে হাতবদল হতে হতে শেষ পর্যন্ত যেসব অলংকার ঢাকার নবাব পরিবারের হস্তগত হয়েছিল। তা আজ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রায় পরিত্যক্ত। সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় সিলগালা অবস্থায় এসব রত্নালংকারের বর্তমান অবস্থান। নবাব সলিমুল্লাহ ১০৯ বছর আগে তাঁর সমাজসেবা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খরচ জোগাতে ১৪ লাখ রুপি ঋণের বিনিময়ে তত্কালীন পূর্ব বাংলা ও আসাম সরকারের কাছে ৩০ বছরের জন্য কয়েক হাজার একর ভূ-সম্পত্তিসহ পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী নিজের প্রায় সব রত্নালংকার বন্ধক রাখেন। শর্ত ছিল প্রথম দুই বছর সাড়ে ৩ শতাংশ হারে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ৩ শতাংশ হারে সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধের।

অনেকেরই ধারণা ছিল, ইতিহাসের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বহুমূল্য ওই সব সম্পদের বেশির ভাগই লোপাট হয়ে গেছে। কিন্তু এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কর্মকর্তাদের বর্তমান দাবি, কোনো কিছুই খোয়া যায়নি। ১৯০৮ সাল থেকে মোট ১০৯ রকমের রত্নালংকার বন্ধকি সম্পত্তি হিসেবে এখনো জমা রয়েছে।

তার সঙ্গে ১৯৮৭ সালে আহসান মঞ্জিলের সিন্দুক থেকে উদ্ধার করা নবাব পরিবারের আরো কিছু অলংকার এবং শিল্পসামগ্রীও রেখে দেওয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংকের সেফ ডিপোজিটে। সব মিলিয়ে নবাব পরিবারের এসব অস্থাবর সম্পত্তির বর্তমান মূল্য হাজার কোটি টাকার ওপরে বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে এর ঐতিহাসিক মূল্য আরো অনেক বেশি। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে ওই বহুমূল্য সম্পদ ব্যাংকের লকার দখল করে রাখা ছাড়া কারো কোনো কাজে লাগছে না।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খানিকটা সংশয়ও রয়েছে ওই উদ্যোগহীনতার পেছনে। দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ বাক্স খুলে দেখার সাহস পাচ্ছেন না রত্নালংকারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, খুলে দেখতে গিয়ে যদি গরমিলের কোনো তথ্য প্রকাশ পেয়ে যায়! জানা যায়, ২৭ বছর আগে তত্কালীন সরকার নবাব পরিবারের ওই সব রত্নালংকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তত্কালীন অধ্যাপক ড. আবদুল মমিন চৌধুরী ছিলেন ওই কমিটির অন্যতম সদস্য। কিন্তু একটি বৈঠক ছাড়া কমিটি আর কোনো কাজই করতে পারেনি। কোর্ট অব ওয়ার্ডসের একজন কর্মকর্তার এ বিষয়ে সতর্কতামূলক মন্তব্য, ‘এসব ঐতিহাসিক সম্পদ জাদুঘরে রাখতে হলে নিরাপত্তাগত দিকটি নিয়ে আগে ভাবতে হবে। এ ছাড়া এসব সম্পদের মালিকানাগত বিষয়টিরও নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। নবাব পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁরাই এসব সম্পদের মালিক। সরকার হেফাজতকারী মাত্র। ’

নবাবজাদা খাজা আহসান উল্লাহর পুত্র খাজা জাকি আসান উল্লাহ, নবাবের প্রপৌত্র খাজা নাঈম মুরাদ এবং নবাবের কনিষ্ঠ কন্যা আহমেদী বানুর পুত্র কে এম হারেস আদেল দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পরিবারের সব সদস্যের পক্ষে পূর্বপুরুষের এসব রত্নালংকার ও ভূ-সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আদালতে তাঁদের দাবি, ঋণের সব অর্থ বন্ধককৃত সম্পত্তির আয় থেকে বহু বছর আগে পরিশোধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তাঁরা ওই সব সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে এই দাবি সম্পর্কে গণমাধ্যমে এখন তাঁরা কেউ কথা বলতে চান না। বিষয়টি সম্পর্কে নাঈম মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন, সেহেতু আমরা এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে চাইছি না। ’ 

বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত ৩২ বছরে রত্নালংকারগুলো ঠিকঠাক রয়েছে কি না তা মিলিয়ে দেখার জন্য একবারও সেগুলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর সর্বশেষ ১৯৮৫ সালের ২৪ মার্চ নবাব পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ কোর্ট অব ওয়ার্ডসের তত্কালীন প্রধান ব্যবস্থাপক মো. আফতাব উদ্দিন সোনালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখায় ‘দরিয়া-ই-নূর’টি প্রত্যক্ষ করেন। এরপর ২০০৩ সালের দিকে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অন্য অলংকার শিল্পকর্মগুলো ঠিকঠাক রয়েছে কি না তা জানার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে তত্কালীন ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা ও প্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এবং সংসদে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় আলোচিত রত্নালংকারগুলোর সিলগালা করা বাক্সটি প্রত্যক্ষ করেন। ওই সময় অলংকারগুলো খুলে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েও তা পরিবর্তন করা হয়। ঘটনাটি সম্পর্কে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মন্ত্রীর সঙ্গে অলংকারগুলো ঠিকঠাক রয়েছে কি না দেখার জন্যই গিয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রী সিদ্ধান্ত পাল্টে বললেন, আমরা আর এসব খুলব না। এটা চাইলে প্রধানমন্ত্রী খুলে দেখতে পারেন। ’ মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা মোড়কগুলো দেখেছি। কিন্তু মোড়ক খুলে রত্নালংকারগুলো দেখিনি। ’

সার্বিক এই অবস্থায় যাঁরা দাবি করছেন সব ঠিকঠাক রয়েছে, সেই কোর্ট অব ওয়ার্ডসের বর্তমান কর্মকর্তারা কেউই কখনো চাক্ষুষ করেননি ওই সব অলংকার। দাবিটির পেছনে তাঁদের যুক্তি, নবাব সলিমুল্লাহ রত্নালংকারগুলো বন্ধক রাখার পর এখনো এমন কোনো দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি, যাতে তাঁরা সন্দেহ করতে পারেন যে এসব খোয়া গেছে। বিষয়টি সম্পর্কে সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সিলগালা করা বাক্স পাহারা দিচ্ছি। কিন্তু ভেতরে কী রয়েছে, তা আমাদের অজানা। মোট দুটি প্যাকেট রয়েছে আমাদের কাছে, যার একটি ১৯৮৫ সালে এবং অন্যটি ১৯৮৭ সালে সেফ ডিপোজিটে রাখার তথ্য রয়েছে। ’ সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার ধারণা, বিষয়টি এমনও হতে পারে যে অলংকারগুলো ১৯৮৫ সালে শেষবার পরিদর্শনের এবং ১৯৮৭ সালে আহসান মঞ্জিল থেকে আরো কিছু অলংকার ও শিল্পসামগ্রী উদ্ধার করার পর নতুন করে সেফ ডিপোজিটে জমা দেখানো হয়েছে।

নবাবের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে এরশাদ সরকার আমলে তাঁদের সিন্দুক উদ্ধার নিয়েও রয়েছে ক্ষোভ। আহসান মঞ্জিল  অধিগ্রহণ করার পর ১৯৮৭ সালে মঞ্জিলের তোষাখানা থেকে উদ্ধার করা হয় বিশাল একটি সিন্দুক। সরকার সিন্দুকের মালামাল পরীক্ষার জন্য ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু নবাব পরিবারের দাবি সত্ত্বেও তাঁদের সে সময় ওই কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে তখনো ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা ঘটে। ওই সময় সংবাদ সম্মেলন করে নবাব পরিবারের পক্ষে বলা হয়, ‘আহসান মঞ্জিলের ধন-সম্পত্তি অবৈধভাবে অপসারিত হচ্ছে। সরকার স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছে, অস্থাবর সম্পত্তি নয়। ’ বিষয়টি সম্পর্কে নবাব পরিবারের একজন সদস্যের অভিযোগ, সামরিক সরকারের আক্রোশ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ওই সময় তাঁরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আইনের আশ্রয় নিতে পারেননি।

উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে তত্কালীন সামরিক সরকার এক অধ্যাদেশবলে আহসান মঞ্জিল অধিগ্রহণ করে এটিকে জাদুঘরে পরিণত করে। নবাব পরিবারের ১৮৭ জন উত্তরাধিকারীকে প্রায় ছয় কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে ভবনসহ আহসান মঞ্জিলের পাঁচ একর জায়গা অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয় তখন। তবে তালিকাভুক্ত সব উত্তরাধিকারী এ দেশে বসবাস না করায় বরাদ্দকৃত টাকার একটি অংশ এখনো জমা রয়েছে ঢাকা নবাব এস্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসে। ১৯৮৭ সালে আহসান মঞ্জিলের তোষাখানা থেকে সিন্দুক উদ্ধারের পর নবাব সলিমুল্লাহর পৌত্র খাজা মুরাদ ওই বছরের ২২ মে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ‘বিষয়টি এক ধরনের ডাকাতি। আমাদের না জানিয়ে অন্যায়ভাবে সিন্দুক ভেঙে মহামূল্য সব অলংকার ও সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে সব সম্পত্তি ফেরত না দিলে আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব। ’ কিন্তু পরে আর মামলা হয়নি। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগে খাজা মুরাদ জেনে যেতে পারেননি আহসান মঞ্জিলের সিন্দুক থেকে তাঁর পূর্বপুরুষের কী কী সম্পদ উদ্ধার হয়েছিল।

১০৯ বছর ধরে এই ঢাকায়ই বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত হীরকগুলোর অন্যতম ‘দরিয়া-ই-নূর’। তার সঙ্গে আরো রয়েছে হীরার তৈরি ও খোদাই করে কোরআনের আয়াত লেখা বিভিন্ন ধরনের বাজুবন্দ, হীরকখচিত ফেজটুপি, চুনি, পান্না ও হীরক দিয়ে সাজানো হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের শতাধিক অলংকারসামগ্রী


মন্তব্য