kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

‘আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে’

ঢাকা শহরে রিকশাচালকরা গ্রাম ও শহরের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ। শহরের হাওয়া এখন সহজেই গ্রামে চলে যায়, যায় তার জ্ঞান, তথ্যও। পাল্টা গ্রামীণ স্বভাব-সংস্কৃতি চলে আসে শহরে

আবুল হাসান রুবেল   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে’

শিল্পী : নাজলী লায়লা মনসুর

কয়েক দিন আগেই ঢাকা শহর একটা পরিবহন ধর্মঘট দেখল। সেদিন সারা ঢাকা ছেয়ে গিয়েছিল রিকশায়।

সত্যিকার অর্থেই ঢাকা হয়ে গিয়েছিল রিকশার নগরী। অনেকের মনেই প্রশ্নটা এসেছে সেদিন, আসলে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা কত? সরকারি হিসাব আছে একটা। সেই হিসাবে নিবন্ধনকৃত রিকশার সঙ্গে তার চেয়ে কিছু বেশি অনিবন্ধিত রিকশা আছে ধরে নিয়ে দুই লাখের কিছু বেশি রিকশা আছে বলা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, ঢাকায় রিকশার সংখ্যা আসলে সেই হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। কারো মতে তা পাঁচ লাখ, কারো মতে ১০ লাখ, আবার কারো মতে ১৫ লাখ। এটা হয়ে গেছে নগরে কাকের সংখ্যা গণনার সেই পরিচিত গল্পের মতো। কাকের সংখ্যা পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পাঁচ শ পঞ্চান্নটি। এর চেয়ে বেশি হলে বাইরে থেকে বেড়াতে এসেছে আর কম হলে বেড়াতে গেছে। বাস্তবত সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত নন তাঁদের হিসাব বিষয়ে, বিশ্বাসযোগ্য কোনো বেসরকারি হিসাবও নেই। এই যে হিসাবটা নেই, সেটা ইঙ্গিত করে নগর হিসেবে ঢাকার অপরিকল্পিত বিকাশের দিকে। আরো একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, ঢাকায় রিকশার চল কবে থেকে আসলে শুরু হলো সেটারও কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

যা হোক, যত দূর জানা যায় বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আগে রিকশার চল শুরু হয় চট্টগ্রামে, ১৯১৯ সালের দিকে। ঢাকার রাস্তায় প্রথম রিকশা দেখা যায় ১৯৩৮ সালে। কলকাতা থেকে আসা ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ী যারা নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা তাদের প্রয়োজনে রিকশার আমদানি করে ঢাকায়। ঘোড়ার গাড়িতে অভ্যস্ত ঢাকাবাসী রিকশাকে খুব ভালোভাবে নেয়নি প্রথমে। তাদের কাছে একে অদ্ভুত যানবাহন মনে হয়েছে। আগে কিছু রিকশা থাকলেও ঢাকায় রিকশার সংখ্যা বাড়া শুরু হয় আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর। এর একটা কারণ ছিল তেল সংকট, আরেকটা ছিল সে সময় মানুষের আর্থিক অবস্থার অবনতি। সে সময় একটা দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেটার প্রভাবও থাকা সম্ভব। এরপর ষাটের দশকে প্রথম রিকশা তুলে দিয়ে তার জায়গায় তেলচালিত বেবিট্যাক্সি চালুর চেষ্টা হয় ঢাকায়। স্বাধীনতার পর নানা সময়ে ঢাকায় রিকশা উচ্ছেদের চেষ্টা হলেও রিকশার সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। ক্রমে রিকশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা শহরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিদেশিদের চোখেও ঢাকার এই বিশিষ্টতা ধরা পড়ে সহজেই। কেউ কেউ রিকশার পেছনে যে চিত্রকলা থাকে তার সরল সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। এই যে রিকশার পেছনে চিত্রকলা, এটা কিন্তু শুরু হয় ঢাকায়ই, ১৯৫১ সালের দিকে।

কিন্তু কারা রিকশাচালক? কেমন করে রিকশাচালক হলো তারা? তাদের বিবর্তন হয়েছে কিভাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, তার বিকাশের ধরন, সামাজিক চলকগুলোর একটা হদিস পাব বলে মনে হয়। ঢাকার প্রথম দিকের রিকশাচালকদের বড় একটা অংশ এর আগে ঘোড়ার গাড়ি চালাত। তাদের মধ্যে কোচোয়ানদের রঙ্গ-রসিকতাপ্রবণ চরিত্রের উপস্থিতির নানা গল্পও পাওয়া যায়।

জনাব শামসুজ্জামান খান তাঁর ‘ঢাকাই রঙ্গ রসিকতা’ গ্রন্থে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, ‘তখন পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে। আমি যাব মেডিকেল কলেজ থেকে আরমানিটোলা। রিকশা ঢুকল নাজিমুদ্দিন রোডে। তখন রিকশাওয়ালা আমাকে বলছে, বুঝলেন ছাব এইটা হইল গিয়া আমাগো নাজিমুদ্দিন রোড। আমি বললাম, নাজিমুদ্দিন রোড সেটা তো আমিও জানি তাতে হয়েছেটা কি? রিকশাওয়ালার উত্তর, না ছাব, কইবার লাগছিলাম যার নামে রাস্তা হালায় করাচীর বাদছা হইয়া বইছে। মগার অর রাস্তা দিয়া যহন যাই তহন মনে হয় যে বুড়িগঙ্গার ঢেউ খেলবার লাগছি। ’ এই রসিকতার ভেতর দেখা যাবে প্রবলপ্রতাপ শাসককে ‘হালায়’ বলে সম্বোধন করতে ঢাকাইয়া রিকশাচালকের কোনো অসুবিধা হয় না, আর তার তুলনাটা তো অসাধারণ। রাস্তার সঙ্গে বুড়িগঙ্গার ঢেউ। এ রকম আরো অনেক রসিকতা ঢাকার রিকশাচালকদের নিয়ে পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখাপত্রে ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায়। রিকশাচালকদের নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সার্থক গান সম্ভবত ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে, আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে...’। এই গানে একদিকে সেই চালকের বিরহ আর অন্যদিকে তার চালক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার গল্প আছে। প্রথম দিকে কোচোয়ানদের একটা অংশ রিকশাচালক হলেও গ্রাম থেকে আসা একটা অংশ প্রথম থেকেই ছিল রিকশাচালক হিসেবে। শুরুতে সেটা ছিল আশপাশের জেলা থেকে আসা লোক, পরে তারা এসেছে গোটা বাংলাদেশ থেকেই।

রিকশাচালক হয়েছে কৃষি অলাভজনক হয়ে পড়ায়, নানা মুসিবতে পড়ে জমি হারিয়ে, নদীভাঙনে, এনজিও ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে ইত্যাদি কারণে। বর্তমানে এদের একটা বড় অংশই মৌসুমি চালক। তারা হয়তো অন্য কারো জমিতে চাষবাস করে, কৃষিমজুর হিসেবে কাজ করে বা অন্য কিছু। কয়েক দিন আগেই কথা হচ্ছিল একজন রিকশাচালকের সঙ্গে। সে বলছিল, এখন মূলত জমিতে যে কাজটা থাকত সেটা হলো আগাছা পরিষ্কার করা। কিন্তু এখন আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে সেই কাজ আর নেই। সে কারণে তাকে ঢাকায় আসতে হয়েছে রিকশা চালাতে। কোনো কোনো রিকশাচালক রিকশা চালায় কৃষির খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে ঋণ করতে হওয়ায় সেই ঋণ শোধ করতে। কেউ স্থায়ীভাবেই ঢাকায় এসে রিকশাচালকের পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। ঢাকায় রিকশা উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনের সময় একজন বয়সী রিকশাচালক এই প্রতিবেদককে বেশ ভালো একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বেশির ভাগ চালকের সেই আন্দোলনে যোগ না দেওয়া প্রসঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘রিকশা উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন তো আসলে দরকার রিকশার মালিকদের। কারণ ঢাকায় যে পরিমাণ রিকশা আছে, চালকের সংখ্যা তার চেয়ে কম। ধরেন, সিএনজিতে যে আয় হয়, রিকশায় হয় তার অর্ধেক। কিন্তু রিকশার জমা দেখেন তার অর্ধেকের চেয়ে অনেক কম। রিকশার সংখ্যা রিকশাওয়ালার চেয়ে বেশি বলেই এ রকম হয়। এখন যদি রিকশা কিছু কইমাও যায়, রিকশাওয়ালাগো চেয়ে অসুবিধা বেশি মালিকগো। ’ এরপর তিনি আরো যোগ করলেন, ‘এইডা খুব বেশিদিন চলব না। ’ কী চলবে না জানতে চাইলে বললেন, ‘এই যে রিকশা উচ্ছেদ। ’ কেন জানতে চাইলে বললেন, ‘এগুলা সরকার বিদেশিগো কথায় শুরু করে, কিন্তু শেষ করতে পারে না। দ্যাশে অনেক কলকারখানা হইলে, সগলের কাজকাম থাকলে লোকে এমনিতেই রিকশা চালাইব না। ’ খুব সহজেই যেন রিকশাচালক হওয়ার কারণ, দেশের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রিকশা চালনার অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। ঢাকা শহরে রিকশাচালকরা গ্রাম ও শহরের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ। শহরের হাওয়া এখন সহজেই গ্রামে চলে যায়, যায় তার জ্ঞান, তথ্যও। পাল্টা গ্রামীণ স্বভাব-সংস্কৃতি চলে আসে শহরে। রিকশাচালকের পাঠানো অর্থ এখনো এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালন করে। শহরের নাগরিকরাও যে গ্রাম তারা ছেড়ে এসেছে তার স্পর্শ পায় রিকশাচালকের মাধ্যমে। প্রায়ই দেখা যায়, এলাকার রিকশাওয়ালা পেয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে সেই এলাকা থেকে আসা যাত্রী। কখনো পথ চলতে পাওয়া যায় দরাজ গলায় গান করা রিকশাচালককে। এভাবে রিকশা শহর আর গ্রাম উভয়কেই প্রাণ দিয়ে চলেছে—যদিও ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে।


মন্তব্য