kalerkantho


সিএনজিচালকদের রামরাজত্ব

ফাহিম রেজা শোভন   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সিএনজিচালকদের রামরাজত্ব

মিটারে চলছে না সিএনজি আটোরিকশা। ফলে বিপাকে পড়ছে যাত্রীরা।

নতুন মিটার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর কিছুদিন নিয়মমাফিক চললেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা বেশি ভাড়ার লোভে ফিরে যায় নিজেদের স্বেচ্ছাচার ব্যবস্থায়। ‘এখন অনেক রাত, রাস্তায় জ্যাম’ বা ‘আপনি যে গন্তব্যে যাবেন, সেই দিকে গেলে খালি গাড়ি নিয়া ফিরতে হবে’—এমন নানা অজুহাতে চলে যাত্রীর পকেট কাটা।

দূরত্ব কম হলেই চুক্তিতে বা রিজার্ভ ভিত্তিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। মিটারে যেতে চাইলে দূরত্বের ভিত্তিতে ২০-৫০ টাকা বাড়িয়ে চায় তারা। আবার সকালে বা রাস্তায় যখন জ্যাম থাকে না, এমন সময় মিটারে কেউ যেতেই চায় না। দিন দিন চালকদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। একজোট হয়ে তারা তৈরি করছে কৃত্রিম সংকট। এতে জনগণের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরম পর্যায়ে। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে অসুস্থ রোগীসহ সাধারণ মানুষকে ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।

অনেক সময় মিটারে যেতে চাইলেও জ্যামযুক্ত রাস্তা দিয়ে অনেক দূর ঘুরিয়ে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়। মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টে বসবাসরত গৃহিণী এলিজা ফারহানা। সম্প্রতি গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার সময় গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে গুনেছেন অতিরিক্ত ভাড়া। তিনি বলেন, ‘৪০০ টাকার নিচে কেউ আসতেই চায়নি। বাধ্য হয়েই আমাকে আসতে হয়েছে গাবতলী থেকে মেরুল বাড্ডায়। এসে দেখি মিটারে ২৫২ টাকা। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমাকে দিতে হয়েছে ৪০০ টাকা। ’ অনেক সময় কেউ মিটারে যেতে রাজি থাকলেও আবদার থাকে মিটারের চেয়ে ২০-৩০ টাকা বেশি দেওয়ার। অথচ নিয়ম অনুযায়ী যাত্রী যেখানে যেতে চান, মিটারে সেখানেই যেতে বাধ্য চালক। একদিকে মিটারে যেতে না চাওয়া, অন্যদিকে জ্যামের অজুহাতে চুক্তিতে যাতায়াত করে বাড়তি ভাড়া গোনার ভোগান্তি। সব মিলিয়ে যেন রেহাই মিলছে না নগরবাসীর।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তালিকাভুক্ত অটোরিকশা ৯ হাজার ১৩টি। তবে নগরীর রাস্তায় চলাচল করছে এর চেয়ে ঢের বেশি। একই রেজিস্ট্রেশন নাম্বারে ভুয়া নাম্বার প্লেট ও কাগজপত্র ব্যবহার করে চালিত হচ্ছে অতিরিক্ত অটোরিকশাগুলো। এ ছাড়া মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানোর অভিযোগ আছে চালকদের বিরুদ্ধে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় সম্পর্কে জানতে চাইলে রামপুরা বনশ্রী এলাকার সিএনজিচালক বনু বলেন, ‘যাত্রীর কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিতে আমাদেরও ভালো লাগে না। কিন্তু আমি গাড়ির জমা দেই ৯০০ টাকা। তা-ও আমার গাড়ি পুরান, তাই কম দেই। নতুন গাড়ির জমা এক হাজার থেকে ১১০০ টাকা। তারপর অনেক গাড়ির কাগজ ঠিক না থাকায় রাস্তায় পুলিশ ধরলে টাকা-পয়সা দিয়া ছাড়ায়া নিয়া আসতে হয়। রাস্তায়ও থাকে জ্যাম, তাই বেশি ট্রিপ নিতে পারি না। মিটারে চললে দিন শেষে ১০০-২০০ টাকার বেশি থাকে না। ’

আব্দুস সাত্তার যাত্রাবাড়ীর একটি গ্যারেজ থেকে অটোরিকশা ভাড়ায় নিয়ে চালান। জনগণের কাছে থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় যে জ্যাম থাকে এতে আমাদের সময় অনেক অপচয় হয়। কোনো কোনো দিন দেখা যায় জমার টাকা তুলতেও হিমশিম খেতে হয়। আবার মালিককেও এক হাজার টাকা বা তারও বেশি দেওয়া লাগে। আমরা তো আর নিজের পকেট থেকে টাকা দেব না। তাই না মামা?’

অন্যদিকে ব্যতিক্রমও আছে। কালু মিয়া নামের এক সিএনজি অটোরিকশাচালককে মিটারে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘মামা, আমি সব সময়ই মিটারে যাই। আমার মালিকের নির্দেশ। তবে যাত্রী উঠানোর আগে বলে নেই বাড়ায়ে দিয়েন। খুশি হয়ে যে যা বাড়ায়ে দেয় তাই নেই, মামা। ’ ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ যে অবৈধ সে বিষয়ে বললে তিনি বলেন, ‘আমি বাবা গরিব মানুষ। ছয়জনের সংসার চালাইতে হয়। জমার টাকা, গ্যাসের দাম দেওয়ার পর যা থাকে তা দিয়া আমার চলে না। তার ওপর মালিক চুক্তিতে যাইতে মানা করছে। তাই বকশিশ হিসেবে নেই আর কি। ’

কেউ যেন মিটারবিহীন যাত্রী না নেয় সে কারণেই ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যত এই মিটারের ভাড়া বাড়ানোর পর বেড়ে গেছে সিএনজির আগের ভাড়ার পরিমাণ। মিটার অনুসারে সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো না গেলেও সংশ্লিষ্ট আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং এই সংকট থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে যাত্রীর করণীয় সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির নেই কোনো বিশেষ উদ্যোগ।

 

অভিযোগ দাখিলের নিয়ম

সাধারণ জনগণের ভোগান্তির কথা চিন্তা করেই বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ অসাধু সিএনজিচালক ও মালিকদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। সরাসরি এই লিংকে (http://www.brta.gov.bd/newsite/en/complain-queries/) ভিজিট করলেই বিআরটিএর অভিযোগ ও অনুসন্ধান পাতা আসবে, যেখানে নিজের তথ্য ও অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণসহ প্রয়োজনীয় ছবি সংযুক্ত করা যায়। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে অনধিক সাত কার্যদিবসের মধ্যেই শুনানির জন্য ডেকে পাঠাবে তাদের অফিসে। শুনানিতে যথোপযুক্তভাবে অভিযোগ তুলে ধরতে পারলেই দোষী চালক ও মালিককে জরিমানা করা হয়ে থাকে। শাস্তির বিধান অনুযায়ী উভয়েরই লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে।


মন্তব্য