kalerkantho


গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে অনিরাপদ কারখানা

মৃত্যুফাঁদে শ্রমিক

ঢাকা ৩৬০° প্রতিবেদক   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মৃত্যুফাঁদে শ্রমিক

ছবি : শেখ হাসান

গাজীপুরে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন কারখানা। আর এসব কারখানার বেশির ভাগই গড়ে উঠছে অগ্নিনির্বাপণ, পরিবেশ ও কারখানা আইন না মেনেই। ফলে অগ্নিঝুঁকিসহ নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে সমান তালে। বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে হচ্ছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই। আবার অনেক কারখানায় মজুরিসহ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয় না। এসব কারণে রাজধানীর সবচেয়ে কাছের গাজীপুর শিল্পাঞ্চল শ্রমিকদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে ৮১ জন শ্রমিকের এবং আহত হয়েছে কয়েক সহস্রাধিক। ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন টঙ্গীর ‘টাম্পাকো ফয়েলস’ কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসে পথচারীসহ ৩৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী নিহত হয়। আহত হয় অর্ধশতাধিক।

অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে যে অনিরাপদ জেনেও ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছিল কারখানাটি। অবৈধ গ্যাসলাইন থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পুরো কারখানাটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।

প্রাণহানির দ্বিতীয় বড় ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন রাতে গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকার গরিব অ্যান্ড গরিব গার্মেন্টে আগুন লেগে ২১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুরে পলমল গ্রুপের আসওয়াদ কম্পোজিট মিলসে আগুন লেগে নিহত হয় ১০ জন। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি মহানগরীর পুবাইলে পুরনো টায়ার পুড়িয়ে নকল বিটুমিন তৈরির ‘স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল’ কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনে পুড়ে নিহত হয় আটজন।   কারখানাটি প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছিল। এভাবে একের পর এক বিভিন্ন কারখানায় আগুন লেগে গাজীপুরে গত সাত বছরে ৮১ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় কয়েক হাজার শ্রমিক, যাদের মধ্যে শতাধিক হয়েছে চিরতরে পঙ্গু।

জানা গেছে, গাজীপুরে ৩৬৩টি নিট, ১৭৫টি ওভেন, ৩২৩টি সোয়েটার, ৭০টি স্পিনিং, ১০টি হোম টেক্সটাইল, ৩৪টি ওয়াশিং, ৩৭টি ওষুধ, ২৪টি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ১৯টি প্লাস্টিক সামগ্রীসহ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ছোট-বড় কলকারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বেশির ভাগের অগ্নিনির্বাপক সনদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বয়লার ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স ও কাগজপত্র হালনাগাদ নেই। থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। লাইসেন্স থাকলেও আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও পানির ব্যবস্থা নেই। অনেক কারখানায় প্রশিক্ষিত ফায়ারম্যান নেই। আবার অনেক কারখানা লাইসেন্স বা যন্ত্রপাতি ছাড়াই পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছে। এ কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনায় শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। কারখানা মালিকদের সঙ্গে আঁতাত থাকায় ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কলকারখানা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও ওসব কারখানায় অভিযান চালান না।

শ্রমিকদের জীবন আরো অনিরাপদ বেতন-ভাতায়ও। সর্বশেষ ২০১৩ সালে সরকার গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে। বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মালিকরা বাসাভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে। সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য, সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়তি বেতন শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিকদের জীবনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুরের ভুসির মিল এলাকার মেট্রিক্স সোয়েটার কারখানার একাধিক শ্রমিক জানায়, বড় বড় কারখানায় সুযোগ-সুবিধা পেলেও ছোট কারখানার শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ। ঠিকমতো বেতন-ভাতা, ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, হাজিরা বোনাস, উৎসব বোনাসসহ অন্যান্য ভাতা মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেওয়া হয় না। অনেক কারখানায় নির্যাতন চালানো হয়। সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বাসাভাড়া নিয়ে। মালিকরা প্রতিবছর বাড়িভাড়া বাড়ায়। আবার সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ালে তার প্রভাবও পড়ে তাদের জীবনে। সব মিলিয়ে ঘরে, বাইরে ও কারখানায়—সব জায়গায়ই তাদের জীবন অনিরাপদ।

অনেক কারখানাই শ্রমিকদের জন্য অনিরাপদ উল্লেখ করে গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান লিটন জানান, গত সাত বছরে গাজীপুরে তিন হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ছিল সহস্রাধিক। এ ছাড়া ৮১ জন শ্রমিকের মৃত্যুসহ পুড়েছে প্রায় সাড়ে সাত শ কোটি টাকার সম্পদ। কারখানা আইন না মেনে কারখানা পরিচালনা করা এবং বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে।


মন্তব্য