kalerkantho


ঢাকার অতিথি

‘স্কুল অব মনিরো’

আমাদের দেশের তরুণরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তারা চমত্কার কাজ করছে। এশিয়া বিয়েনালসহ বিশ্বের নানা প্রদর্শনীতে তারা যখন পুরস্কার পায় তখন বোঝা যায়, আমাদের চিত্রচর্চার গুণগত মান বেড়েছে। মনে রাখতে হবে, চর্চার বিকল্প নেই

শেখ মেহেদী হাসান   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘স্কুল অব মনিরো’

প্রায় পাঁচ দশক ধরে স্পেনে বসবাস করছেন চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। জলরং, তেলরং, ছাপচিত্র, এচিংয়ে সুদক্ষ এই শিল্পীর খ্যাতি ইউরোপজুড়ে। এচিংয়ে তিনি এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা ইউরোপে ‘স্কুল অব মনিরো’ নামে পরিচিত। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাঁর শিল্পকর্মের একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে। বিশ্বব্যাপী নিয়মিত কর্মশালা পরিচালনা করেন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চিত্র প্রতিযোগিতার জুরি বোর্ডের সদস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষক মনিরুল ইসলামের জন্ম জামালপুরের ইসলামপুরে। তাঁর পৈতৃক ভিটা চাঁদপুর। বাবার চাকরিসূত্রে কিশোরগঞ্জে কেটেছে তাঁর শৈশব। কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র রায় তাঁকে আঁকতে উৎসাহিত করতেন। প্রথমে রিকশাচিত্র দেখে ছবি আঁকতে শুরু করেন।

আঁকার নেশা এমনই পেয়ে বসেছিল যে পড়াশোনায় আর মন বসাতে পারেননি। টানা তিনবার ম্যাট্রিকুলেশন ফেল করা ছেলের ওপর পরিবারও আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তাঁর অদম্য বাসনা পূর্ণ হয়েছিল ১৯৬১ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। তিনি বলেন, ‘আর্ট কলেজ ছিল আমার স্বপ্নের জায়গা। মনে পড়ে ভর্তির দিনটির কথা, আমাকে স্টিল লাইফ আঁকতে দিয়েছে। আমি চট করে সেটা এঁকে ফেললাম। খুব সহজে ভর্তি হয়ে গেলাম। ’ তত্কালীন ঢাকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তখনকার ঢাকা শহর ছিল সবুজে ভরা, প্রাণবন্ত একটি নগর। এখনকার ঢাকার মতো ঘনবসতি ছিল না। প্রচুর খেলার মাঠ ছিল। খোলামেলা জায়গা ছিল। কারওয়ান বাজারে বসে প্রচুর স্কেচ করেছি। আর্ট কলেজের ক্লাস শেষে আউটিং করার জন্য চলে যেতাম রমনা পার্ক, পুরান ঢাকা, সদরঘাট। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। এখন সেই পানি কালো হয়ে গেছে। শুনেছি বুড়িগঙ্গার পানিতে মাছও হয় না। রায়েরবাজার পালপাড়া আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা ছিল। বাইসাইকেল চেপে চলে যেতাম রায়েরবাজার। রায়েরবাজারে রঙের প্লেট নিয়ে বসে যেতাম ছবি আঁকতে। পথচারীদের কেউ কেউ আমাকে ওষুধ বিক্রেতা মনে করত। একদিন একজন বলল, পায়ে ব্যথার মলম আছে নাকি? জলরঙে বেশি ছবি আঁকতাম। একদিন দেখি গরুর মুখে আমার জলরং। সময়মতো দেখতে পেয়েছিলাম বলে রক্ষা, তা না হলে ছবিটি গরু খেয়েই ফেলত, গরুর মুখগহ্বর থেকে ওয়াটার কালার পেইন্টিং টেনে বের করছি—দৃশ্যটির কথা এখন ভাবলে তো মজাই লাগে। ছাত্রাবস্থায় মজা পাইনি, তখন ছিল ছবি বাঁচানোর টেনশন। ’

১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তিন বছরের বৃত্তি নিয়ে ১৯৬৯ সালে চলে যান স্পেনে। সেই থেকে আজও বসবাস করছেন সেখানে। স্পেনে যাওয়ার আগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁকে বলেছিলেন, ‘মনির, যদি দৌড়াতে হয় তাহলে চ্যাম্পিয়নের পেছনে দৌড় দিয়ো, ল্যাংড়ার পেছনে দৌড়াইয়ো না। ’ স্পেনে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলন করেছেন মনিরুল। ১৯৭৬ সালে দেশে এলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মনিরুল ইসলামের বিশেষ এক কর্মশালার আয়োজন করে। ওই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন পটুয়া কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়াসহ ৪০ জন শিল্পী। ইউরোপের সম্মানিত এই চিত্রশিল্পী স্পেনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, বাংলাদেশের একুশে পদক, নরওয়ে, ফ্রান্স, আমেরিকা, যুগোস্লাভিয়া, ইরাকসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় সম্মান অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বহু আর্ট কলেজে আমি গিয়েছি, কিন্তু আমাদের চারুকলার মতো এত সুন্দর ডিজাইনের বিল্ডিং, প্রাকৃতিক পরিবেশ কোথাও দেখিনি। এর চেয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেখে আমার মনে হয়েছে হাসপাতাল। আমাদের দেশের তরুণরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তারা চমত্কার কাজ করছে। এশিয়া বিয়েনালসহ বিশ্বের নানা প্রদর্শনীতে তারা যখন পুরস্কার পায় তখন বোঝা যায়, আমাদের চিত্রচর্চার গুণগত মান বেড়েছে। মনে রাখতে হবে, চর্চার বিকল্প নেই। বড় শিল্পী হতে হলে নিয়মিত চর্চা, বিনয় থাকতে হবে। ’


মন্তব্য