kalerkantho


নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে ঐতিহাসিক ভবন

পুরান ঢাকা থাকছে না পুরনো

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পুরান ঢাকা থাকছে না পুরনো

ছবি : শুভ্র কান্তি দাস

চার শ বছরের পুরনো নগর ঢাকা। প্রাচীন এই নগরকে একসময় বলা হতো ‘প্রাচ্যের রোমান্টিক শহর’। সেই শহর আজ বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য বলে ভূষিত। ফলে সে কথা আজ ইতিহাসমাত্র! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানাভাবে বিকশিত হয়েছে ঢাকার সমাজকাঠামো। জনসংখ্যার আধিক্যে বেড়েছে তার পরিধি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবনধারা আর শৈল্পিক স্থাপত্যের মেলবন্ধন পুরান ঢাকাও বদলে যাচ্ছে কালের পরিক্রমায়। পুরান ঢাকার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন আপেল মাহমুদ

 

ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের নতুন করে পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ভবন ভাঙার জন্য একটি তালিকা তৈরির কাজও সম্পন্ন হয়েছে। যেকোনো সময় ঐতিহ্যবাহী সেসব ভবন ভাঙার কাজ শুরু হতে পারে। তখন আর পুরান ঢাকা পুরনো থাকবে না। এর ফলে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আর চার শ বছরের ঢাকাকে খুঁজে পাবে না।

নগরবিদরা একে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত অভিমত দিয়ে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত রোধ করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী রাজনারায়ণ ধর রোড, মিটফোর্ড রোড, মৌলভীবাজার, কসাইটুলী, জিন্দাবাহার, নাজিমউদ্দিন রোড, বংশাল, হাজি আব্দুল্লাহ সরকার রোড, নর্থ সাউথ রোড, গোয়ালনগর, ওয়াইজঘাট, পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর, বনগ্রাম, নবাবপুর রোড, সৈয়দ নজরুল ইসলাম রোড, জনসন রোড, সুভাষ বোস এভিনিউ, নর্থব্রুক হল রোড, কে জি গুপ্ত লেন, পাতলা খান লেন, রূপচান লেন, প্রতাপ দাস লেন, আর এম দাস লেন, ডিস্টিলারি রোড ও কে বি রোডের প্রায় সাড়ে তিন শ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বাড়ির তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ স্থাপনাই পুরাকীর্তি হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে। এগুলো ভেঙে ফেললে ঢাকার ইতিহাসের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।

রাজউক ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে তারা যৌথভাবে ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা করেছিল। শাঁখারীবাজারে পুরনো একটি ভবন ধসে বেশ কিছু মানুষ মারা গেলে এই তালিকা তৈরি করা হয়। নানা কারণে তখন ভবনগুলো ভাঙা হয়নি। বিশেষ করে দেশের পুরাতত্ত্ববিদদের আপত্তির কারণে তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলো যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তা-ও আটকে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি সেই তালিকা থেকে কিছু অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বাছাই করে ভেঙে ফেলার জন্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় লক্ষ্মীবাজারের লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরটিও রয়েছে, যে মন্দিরের নামে লক্ষ্মীবাজারের নামকরণ। শুধু লক্ষ্মীবাজারই নয়, ওই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ভিখনলাল ঠাকুর প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ নগরেরও প্রতিষ্ঠাতা। ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে তাঁর বাড়িটিও ভাঙার জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ওয়াইজঘাটের নীলকুঠি (বাফা ভবন) এবং এর পশ্চিম পাশে অবস্থিত ঢাকার ব্রিটিশ কালেক্টরের নামে প্রতিষ্ঠিত র্যাংকিন হাউসটিও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো ছাড়াও বনগ্রামের ঐতিহাসিক ৪০ নম্বর বাড়িটি একই তালিকায় রয়েছে। বাড়িটি এতটাই কারুকার্যময় যে যে কেউ একবার দেখলে আর চোখ ফেরাতে পারেন না।

সরকার পুরনো স্থাপনার যে তালিকা করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো সদরঘাট নদীবন্দর থেকে মিটফোর্ড হাসপাতাল পর্যন্ত। এসব এলাকায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। মোগল-ব্রিটিশ আমলে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এসব ভবনের সৌন্দর্য দেখে পর্যটকরা আকৃষ্ট হতো। এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হলে ঢাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, একেক সময় একেকটি তালিকা করে নির্বিচারে ঐতিহাসিক ভবনগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশে অনেক জ্ঞানী-গুণী নগরবিদ, স্থপতি কিংবা ইতিহাসবিদ থাকার পরও তাঁদের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। রাজউক কিংবা সিটি করপোরেশন কিছু কেরানি দিয়ে এসব তালিকা করছে। যার কারণে কোনো কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউজ) পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ফরাশগঞ্জের ‘বড়বাড়ি’ নামের একটি স্থাপনা। তা ছাড়া পুরো ফরাশগঞ্জই সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে বলে রাজউক সূত্রে জানা গেছে। অথচ এই সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে বিপজ্জনক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এবং তা ভেঙে ফেলার জন্য ‘বড়বাড়ি’ স্থাপনার মালিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে ডিসিসির প্রকৌশল শাখা থেকে। স্থাপনাটি ভাঙা হলে পুরান ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি হারিয়ে যাবে। কিন্তু এই চিঠির পরপরই আবার অন্য একটি চিঠি দিয়ে ওই আদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে ডিসিসির নগর পরিকল্পনা শাখা থেকে জানানো হয়েছে। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো গোলকধাঁধা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮-এর উপবিধি ৬১ অনুযায়ী ঢাকার ঐতিহাসিক, নান্দনিক ও পুরনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে। এর মধ্যে সংরক্ষিত এলাকা ফরাশগঞ্জের বি কে দাস রোড অন্যতম। ওই রোডের একটি ঐতিহাসিক বাড়ি ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়। এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে, একটি ডেভেলপার কম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ‘বড়বাড়ি’ ভেঙে ফেলার জন্য চেষ্টা চলছে।

ডিসিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিসিসির অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী নগরীর যেকোনো পুরনো ও বিপজ্জনক ভবন কিংবা স্থাপনা ভেঙে ফেলার জন্য তাঁরা নোটিশ দিতে পারেন। এমনকি ডিসিসি নিজ উদ্যোগে বিপজ্জনক স্থাপনা ভেঙেও ফেলতে পারে। অন্যদিকে রাজউক থেকে বলা হয়েছে, নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ছাড়া তালিকাভুক্ত স্থাপনা ভাঙা তো দূরের কথা, তা সংস্কারও করা যাবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো. আব্দুল খালেক বলেন, দুটি সংস্থার পুরাকীর্তিবিষয়ক আইন পরস্পরবিরোধী। তা অচিরেই সংশোধন করে একই কাতারে আনা উচিত, যার মাধ্যমে নগরীর পুরনো নিদর্শন রক্ষার জন্য তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যদি পুরাকীর্তিটি ধ্বংস করা হয়, তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, শত শত বছরের পুরনো স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হোক সেটা ভালো কথা, কিন্তু সেটা কত দিন? পুরনো ভবন বা স্থাপনাগুলো একসময় এমনিতেই ভেঙে পড়বে। তখন এর দায় নেবে কে? সবার আগে পুরাতত্ত্ব সম্পদ সংস্কার করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারি তহবিল সংগ্রহ করা জরুরি বলে ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা মনে করেন। শুধু সংরক্ষণ করে স্থাপনা রক্ষা করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন লালকুঠি এলাকার বাসিন্দা কাওছার আহমেদ।

ডিসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, রাজউক থেকে স্থাপনা সংরক্ষণ করার যে কমিটি করা হয়েছে, তাতে ডিসিসির পক্ষ থেকে একাধিক প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। তাই ডিসিসির প্রকৌশল বিভাগ থেকে কিভাবে সংরক্ষিত এলাকার একটি ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হলো সেটা বোধগম্য নয়।

বিষয়টি জানার জন্য ডিসিসির অঞ্চল-২-এ যোগাযোগ করে জানা যায়, ‘বড়বাড়ি’ বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার পর সর্বমহল থেকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফলে আগের আদেশটি বাতিল করার জন্য গত ১ জুন একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে, যা অচিরেই কার্যকর করা হবে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, যে বাড়িটি ভাঙার চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তা যে সংরক্ষিত এলাকার বাড়ি, সে বিষয়টি জানা ছিল না বলেই এমন ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে ঢাকা জেলা পরিষদের পুরনো ভবন, প্যারীদাস রোডে প্যারীদাসের বাড়ি, মোগল আমলে নির্মিত চুড়িহাট্টা মসজিদ।

দেশের প্রবীণ ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মোগল আমলের ঢাকা নগরীর পুরনো ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা এক ধরনের অপরাধ। শত শত বছরের গৌরবগাথা এসব ভবনের পরতে পরতে রয়েছে। সেগুলো রক্ষা করতে না পারলে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব। ’ তাই এসব ভবন ধ্বংস না করে সংস্কারের মাধ্যমে রক্ষা করা উচিত। আর সেটা করা হলে মানুষ হিসেবে আমরা মহত্ত্ব দেখাতে পারব। ঢাকাকে নিয়ে গর্ব করতে পারব যুগ যুগ ধরে।


মন্তব্য