kalerkantho


মাতৃত্ব ও ডে কেয়ার

তাসলিমা আখতার   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মাতৃত্ব ও ডে কেয়ার

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, নারীর বড় পরিচয় সে মা। উপলব্ধি করেছি, একজন স্বাধীন মানুষ-সত্তা-নাগরিক হওয়ার চেয়েও সমাজে নারীর ‘মা’ পরিচয়ই বড় হয়ে আছে। এর পাশাপাশি পণ্যায়নের দুনিয়ায় যৌন বস্তু হিসেবে নারীর উপস্থাপনও দাপুটে হয়ে উঠতে দেখি মিডিয়াসহ সর্বত্র। নেপোলিয়ান যখন ‘একজন শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারে’ বলে নারীর কাঁধে আপাদমস্তক শিশু লালন-পালনের সমাজ-রাষ্ট্রের দায় চাপিয়ে দেওয়ার কাজে শামিল হন, তখন একজন নাগরিক হিসেবে আহ্লাদিত হতে পারি না। শান্ত থাকতে পারি না সমাজের একপেশে নিয়মনীতিতে। উল্টো ভীষণ আঁতকে উঠি, রেগে উঠি নেপোলিয়ানের এই বাণী যখন মন্ত্রী-সচিব, এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ সমাজের মুখে মুখে প্রতিধ্বনিত হতে দেখি। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ বিল পাস করে মূলত বাল্যবিয়ের আইনি ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে একটি শিশুর কাঁধেও মায়ের দায় চাপানোর ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে খোদ রাষ্ট্র। সমাজের আনাচকানাচে থেকে প্রায়ই শুনি নারী শ্রমিক, উচ্চশিক্ষিত, পেশাজীবী কিংবা যত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিতই হোক, তারই প্রধান দায়িত্ব শিশুর দেখভাল করাসহ মুখরোচক রান্না করা, ঘর সামলানো, পুরুষ সদস্যদের মন জোগানো এবং তাদের আদর্শ হিসেবে মান্য করা। সমাজের চাপানো এসব দায় মাথা পেতে নিতে বিপন্ন বোধ করি। ভাবি, নাগরিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে সমাজে নারীর ভূমিকা তাহলে কোথায়? এতসবে আমি কে, কী পরিচয় নারীর, কোথায় তার ঠিকানা—এসবের উত্তর খুঁজতে থাকি।

এতক্ষণের আলাপে কেউ দয়া করে ভাববেন না যে নারীর মাতৃত্ব পরিচয়ের বিষোদ্গার করছি। শিশু জন্ম দিয়ে সমাজে জনগোষ্ঠী সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পুনরুত্পাদনের কাজ করে নারী। ‘মা’ পরিচয়েই নারী সমাজকে এই বিশেষ উপহার দেয়। এর জন্য নারী স্যালুট পাওয়ার যোগ্য। রাষ্ট্র থেকে নাগরিক ও মানুষ হয়ে ওঠার সব অধিকার ও বিশেষ নজর প্রাপ্য নারীর। বাস্তবে কী পায় নারী? কী পায় নবাগত শিশু, আমাদের ভবিষ্যৎ?

বর্তমানে অর্থনৈতিক কাজে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি। পোশাক কারখানায় নারীর নতুন শ্রমশক্তি হিসেবে যুক্ততা এবং মধ্যবিত্ত নারীর অর্থনৈতিক পেশায় অধিক হারে যুক্ততা অনিবার্যভাবে নারীর ভূমিকাকে নতুন শক্তিতে সামনে এনেছে। এরই ধারাবাহিকতায় পেশাগত কাজ আর ঘরের কাজের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিরোধ। নারীকে এখন করতে হচ্ছে ঘর ও বাইরের দুই কাজই। অথচ নিজে আয় করে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য শিশু লালন-পালন ও ঘরের কাজে অংশ নেয় না। এ অবস্থায় রাষ্ট্র উদ্যোগ নেয়নি নারীর বোঝা কমানোর জন্য মানসম্মত ডে কেয়ার বা জাতীয় রন্ধনশালা তৈরির। বর্তমান সময়ে পেশাজীবী, শ্রমিক ও মেহনতির নিরবচ্ছিন্ন কর্মপরিবেশ ও সত্তার বিকাশের জন্য তাই ডে কেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে সামনে এসেছে। ডে কেয়ার হলেই সব সমাধান হয়ে যাবে এমন নয়, প্রয়োজন আরো নানা উদ্যোগের। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ  প্রাথমিক ধাপ।

আমাদের দেশে ৪৪ লাখ পোশাক শ্রমিকের ৮০ শতাংশই নারী। ইপিজেড ছাড়া বেশির ভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত মানসম্মত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নেই। কারখানায় ডে কেয়ার না থাকায় ছোট শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে না পেরে কাজ ছাড়তে বাধ্য হয় অনেকে। যে অবস্থায় পাঁচ হাজার ৩০০ টাকার সস্তা মজুরিতে পোশাক শ্রমিক নারী জীবন যাপন করে তার লেখক, শিল্পী, ঔপন্যাসিক হওয়া তো শুধু মাটিচাপা দেওয়া স্বপ্নবিলাস। কিন্তু নিজের কিংবা সন্তানের জন্য দুদণ্ড অবসর, নিরাপত্তা সেটাও তো পায় না নারী। কাজ থেকে ফিরে স্বামী-সন্তানের খাবার, আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করতেই রাতের বড় সময় পার হয়। আট ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগও হয় না। সূর্য ওঠার আগেই শিশু-ঘর সামাল দিয়ে দৌড়াতে হয় কারখানার দিকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি থাকে না, থাকলেও সপ্তাহের জমানো কাজ আর সংসার সামলাতে দিন পার হয়। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেখানে কাজ করে, সেখানে টালমাতাল অবস্থায় বাধ্য হয়ে ছোট শিশুকে পাঠাতে হয় গ্রামের বাড়িতে খালা-ফুফু, নানা-নানি বা দাদা-দাদির কাছে, মাদরাসায়, না হয় সস্তা স্কুলে।

মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী নারীরও রেহাই নেই এ সমস্যা থেকে। মাতৃত্বকালে বা পরে কেউ কেউ বিনা বেতনে ছুটি নেয় লম্বা সময়। কাজে যুক্তদেরও পড়তে হয় কঠিন বাস্তবতায়। শিশুর নিরাপত্তার কথা ভেবে কাজে মন বসাতে পারে না।   অনেক সময় ট্রেনিং, অন্য জেলা বা দেশ সফর বাতিল করে তারা। প্রমোশন আটকে থাকে। ক্যারিয়ারের চেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট পেশা বাছতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ে নারী। সমালোচিত হয় অফিসে কাজে অদক্ষতার জন্য আর ঘরে ‘যোগ্য’ মা হতে না পারায়। সমাধান হিসেবে কখনো বা গ্রাম-শহরের অন্য জায়গা থেকে শিশুর দাদি-নানিকে নিয়ে আসা হয় শহরে। এভাবে ঘরের ‘কাজের মেয়েটি’র সঙ্গে দেখভালে অংশ নেয় বৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত দাদা-দাদি, নানা-নানি। একটি শিশু যে কারো মধ্যে আশার সঞ্চার করে, আনন্দ দেয় সন্দেহ নেই। কিন্তু শিশু লালন-পালন কোনো বিনোদনের বিষয় নয়, এটি একটি সময়সাপেক্ষ পরিশ্রমের কাজ, যেটি বৃদ্ধ বয়সের পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপানো অমানবিক। এই নিষ্ঠুর সমাজ শিশুর মা-বাবাকে এই কাজ করতেও বাধ্য করে। এই মধ্যবিত্ত নারী যে উচ্চশিক্ষিত—যার আছে এমএ, পিএইচডি ডিগ্রি, কোথাও শিক্ষকতা করছেন, কাজ করছেন মিডিয়ায়, এনজিওতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিংবা রাজনৈতিক দলে, তাঁদের মধ্যে কজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে আসতে পারছেন, কজন দুনিয়া কাঁপানো ঔপন্যাসিক হতে পারছেন, তাত্ত্বিক হতে পারছেন, ইতিহাসবিদ হতে পারছেন? বড় অংশই এসবের ধারকাছেও না গিয়ে মাঝপথে ছিটকে পড়ছে কাজের আঙিনা থেকে।

পেশাজীবী, শ্রমজীবী মেহনতি নারী যখন শিশু লালন-পালন নিয়ে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়ে, তখন রাষ্ট্র ডে কেয়ারসহ অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়ার বদলে নারীকে গালমন্দ করতে থাকে। নারী যে কতটা অপারগ, কতটা অযোগ্য ‘মা’ হিসেবে, তাই স্মরণ করিয়ে দেয় বারবার। কিন্তু শিশুর লালন-পালন কি শুধু নারীর দায়িত্ব? শিশুরা কি সমাজের সম্পদ নয়? তাহলে রাষ্ট্র কেন দায়িত্ব নিচ্ছে না? পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কি এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত? সন্তান জন্মদান, সন্তানকে স্তন্য পান করানো ছাড়া আর সব দায়ভারই কি সমাজের নির্মিত নয়?

বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি নারী অর্থনৈতিক কাজে জড়িত। ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারে আরো বহুগুণ। শ্রম আইনে বলা আছে, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে ৪০ বা তার বেশি নারী কাজ করে, সেগুলোতে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এক বা একাধিক উপযুক্ত কক্ষ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ’ অথচ সরকারি হিসাবে, ঢাকা ও অন্যান্য জেলা শহরে মাত্র ৪৮টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি তিন লাখ ৮৫ হাজার শিশুর জন্য একটি কেন্দ্র। সংখ্যাগত অবস্থা থেকে মানের নাজুক অবস্থাও বোঝা যায়। বেসরকারি খাতে অল্প কিছু কেন্দ্র রয়েছে, যা সব কর্মজীবী মা-বাবার সামর্থ্যের বাইরে (যেখানে বাচ্চাপ্রতি খরচ খাবার বাদে কোনো অবস্থায়ই ১০ হাজার টাকার কম নয়)। এমন অবস্থায় শিশুর অভিভাবকের জন্য নিশ্চিত কর্মঘণ্টা, নারী ও শিশুর সৃষ্টিশীল বিকাশ, শিশুর নিরাপদ শৈশব ইত্যাদি আপাত-অসম্ভব মনে হতে পারে, যদি না রাষ্ট্র এগিয়ে আসে, সমাজ এগিয়ে আসে।

শিশুর নিরাপদ বিকাশমান শৈশবের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ডে কেয়ার না থাকায় সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী নাগরিক হিসেবে অযোগ্য-অদক্ষ হচ্ছে, তার সৃজনশীল সত্তার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর বিকাশও। ভবিষ্যতের শিশু ও এই সমাজের নাগরিক নারীর প্রতি রাষ্ট্রের সামান্য মনোযোগী উদ্যোগ পরিস্থিতিতে বদল আনতে পারত। নারী-পুরুষ, বিশেষত নারীর কর্মজীবন হতো নির্বিঘ্ন। নারী ও শিশুর মানবিক ও সৃষ্টিশীল সত্তার বিকাশের পথও হতো প্রশস্ত। এসবের জন্য সরকারি উদ্যোগে জনগণের আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে পাড়া-মহল্লা ও কর্মস্থলে পর্যাপ্ত ডে কেয়ার নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। নারী আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকাই পারে ডে কেয়ার ও নারীসত্তা বিকাশের প্রসঙ্গটিকে জরুরি হিসেবে সামনে এনে রাষ্ট্রের কাছে এই চাহিদাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে।

লেখক : সভাপ্রধান, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি

taslima_74@yahoo.com


মন্তব্য