kalerkantho


নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়

বাংলা চলচ্চিত্রের আশি-নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় নায়িকা অঞ্জনা। পুরোদস্তুর নৃত্যশিল্পী হয়েও তিনি হয়েছিলেন চিত্রনায়িকা। অভিনয়ে বিরতি নিলেও এখনো বিশেষ দিবসে, বিশেষ অনুষ্ঠানে ঢাকা কিংবা ঢাকার বাইরে নৃত্য পরিবেশন করেন। নারী দিবসে তাঁর অনুভূতি জানাচ্ছেন রূপক জামান

 

আমার বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে এক মাস বয়স থেকে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনিতে বেড়ে ওঠা। আমার স্কুল-কলেজ সবই ঢাকায়। তখনকার দিনে মা-বাবারা মেয়েদের বেশি দূর পড়াশোনা করাতে চাইতেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমার মা-বাবা ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁরা আমাকে শুধু পড়াশোনায়ই না, সব কিছুতেই অনেক বেশি সমর্থন দিয়েছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় মা সব সময় চাইতেন আমি যেন নাচ-গান শিখি। মা কিন্তু অনেক ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন।

স্কুল ছুটির ফাঁকে ফাঁকে পারিবারিকভাবে আমরা কলকাতায় যেতাম বেড়াতে। এখানকার মতো এত কম সময় ছুটি থাকত না, বেশ লম্বা ছুটি পেতাম। ওই ছুটিতেই সেখানে নাচ শিখেছি। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে মঞ্চে নাচি। ছয় বছর বয়সে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে প্রথম হয়েছিলাম। দুইবার জাতীয় এবং একবার পুরো এশিয়ায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।

মা-বাবার উৎসাহে মঞ্চ, টেলিভিশনে নাচের শো করতে থাকি। সত্যি কথা বলতে, তাঁরা যতটুকু সমর্থন দিয়েছেন, ঠিক ততটুকু সমালোচনা শুনতে হয়েছে কাছের অনেক মানুষের কাছে। কিন্তু আমি দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলাম না, ঠিকই নিজেকে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।

 

একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শো করছিলাম। তখন ডাকসুর ভিপি ছিলেন নায়ক সোহেল রানা ভাই। সেখানে আমার নাচ দেখে তাঁর মনে ধরে। তিনি আমাকে তখন শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত ‘দস্যু বনহুর’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে নেন। মজার কথা হচ্ছে, মা-বাবা এবার বেঁকে বসলেন; বললেন, ‘শুধু নাচ-গান নিয়ে আছ, ভালোই তো আছ, তাহলে আবার সিনেমা কেন?’ কিন্তু ওই যে বললাম, আমার জেদ!

নিজের মধ্যে জেদ ছিল বলে দর্শকদের ভালোবাসা পেতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ইন্ডাস্ট্রির সবাই খুব আদর করত। কটু কথা যে কম শুনিনি তা নয়। কিন্তু আমি ধীরচিত্তে আমার কাজ করে গেছি। একটা সময় মা-বাবাও আমার জন্য গর্ব  করতে শুরু করলেন।

আমি আজকের এ অবস্থানে আসার ক্ষেত্রে ততটা সহজ ছিল না পথচলা। চোখের সামনে কত প্রতিভাকে ঝরে যেতে দেখেছি, সে গল্পে আর যেতে চাই না। তবে আমি খুশি—যুগ বদলেছে, মানুষও বদলেছে। আগের চেয়ে মানুষের রক্ষণশীলতা কমেছে। অনেক মা-বাবাই চান তাঁদের সন্তান নাচ-গানে পরিচিতি পাক, লাইম লাইটে আসুক।

কষ্ট লাগে যখন দেখি খবরের শিরোনাম, শাড়ি চাওয়ায় স্বামী তার স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। যদিও গ্রামে এখনকার সময়ে অনেক মেয়ে পড়াশোনা করছে, স্বাবলম্বী হচ্ছে, তার পরও স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। অন্যদিকে শহরের মেয়েরা বেশি পড়াশোনার কারণে বেশি স্বাবলম্বী ও বেশি আয় করে। যার কারণে কোনো মেয়ের স্বামী নির্যাতন করলে কিংবা পরকীয়া করলে সহজেই ছেড়ে দিতে পারছে। আমি মনে করি, গ্রাম কিংবা শহরের সব মেয়েকেই শিক্ষিত করতে হবে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই নারীর মুক্তি ঘটবে।

একই সঙ্গে নারী ও শিশু ধর্ষণকারীদের শুধু যাবজ্জীবন নয়, ফাঁসির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করতে হবে। আমি নিজে নারীবিষয়ক অনেক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সমাজের সবাইকে নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে। যেকোনো নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।


মন্তব্য