kalerkantho


আদিবাসী নারীর লড়াই

রেন্টিনা চাকমা   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আদিবাসী নারীর লড়াই

মানুষ পরিবর্তনশীল। মানুষের চিন্তাধারাও পরিবর্তনশীল।

তাই আদিবাসী নারীদেরও চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটছে। আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারাও এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। আদিবাসী পুরুষরা শিক্ষা লাভ করার পাশাপাশি নারীরাও এখন শিক্ষিত; বরং অনেক জায়গায় পুরুষের তুলনায় নারীদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। যেমন পার্বত্যাঞ্চলে পুরুষের তুলনায় নারীরা এগিয়ে। তাদের শিক্ষার হার আরো বেড়ে যেত, যদি পার্বত্যাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকত। তাই আদিবাসী নারীদের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য শহরমুখী হতে হয়। আবার সমতলে দেখা যায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও সুযোগ না পাওয়ায় নারীরা ঢাকামুখী হতে বাধ্য হয়। যেমন ময়মনসিংহে মেডিক্যাল কলেজ থাকা সত্ত্বেও অনেক নারীকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। মধুপুরের মেয়ে ডালিয়া জানান, মানসম্মত শিক্ষার অভাবে ভালো ফল না থাকায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। আবার অনেককে দেখা যায়, আসনসংখ্যা সীমিত থাকার কারণে ভালো ফল থাকলেও ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আদিবাসী নারীদের ঢাকামুখী হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো পেশা। বিশেষত দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থানের খোঁজে তাদের ঢাকামুখী হতে হয়। এ ছাড়া নিজেদের সম্পদ অন্যের দখলে চলে যাওয়া, বন মামলায় জর্জরিত হওয়া, গ্রামে কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার অভাবসহ নানা সমস্যার কারণে তাদের বেছে নিতে হয় নগরজীবন। রাজধানী ঢাকায় তারা নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত। সচরাচর বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকরির মধ্যে তাদের দেখা না গেলেও বেসরকারি পেশায় চাকমাসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার নারীদের যুক্ত থাকতে দেখা যায়। প্রধানত মিডিয়া, এনজিও, বেসরকারি ব্যাংক, মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি, পার্লার ও গার্মেন্ট কারখানায় তারা বেশি কাজ করে। আমরা যদি গার্মেন্টশিল্পের দিকে তাকাই, তাহলে ঢাকায় আসা চাকমা জাতিসত্তার একটা বড় অংশ কাঁচপুর, মিরপুর ও সাভার অঞ্চলে কাজ করে। আবার পার্লারের কাজের ক্ষেত্রে গারো বা মান্দি জাতিসত্তার একটা বড় অংশ এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ত্রিপুরা জাতিসত্তার কিছু অংশও পার্লার শিল্পের পেশায় যুক্ত হচ্ছে।

 

শিক্ষাজীবনের সংগ্রাম

ঢাকামুখী হওয়ার পর একজন নারীর ছাত্রজীবনের অধ্যায় সম্পন্ন করার জন্য সর্বপ্রথম একটি নিরাপদ আবাসস্থল খুবই জরুরি, যেখানে থেকে সে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য নারীদের মতো আদিবাসী নারীদেরও কতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রীদের ক্ষেত্রে অনেককে হলে সিট নিয়ে থাকতে দেখা যায়। আর যারা সিট পায় না, তাদের মহিলা হোস্টেল বা বাসা ভাড়া নিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় সাবলেটে থাকতে হয়। এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাসের কারণে পড়তে হয় নানা সমস্যায়।

 

পেশাগত জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ

ছাত্রজীবনের মতো পেশাগত জীবনটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পড়ালেখা বা চাকরি যা-ই হোক না কেন, উৎসাহ না থাকলে তার কাজের মানের জায়গাটায় ঘাটতি থেকে যাবে অবশ্যই। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে গেলে তাই কাজের পরিবেশ, সহকর্মীর মানসিকতা ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত জীবনে কত ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ কাজের পরিবেশ নারীবান্ধব নয়, আর আদিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে তা আরো কঠিন।

এ বিষয়ে সাপোর্টিং পিপলস অ্যান্ড রিবিল্ডিং কমিউনিটিজ (এসপিএআরসি) সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুক্তশ্রী চাকমা সাথী বলেন, ‘পেশাগত জীবনে আদিবাসী নারীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এখনো অভাব রয়েছে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে নারীর কর্মক্ষমতা, অবস্থান—এসব বিবেচনা না করেই তাকে নিযুক্ত করা হচ্ছে শুধু সাইনবোর্ডের জন্য। আদিবাসী নারীদের ভৌগোলিক বা ভাষাগত কারণেও অনেক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কাজ করতে বলা হয়। অনেকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজের যোগ্যতা, স্পৃহা থাকলেও সেসব বিষয় নিয়ে প্রতিষ্ঠান ভাবে না। ’

গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী বিপাশা চাকমা বলেন, ‘অনেক উচ্চশিক্ষিত নারী পেশাগত কারণে ঢাকামুখী হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করে ঢাকায়ই থেকে যাচ্ছে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের জন্য। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল এনজিওগুলোতে তাদের সিনিয়র পজিশনে দেখা যায় না বললেই চলে। মাইনরিটি ইস্যু বা সিএইচটি বেইস প্রগ্রামগুলোতেও আদিবাসী নারীদের সিনিয়র পজিশনে তেমন দেখা যায় না। মেইনস্ট্রিম পপুলেশনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আদিবাসী নারীদের প্রতি সহযোগিতামূলক আচরণ বাড়াতে হবে। এটি খুব জরুরি। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আদিবাসী নারীকেও পুরো বাংলাদেশের উন্নয়নের ইস্যু নিয়ে আরো মনোযোগী ও কৌশলী হতে হবে, যাতে আদর্শ বজায় রেখে যার যার অবস্থানে নিজেকে টিকিয়ে রেখে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ’

আদিবাসী নারীদের একটি বড় অংশ গার্মেন্ট সেক্টরে কাজ করে; যদিও এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই যে কতজন আদিবাসী নারী এই সেক্টরে কাজ করে।

তবে বেশির ভাগ গার্মেন্টে নারী কর্মীর বেতন পাঁচ হাজার টাকার নিচে। এই টাকার মধ্যে তাদের মৌলিক চাহিদা ও অন্য সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে আদিবাসী নারীরা গার্মেন্ট সেক্টরে অথবা করপোরেট সেক্টরে চলে এলেও তারা বাঙালি সহকর্মী ও চাকরিদাতাদের কাছে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হয়। ট্রেড ইউনিয়নও তাদের সমস্যা ও বৈষম্যের কথা নজরে আনে না। তা ছাড়া সব নারীর মতোই আদিবাসী নারীদেরও বকেয়া বেতন, অনির্দিষ্টকালের জন্য বেতন বিলম্ব, চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি তো রয়েছেই।

এ ছাড়া কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট অফিসার ফাল্গুনী ত্রিপুরা বৈষম্য ও নেতিবাচক মন্তব্যের কথা তুলে ধরেন। ঢাকা শহরের অনেক পার্লারে মূলত মান্দি জাতিসত্তার নারীরা কাজ করে থাকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এখানে প্রধান সমস্যা হলো বাসস্থান। কিছু বড় পার্লারে মালিক বিউটিশিয়ানদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে থাকা অত্যন্ত কষ্টের।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ফ্ল্যাটে ২২ জন পর্যন্ত থাকে। সেখানে কোনো খাটের ব্যবস্থা নেই, অর্থাৎ সবাই মেঝেতে ঘুমায়। ছয়-সাতটি পরিবার মিলে একটি রান্নাঘর বা বাথরুম ব্যবহার করতে হয়। মান্দি বিউটিশিয়ানরা সৎ ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে। তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী।

শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম থাকলেও এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬৮ শতাংশ বিউটিশিয়ানই ১০-১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে থাকে। আবার বেশির ভাঘ পার্লারে কোনো নিয়োগপত্র নেই। অনেক মালিক বন্ড সাইন নিয়ে নেন। ফলে পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি বেশির ভাগ বিউটিশিয়ানই কর্মক্ষেত্রে ছুটি পায় না।

মানুষ চিন্তা করে, বোঝে এবং কী করতে হবে সেটাও জানে। এ কারণেই কি মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব? নাকি মানুষের মধ্যে মানবতা আছে বলেই সেরা? আমি মনে করি, মানবতাহীন মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হতেই পারে না। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলেই কি মানুষে মানুষে এত হানাহানি, নারী আর পুরুষ নামক মানুষের মাঝেও এত বৈষম্য! পুরুষ যেমন মানুষ, নারীও তেমনি মানুষ—সে মানুষ সমতলের হোক আর পাহাড়ের হোক। তাই পাহাড় ও সমতলে মানুষ থেকে মানুষের (নারী ও পুরুষের নয়) মাঝে জেগে উঠুক পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির দৃষ্টিভঙ্গিগুলো, যা দ্বারা মানুষ হয়ে উঠতে পারে সৃষ্টির সেরা জীব!


মন্তব্য