kalerkantho


স্পটলাইট

আমরা তো এক দিনের বাঙালি!

আরিয়ান অর্ক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আমরা তো এক দিনের বাঙালি!

সময়টা সন্ধ্যা সোয়া ৭টা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদির দুই পাশের হ্যালোজেন বাতিগুলো জ্বলছে আর চারপাশের বাতিগুলো বন্ধ! আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল একটি নোটিশ বোর্ড, যেখানে সাদা হরফে লেখা, ‘মূল বেদিতে জুতা পায়ে ওঠা ও বসা নিষেধ’। অবাক করার বিষয় হলো, এই বোর্ডটির মুখোমুখি মূল বেদির ছোট্ট সিঁড়িতে অনেকেই জুতা পায়ে বসে দিব্যি গল্প করছেন! বেদিমূলে মা-বাবার হাত ধরে আসা ছোট্ট শিশুরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল তরুণ-তরুণীরাও। কেউ কেউ এদিক-সেদিক হাঁটছিল। বেশির ভাগকে দেখা গেল মূল মিনারকে পেছনে রেখে সেলফি তুলতে। সবার পায়ে জুতা। কয়েকজন হকারকে দেখা গেল বাদাম ও চা-সিগারেট নিয়ে ঘুরছে। সাধারণত মূল মিনারের নিচে কারো বসার কথা নয়। কিন্তু মূল মিনারের ঠিক নিচে বসা তিন প্রেমিক যুগল। এর মধ্যে একটি মেয়ের পরনে সাদা রঙের স্কুল ড্রেস, বাকি দুজন বোরকা পরা। মূল বেদি থেকে হাতের বাঁয়ে ও ডানে অনেকে বসে গল্প করছে।

তরুণ-তরুণীরাই সংখ্যাই বেশি।

এসব দেখে কারো বোঝার উপায় নেই, মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই ফুলে ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল এই ভালোবাসার মিনারটি! পশ্চিম প্রান্তে শহীদ মিনারের নিচের অংশটা বেশ অন্ধকার। জায়গায় জায়গায় ময়লার স্তূপ। দুর্গন্ধ এসে ঝাপটা মারে নাকে। সেদিকটার দেয়ালে ভাষা আন্দোলনের নানা চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কয়েকজন যুবককে দেখা গেল সেই দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে! শহীদ মিনারের চারপাশের জায়গা দখল করে বসেছে বেশ কিছু অস্থায়ী খাবারের দোকান। সামনের অংশে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা মেলে কিছু ছিন্নমূল মানুষের। এ ছাড়া যেখানে-সেখানে রয়েছে শহীদ মিনারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ, বাদামের খোসা, চিপস, বিস্কুট কিংবা আইসক্রিমের খালি প্যাকেট।

মূল বেদিতে জুতা পরে ওঠা নিষেধ থাকলেও শুধু যে জুতা পায়ে লোকজনকে দেখা গেছে তা নয়, শহীদ মিনারের ভেতরে মোটরসাইকেল নিয়েও কসরত করছিল বেশ কিছু তরুণ। এ সময় কথা হলো কয়েকজনের সঙ্গে। বংশাল থেকে এসেছেন সাজেদুল সজীব। বললেন, ‘শহীদ মিনার শ্রদ্ধা জানানোর জায়গা, এটা ঠিক। কিন্তু শহরের অন্য কোনো জায়গা এমন উন্মুক্ত না থাকায় বন্ধুরা মিলে এখানে এসেই আড্ডা জমাই আমরা। ’ পটুয়াখালী থেকে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আহমেদুল হক। তিনি বললেন, ‘আজকেই বাড়ি ফিরে যাব। হাতে সময় থাকায় ভাবলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটা একপলক দেখে যাই। ’ কিন্তু কথাবার্তায় বোঝা গেল, এখানে এসে কিছুটা বিরক্ত তিনি। বললেন, ‘নৈতিকতার থেকেই শহীদ মিনারের প্রতি আমাদের যথাযথ সম্মান ও গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। কিন্তু এখানে এসে সেটার ছিটেফোঁটাও দেখলাম না। দেখবই বা কী করে, আমরা তো এক দিনের বাঙালি! এক দিন ফুল দিই, খালি পায়ে আসি, শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু অন্যান্য সময় যে এর কী হাল, কার এত বয়ে গেছে তা দেখবে!’

অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় শহীদ মিনারের আশপাশে ভবঘুরেদের অবস্থান, অসামাজিক কার্যকলাপ, মিটিং, মিছিল ও পদচারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং শহীদ মিনারের এক পাশে এসব নিয়ম-কানুন সংবলিত নোটিশ বোর্ড আছে। তবে সেদিকে কারো নজর নেই!

 

ভাষাশহীদদের স্মৃতির মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিশেষ কয়েকটি দিন ছাড়া সারা বছরই থাকে অবহেলা ও দৈন্যদশায়। জাতি হিসেবে আমাদের নির্মাণ-বিনির্মাণের ঐতিহাসিক বাঁকবদলের বিশেষ দিবসগুলোকে শুধু উৎসবে পরিণত করেছি। অক্ষম হয়েছি তার প্রকৃত মাহাত্ম্য বোঝাতে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় জুতা পায়ে ওঠা নিষিদ্ধ হলেও চলে হরহামেশাই


মন্তব্য