kalerkantho


মেয়র সমীপে

উত্তরা মডেল টাউন না গাড়ির ভাগাড়!

ঢাকা ৩৬০° প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উত্তরা মডেল টাউন না গাড়ির ভাগাড়!

১১ ও ১৩ নম্বর সেক্টরের প্রধান সড়কে গড়ে তোলা হয়েছে রাইদা পরিবহনের স্ট্যান্ড। ওই পরিবহনের গন্তব্য দিয়াবাড়ী হলেও তারা উত্তরাকে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের বড় গাড়িগুলো রাস্তায় চলতে গেলেই যানজটের সূচনা হয়

রাজলক্ষ্মী মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলা হাকিম উদ্দিন ফকির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যানজটের কারণে অনেকটা দূরে গাড়ি রেখে হেঁটে এখানে আসতে হয়েছে তাঁকে। প্রায় প্রতিদিন রাজলক্ষ্মীর আশপাশের রাস্তা ও গলিগুলো ব্যক্তিগত গাড়ি আর রিকশায় ঠাসা থাকে। মার্কেটগুলোতে আসা ক্রেতাদের গাড়িগুলো রাস্তায় রেখেই সদাই করতে যান বলে এ অবস্থা। অথচ বহুতল আধুনিক বিপণিবিতানগুলোর প্রতিটিতে নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে পার্কিং থাকলেও সেখানে বিভিন্ন দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা হয়েছে।

রাজলক্ষ্মী এলাকায় ব্যাপক যানজটের আরেকটি কারণ হলো, ৩ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডটি দীর্ঘদিন দখল করে রাখা হয়েছে। সেখানে চালক লীগের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাস্তার ওপর শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি রেখে কমপক্ষে ৫০টি টংঘরে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা করছে একটি চক্র। শহীদ নূর হোসেনের ছোট ভাই আলী হোসেন হলেন চালক লীগের সভাপতি। মূলত তাঁর নেতৃত্বেই উত্তরাসহ ঢাকার অনেক সরকারি জায়গা, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করা হয়েছে।

অন্যদিকে ২ নম্বর রোডের উত্তর মাথা অর্থাৎ আজমপুরের দিক দিয়ে নতুন উত্পাত শুরু করেছে হলার নামের তিন চাকার কিছু গাড়ি।

রাস্তার ওপর যেখানে-সেখানে হলারগুলো রেখে যাত্রী ওঠানামা করায়। ফলে সেখানে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানকার বাসিন্দা পারভিন বেগম বলেন, ‘এসব হলারের অত্যাচারে বাসায় বাস করা দায় হয়ে উঠেছে। বাচ্চাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি, কখন জানি হলারের নিচে পড়ে!’ এ প্রসঙ্গে এলাকাবাসী জানায়, থানা ও ট্রাফিক পুলিশের মূল আদায় হয় এদের চাঁদা থেকে। ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘চালক লীগ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের কাছে আমরা অসহায়। তারা কোনো আইন মানে না। আবাসিক এলাকায় রাস্তা দখল করে গাড়ির ব্যবসা করছে। এসব উচ্ছেদ করতে গেলে আমাদের বাধা দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আমরা বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালেও সেখান থেকে ঠিকমতো নির্দেশনা আসে না। ফলে আমরা অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে পারছি না। ’

একই ধরনের হলার উত্তরা হাউস বিল্ডিং বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন মাসকট প্লাজার সামনে সোনারগাঁ জনপথের প্রবেশপথ আটকে দিয়েছে। হাউস বিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়ী রোডে চলাচলরত প্রায় ১০০টি হলার গাড়ি থেকে ৩০০ টাকা হারে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, পরিবহন শ্রমিকদের কাছে যা জিপি হিসেবে পরিচিত। এর কোনো অডিট হয় না। এমনকি রেজিস্টারে উল্লেখ করা হয় না।

উত্তরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো ১১ ও ১৩ নম্বর চৌরাস্তা। সোনারগাঁ জনপথের এই এলাকাকে উত্তরার গুলিস্তান বলা হয়। অথচ সেই চৌরাস্তার পশ্চিম পাশে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের বিশাল স্ট্যান্ড বানিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণে সেখানে লম্বা যানজট লেগেই থাকে। আবার ১১ ও ১৩ নম্বর সেক্টরের প্রধান সড়কে থানার মোড়ে গড়ে তোলা হয়েছে রাইদা পরিবহনের স্ট্যান্ড। ওই পরিবহনের গন্তব্য দিয়াবাড়ী হলেও তারা উত্তরাকে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের বড় গাড়িগুলো রাস্তায় চলতে গেলেই যানজটের সূচনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাইদা পরিবহনের জন্য ৩০টি গাড়ি চলাচলের রুট পারমিট থাকলেও তারা প্রায় ৮০টি গাড়ি চালাচ্ছে। ফলে পুরো উত্তরা পরিণত হয়েছে গাড়ির ভাগাড়ে!

রাইদা পরিবহনের চেয়ারম্যান ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, দিয়াবাড়ী থেকেই তাঁদের গাড়ি চলার কথা। কিন্তু হলার গাড়ির মালিক-শ্রমিকদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য তাঁদের গাড়ি সেখানে যেতে পারছে না। ’ ৩০টি গাড়ির অনুমোদন নিয়ে তাঁরা কিভাবে ৮০টি গাড়ি চালাচ্ছেন সে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে তিনি বলেন, ‘সেই হিসাবটা এভাবে ফোনে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, তখন সব তথ্য দেওয়া হবে। তা ছাড়া আমরা যা-ই করছি, ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করেই করছি। ’

সরেজমিন গিয়ে থানা মোড়ে ১২-১৩টি রাইদা বাস রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উত্তরা আবাসিক এলাকায় রাইদা পরিবহনের কোনো স্ট্যান্ড নেই। তারা অবৈধ পার্কিং করে ব্যবসা করছে। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলাও করা হয়েছে। কিন্তু এর পরও তারা উত্তরা থেকে সরে যেতে চাইছে না। ’

১১ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরীফ বলেন, ‘যেভাবে উত্তরা মডেল টাউন বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, তাতে বাস করা দুরূহ হয়ে উঠেছে। রাস্তায় বেরোলে হেঁটে যাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। সর্বত্র গাড়ি আর গাড়ি। এখানে-সেখানে রাস্তার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি রাখা হচ্ছে। ’

স্থানীয় লোকজন জানায়, উত্তরাবাসী বর্তমানে অসহায়। পুলিশ তাদের কোনো কথাই আমলে আনছে না। বরং পরিবহন মালিকদের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরম বেশি। তাই মেয়র আনিসুল হকের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের আর কোনো গতি নেই। তাঁর নেতৃত্বে যেমন উত্তরা প্রকৃত মডেল টাউনে পরিণত হচ্ছে, তেমনি তাঁর হস্তক্ষেপে উত্তরা থেকে গাড়ির ভাগাড়ের মূলোত্পাটনও হবে।


মন্তব্য