kalerkantho


রাজনীতির বিসর্জনে

ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান

আবুল কাশেম   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান

ছবি : মীর ফরিদ

‘সোনার বাংলার ভাইয়েরা আমার! স্বাধীনতার ১৭ বছর পরে আবার জনগণের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে নামতে হবে, ১৭ বছর পর আবার ভোটের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হবে, ১৭ বছর পর আবার রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হবে—এ কথা কোনো দিন ভাবিনি। ’ ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ১৯৬৪ সালের ১২ জুলাই তখনকার সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’-এর জনসভায় পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের শুরু হয়েছিল এভাবে।

পল্টনে দাঁড়িয়ে গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তারও অনেক আগে থেকেই শুরু। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে মওলানা ভাসানী, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া—সবাই দাঁড়িয়েছেন পল্টন ময়দানে, উত্তরে মুখ করে আঙুল উঁচিয়ে হুঁশিয়ার করেছেন প্রতিপক্ষকে। পল্টন ময়দান থেকে ছড়ানো রাজনীতির উত্তাপ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ত সারা দেশে। সরকারের সমালোচনা, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠা সেই পল্টন ময়দান থেকে বিদায় নিয়েছে রাজনীতি। নতুন ঠিকানা গড়ে নিয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতা প্রাঙ্গণে, তখনকার রেসকোর্স আর এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আর উত্তাল রাজনীতির মতো সঙ্গ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানের বুক চিরে গড়ে উঠছে একের পর এক ক্রীড়া কমপ্লেক্স আর ফাউন্ডেশন।

‘ভাইসব...ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক বি-শা-ল মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে’—এজাতীয় মাইকিং এখন আর শোনা যায় না ঢাকায় কিংবা ঢাকার বাইরে। রাজনৈতিক কর্মীদের মিছিলে, স্লোগানে পল্টন ময়দান উপচে আশপাশের রাজপথগুলো আর উত্তাল হয় না। বরং নানা জাতের খেলাধুলার কমপ্লেক্সের শক্ত পিলার পল্টন ময়দানের ঐতিহাসিক মাটির বুক চিরে প্রবেশ করছে গভীরে।

শুধু পূর্ব দিক খালি রেখে তিন দিক থেকে সংকুচিত হয়ে আসছে এককালের বিশাল পল্টন ময়দান। ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান এলাকা ঘুরে দেখা গেল, পশ্চিম পাশে উত্তর-দক্ষিণ লম্বা হয়ে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল ‘শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স’। দক্ষিণে যেখানে জনসভার মঞ্চ বানানো হতো, যেখানটায় দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেখানটার কিছু অংশ নিয়ে দক্ষিণের সীমানা পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ অ্যামেচার বক্সিং ফেডারেশন। আগে থেকেই অল্প জায়গায় গড়ে ওঠা অলিম্পিক ফেডারেশনও নিজের আঙিনা বাড়িয়েছে সেখানে। উত্তর-পূর্ব কোণে গড়ে উঠেছে হ্যান্ডবল ফেডারেশন, নার্সারি। আর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তার দক্ষিণ অংশ ঘেঁষে ব্যবস্থা করা হয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের এক দোকানদার মোসলেম উদ্দিন জানান, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের দিন দোকানপাট বন্ধ রাখতে হতো। তবে তা মেনে নিতে আমাদের কোনো কষ্ট হতো না। এখানে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এইচ এম এরশাদসহ জাতীয় নেতারা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। রাজনীতির এই স্মৃতিচিহ্নটি ধরে রাখা, সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ধরনের খেলার জন্য অফিস করা, মাঠ করার জন্য পল্টন ময়দান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন প্রজন্ম ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান বলতে শুধু কল্পনা ছাড়া আর কোনো কিছুই দেখতে পাবে না।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সব ধরনের ক্রীড়া কমপ্লেক্স দুই স্টেডিয়ামকে ঘিরে পল্টন ময়দানে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত আছে সরকারের। খেলার জায়গা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে তোলা যায় না। সে কারণেই পল্টন ময়দান সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে একটি নতুন সেনানিবাস গড়তে ঢাকার তখনকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস নবাবপুর ও ঠাঁটারীবাজার ছাড়িয়ে শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেশ কিছু অংশ সংস্কার করেন। সেখানে সিপাহিদের ছাউনি, অফিসারদের বাসস্থান ও প্যারেড গ্রাউন্ড করা হয়। এ এলাকাটিই বর্তমান পল্টন বা পুরানা পল্টন এলাকা। পল্টন পুরনো পাণ্ডু নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। মশা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন উপদ্রব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সেনানিবাসটি পরিত্যক্ত হয়। এর সমর্থনে ১৮৪০ সালে ঢাকা ভ্রমণকারী ডেভিডসনের বক্তব্য পাওয়া যায়। ১৮৫৯ সালে তত্কালীন সার্ভেয়ার জেনারেলের ঢাকার মানচিত্রে পল্টনকে একটি বিরান অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়। ১৯৫৩ সালে সেনানিবাস লালবাগে স্থানান্তরের পর পল্টন এলাকাটির পরিচর্যার দায়িত্ব মিউনিসিপ্যাল কমিটির কাছে দেওয়া হয়। এর এক অংশে গড়ে ওঠে ‘কম্পানির বাগান’। আরেক অংশ খেলাধুলা ও বিভিন্ন সময় সিপাহিদের কুচকাওয়াজের জন্য ব্যবহার করা হতো। উনিশ শতকের শেষার্ধে পল্টনে মাঝেমধ্যে জনসভা হতে শুরু করে।

এই ময়দানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানকে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ জানিয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নানা দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা দিয়েছেন এখান থেকে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতনের পর নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয় পল্টন ময়দান। ঢাকার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের স্মারক এ ময়দানটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া বিভিন্ন মেয়াদে পরস্পরবিরোধী আন্দোলনে জনসমর্থনের ‘শোডাউন’ ভেন্যু হিসেবে বেছে নেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় পল্টন ময়দান। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিয়মিত হতো এখানে। তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে পল্টনে সভা-সমাবেশের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় তা কমে আসে। রাজনীতির পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে খেলাধুলারও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নেয় পল্টন ময়দান। ১৯৭৮ সালে মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী বাংলাদেশ সফরে এলে তাঁকে পল্টন ময়দানেই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজপথে মিছিল-সমাবেশের কারণে নগরবাসীকে তীব্র যানজটে ভুগতে হতো। ওই অবস্থার কারণে ঢাকার তত্কালীন সিটি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ পল্টন ময়দানকে সিটি করপোরেশনের অধীনে নিয়ে জনসভা ও সমাবেশের জন্য নির্দিষ্ট স্থান হিসেবে ঘোষণা দেন। তবে গত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পর পল্টন ময়দানের নিয়ন্ত্রণ পায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। তার আগে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পল্টনে বিশাল সমাবেশ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট, যে সমাবেশে যোগ দিতে আগের দিন সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। ওই সমাবেশে শেখ হাসিনা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বঙ্গভবনে অক্সিজেন বন্ধ করার হুমকি দেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর পল্টন ময়দানে বড় কোনো জনসভা হয়েছে কি না, সে তথ্য জানাতে পারেননি ময়দানঘেঁষা দোকানদাররা। তাঁরা বলেছেন, তার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় সমাবেশগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হচ্ছে। আর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী ও নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় সভা-সমাবেশ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পল্টন ময়দানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ স্থান সাবেক রেসকোর্স ময়দান, যা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পেলে রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রেসকোর্স ময়দানে এক মহাসমাবেশের আয়োজন করে। ওই সমাবেশে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যরা প্রকাশ্যে শপথ নেন যে কোনো অবস্থায়ই, এমনকি পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের চাপের মুখেও তাঁরা বাংলার মানুষের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ৯ মাস যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী রেসকোর্স ময়দানেই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে।   স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য দেন। তখন থেকে রেসকোর্স ময়দান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশের কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে ১৯৭৫ সালের পর এলাকাটিকে সবুজে ঘেরা পার্কে পরিণত করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়কার ঘটনাবলি স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৯ সালে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়েছে। পাকিস্তানের পরাজিত বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে স্বাধীনতা টাওয়ার।


মন্তব্য