kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

আড্ডার ঘড়ি থেমে থাকে

আড্ডা কিন্তু মগজের আড়মোড়া ভাঙে, তর্ক-বিতর্কে অনেক চিন্তার নতুন গঠন হয়; সবচেয়ে বড় কথা, ভিন্ন চিন্তা নিয়েও যে একসঙ্গে ওঠা-বসা-চলা যায় সেটা শেখায়

আবুল হাসান রুবেল   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আড্ডার ঘড়ি থেমে থাকে

যদি বলা হয়, কোনো একটি কারণ বলেন, যেটার কারণে আপনার ঢাকা ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে, তাহলে আমি বলব—আড্ডা। এই ঢাকা শহরের প্রাণ আসলে তার আড্ডাগুলো।

একেক আড্ডার চরিত্র আলাদা। বয়স অনুযায়ী, কাজের ধরন অনুযায়ী, বসবাসের এলাকা অনুযায়ী এর আছে নানা রকমফের। তার জন্য প্রথমে যেটা চাই সেটা হলো মোটামুটি নিরুপদ্রবে বসার একটি জায়গা, যেখানে কিছুক্ষণ পর পর এসে দোকানি আপনি আর কী নেবেন জানতে চাইবে না বা এমন কোনো ভাব করবে না যে আপনারা উঠে গেলেই সে বাঁচে; বরং মাঝেমধ্যে সে নিজেও আড্ডার অংশ হয়ে যাবে। আর দরকার একদল আড্ডাবাজ সঙ্গী। সেটা হলে যেকোনো জায়গায়ই আড্ডা চলতে পারে। তার পরও সব জীবন্ত শহরেই মনে হয় আড্ডার বিশেষ কিছু জায়গা গড়ে ওঠে। আমাদের যখন তুমুল আড্ডার কাল, তখন তার জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গাগুলো ছিল বেইলি রোড, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, ধানমণ্ডি লেক, টিএসসি। আরো আগে একসময় আড্ডার জন্য বিখ্যাত ছিল বিউটি বোর্ডিং। বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা সেখানে আড্ডা দিতেন। তবে আড্ডা জমত পাড়া-মহল্লায় সর্বত্রই।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমরা ধুন্ধুমার আড্ডা দিয়েছি প্রথম দিকে কার্জন হলের পুকুরপাড়ে, তারপর টিএসসিতে। সেই আড্ডায় হৈচৈটাই ছিল প্রধান। এরপর আড্ডার সঙ্গী বাছাই শুরু হলো, তার একটা নির্দিষ্ট চরিত্র, পরিমণ্ডল দাঁড়াল। মধুর ক্যান্টিনে শুরু হলো আমাদের নতুন পর্ব। দুনিয়ার হেন কোনো বিষয় নেই, যেটা নিয়ে আমরা আলাপ করতাম না, তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতাম না। এ রকমই একদিনের কথা বলি। তখন সদ্য ক্লোনিং আবিষ্কৃত হয়েছে। আমরা খুব গভীর আলোচনায় রত যে প্রজাতি হিসেবে পুরুষ জাতির আর আদৌ কোনো দরকার থাকবে কি না, পুনরুত্পাদনে তার ভূমিকা যদি শেষ হয়ে যায়। নানা মত-পাল্টামত আসছে। আলোচনার মধ্যে সবারই একসঙ্গে চা খাওয়ার তেষ্টা জেগে উঠল। যথারীতি মধুর ক্যান্টিনের বয় কবিরকে ডাকা হলো চা দিতে। আমরা তখন ভীষণ ব্যস্ত তর্কে। তাই কবির যখন জিজ্ঞেস করল কয়টা চা দেব, তখন এত গোনাগুনির সময় আমাদের নেই। বলে দিলাম, ‘দে মাথা গুইনা। ’ তখন কবির বলে, ‘ক্যান ভাই, চা কি মাথায় ঢালবেন?’ তার কথা শুনে হাসতে হাসতে আমরা বাঁচি না! আড্ডার মোড় ঘুরে গেল পুরোটাই। এভাবে আড্ডার জায়গা, তার বয়-বেয়ারা, পাশের গাছটা, লেজ নাড়ানো কুকুরটা, পাখিটা—সবই আড্ডার অংশ হয়ে ওঠে। আর আপনি যত হোমরাচোমরা কেউই হয়ে উঠুন না কেন, পরবর্তী সময়ে আপনি তার কাছে অনেক পরে ফিরে এসেও দেখবেন কোনো এক আড্ডাবাজ তরুণ অথবা অমুক ভাই রয়ে গেছেন।

এ রকম এক ঘটনা শুনেছিলাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে। তখন তিনি বেশ বড় শিল্পী। তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তখন মুরব্বি স্থানীয় একজন এসে বললেন, ‘তুমি শুনছি অনেক বড় শিল্পী হইছ, আমার ছাতাডায় একটু নাম লেইখা দ্যাও দেখি!’ এ ধরনের ঘটনা আরো অনেক শোনা যায় বিভিন্ন বিখ্যাতজন সম্পর্কেই। আসলে এই ঘটনাগুলো দেখায়, এই অঞ্চলে বিখ্যাত আর সাধারণের মধ্যে অনতিক্রম্য কোনো ব্যবধান নেই। গোটা বাংলাদেশেই এ বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে, ঢাকায়ও তা প্রবলভাবেই আছে। কোথা থেকে কোথায় তা ছড়িয়েছে বলা মুশকিল। তবে যেটাই হোক, এই বৈশিষ্ট্য যে আড্ডাবাজির ক্ষেত্রে বেশ ভালো অনুঘটক আর আড্ডাবাজিও যে এ রকম সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রভাবক তাতে খুব সন্দেহ নেই।

এসব আড্ডার একটা বড় অংশই এখন উঠে গেছে। তার বহু কারণ আছে। তবে প্রধান কারণ সম্ভবত একদিকে বাণিজ্যিকীকরণের চাপ, অন্যদিকে নিরাপত্তার সংকট। পুরনো বহু আড্ডার জায়গা আড্ডার জায়গা হিসেবে আর টিকে থাকতে পারেনি বাণিজ্যিকীকরণের চাপে। বেইলি রোড বা আজিজ সুপারমার্কেট এর নগদ উদাহরণ। আরেকটি কারণ হলো নিরাপত্তার কথা বলে আড্ডাকে সংকুচিত ও বন্ধ করে দেওয়া। নিরাপত্তা বাহিনী বা কর্তাব্যক্তিদের কেন জানি আড্ডা এখন চক্ষুশূল। তারা কোনো এলাকায় বিশিষ্ট ব্যক্তির আগমন ঘটলে, সন্ত্রাসী হামলা হলে, এমনকি ক্রিকেট ম্যাচ হলেও প্রথমেই খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে আড্ডার জায়গাগুলোর ওপর। এমনকি বিভিন্ন চায়ের দোকানে বেঞ্চ পেতে রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যেন আড্ডাই নষ্টের গুরু! অথচ আড্ডা কিন্তু মগজের আড়মোড়া ভাঙে, তর্ক-বিতর্কে অনেক চিন্তার নতুন গঠন হয়; সবচেয়ে বড় কথা, ভিন্ন চিন্তা নিয়েও যে একসঙ্গে ওঠা-বসা-চলা যায় সেটা শেখায়। একদিকে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে, অন্যদিকে আড্ডার জায়গাগুলো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মানুষ এখন অনেক বেশি ব্যস্ত ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাংলাদেশে ফেসবুকের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণ সম্ভবত এটাও। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর নানা সুবিধা-অসুবিধা আছে, কিন্তু সেটা আসলে আড্ডার বিকল্প নয়। এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তাই একটা বিষয়ই শুধু উল্লেখ করব। ফেসবুকের অ্যালগরিদম আসলে ভিন্ন চিন্তার সঙ্গে পরিচয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। আপনার ঝোঁক যেদিকে, শুধু সেগুলোই সে আপনার সামনে দৃশ্যমান করে। আর একটা মানবিক যোগাযোগে যে পরিমাণে মতামত আদান-প্রদানের সুযোগ থাকে, এ ধরনের যোগাযোগ মাধ্যমে তা থাকে না। কারণ তার আরো অনেক দর্শক থাকে; ফলে সেখানে সে জিতে যেতে মরিয়া থাকে। আড্ডা যতটা ইনক্লুসিভ, এগুলো তা নয়। ফলে বিভিন্ন মতের সহাবস্থানের, একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী সমাজের জন্য বরং আড্ডা জরুরি। আড্ডাই পারে যেকোনো উগ্রবাদী মতাদর্শের বিপরীতে গণতান্ত্রিক পরিসর বাড়াতে। ঢাকায় আড্ডার জায়গার ক্রমসংকোচন আর বিপরীতে ইন্টারনেটভিত্তিক সক্রিয়তার বিস্তার এখানকার সমাজে কী প্রভাব রাখছে, সেটা গুরুতর গবেষণার দাবি রাখে।

তবে এত কিছুর পরও ঢাকার আড্ডাকে একেবারে থামিয়ে দেওয়া যায়নি। আড্ডাগুলো তার জায়গা খুঁজে নিচ্ছে। এমনকি যেসব নতুন বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠছে, তার আশপাশেও বসে যাচ্ছে নতুন আড্ডা। আর চায়ের দোকানগুলো হয়ে উঠছে নানা শ্রেণির, বয়সের মানুষের আড্ডাস্থল। সেখানে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আড্ডা দিচ্ছে। সম্ভবত সারা দুনিয়ায় কোনো শহরেই ঢাকা শহরের চেয়ে বেশি চায়ের দোকান নেই। চা খাওয়ার চেয়ে আড্ডা মারার প্রয়োজনটাই এখানে প্রধান।


মন্তব্য