kalerkantho


এপিঠ-ওপিঠ

জালিয়াতি করার পথ খোঁজেন জাহাঙ্গীর আলম

ঢাকা ৩৬০° প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জালিয়াতি করার পথ খোঁজেন জাহাঙ্গীর আলম

আমিনবাজারের বড়দেশী মৌজায় একটি আবাসন কম্পানি অনেক চেষ্টা করেও তাদের প্লট রেজিস্ট্রি করতে পারছে না। সর্বশেষ রেকর্ড অনুযায়ী জমির শ্রেণি নাল হলেও সাভারের সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম তা ভিটি হিসেবে রেজিস্ট্রি করতে আগ্রহী।

তা না হলে নাল ও ভিটি জমির মধ্যে সরকারি রাজস্বের যে তারতম্য ঘটবে, তার তিন ভাগের এক ভাগ টাকা তাঁকে ঘুষ হিসেবে দিতে হবে। কিন্তু সেই আবাসিক কম্পানির মালিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা তাঁর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কম্পানির প্লটগুলো রেজিস্ট্রিহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের শেষ নেই। শ্রেণি পরিবর্তন করে জমি রেজিস্ট্রি করে তিনি সরকারের শত শত কোটি টাকা ফাঁকি দিচ্ছেন। অন্যদিকে সেই ফাঁকি দেওয়া টাকার তিন ভাগের এক ভাগ নিজের পকেটে ভরছেন। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘তিন ভাগের এক ভাগ সাবরেজিস্ট্রার’ খেতাব পেয়েছেন। আর এই সুযোগে অসৎ দলিল লেখকরা প্রতিদিনই এ ধরনের দলিল রেজিস্ট্রি করে নিচ্ছেন। এমনকি সাভার টাউনের বহুতল ভবনের জমির দলিলও তিনি নাল হিসেবে রেজিস্ট্রি করেছেন এমন অনেক প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে, যার সংখ্যা শতাধিক।

এর মধ্যে গত বছরের ২৮ জুন একই দিনে তিনি গেণ্ডা মৌজার এক একর ৩১ শতাংশ নাল জমি বিক্রির চারটি দলিল রেজিস্ট্রি করেন, যার দাতা অনিল চন্দ্র বণিক ও মিনা রানী বণিক।

গ্রহীতা হলেন আবদুল বারী চৌধুরী মুকন। দলিল নম্বর ১০৬০৮, ১০৫৬৮, ১০৬০৬ ও ১০৬৮২। জমির শ্রেণি নাল হলেও তা বদলে বাইদ করা হয়েছে। এর ফলে জমির বাজারমূল্য তিন কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯০৯ টাকার পরিবর্তে এক কোটি ৪১ লাখ ৩৫ হাজার ৩১ টাকা হয়ে যায়। ফলে সরকারের রাজস্ব কমে যায় ২০ লাখ ৫২ হাজার ১০৫ টাকা।

জাহাঙ্গীর গত বছরের ১৪ আগস্ট দক্ষিণ কৃষ্ণপুর মৌজার ৬৪ শতাংশ চালা জমিকে সাইল শ্রেণি দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। দলিল নম্বর ১২৯৮১। দাতার নাম এভারেস্ট রোজারিওসহ আরো কয়েকজন। গ্রহীতা হলেন গোলাম মোস্তফা। ফলে ওই দলিলে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে ১৬ লাখ ২২ হাজার ৬১৫ টাকা।

এই পাঁচটি দলিলের দাতা ও গ্রহীতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করে, শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগসাজশ করে। রাজস্ব ফাঁকির তিন ভাগের এক ভাগ টাকা ঘুষ হিসেবে নিয়ে তিনি এসব দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন। শুধু তাঁদের ক্ষেত্রেই নয়, অনেকেই এভাবে তিন ভাগের এক ভাগ টাকা ঘুষ দিয়ে সাভার সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল রেজিস্ট্রি করছেন। হালনাগাদ পরচা ও খাজনা-খারিজের কাগজের সঙ্গে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে উল্লিখিত জমির শ্রেণি মিলিয়ে দেখলেই শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম ২০০৯ সালে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি পেয়েছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। চাকরির নথিপত্রে তিনি যে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন, সেখানে তাঁর জন্ম তারিখ ১৯৬৪ সাল দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে চাকরি নেওয়া ১৯০ জন বিতর্কিত সাবরেজিস্ট্রারের মধ্যে তিনি নানা কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে আরো বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন। সাত বছরের চাকরিজীবনে তিনি আটবার বদলি হয়েছেন। এ কারণে তাঁকে অনেকে ‘বদলি মাস্টার’ হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাভারের একাধিক দলিল লেখক জানান, তাঁর মতো এমন সাবরেজিস্ট্রার এখানে আসেননি। তিনি প্রকাশ্যে ঘুষ আদায় করে থাকেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। তিনি প্রকাশ্যে বলাবলি করেন, সাভারে বদলি হতে তাঁর এক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তাই ঘুষ না খেলে তাঁর খরচের টাকা উঠবে কিভাবে?

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘শুধু আমি কেন, অনেক সাবরেজিস্ট্রারই ঘুষ খান এবং এসব অনৈতিক কাজ করেন। আপনারা লিখে কী করতে পারবেন। আমরা আইজিআর থেকে শুরু করে ডিএস রেজিস্ট্রেশন, এমনকি আইন মন্ত্রণালয়ের অনেককে ম্যানেজ করেই সাবরেজিস্ট্রারি করছি। অনেক সাংবাদিককেও সহযোগিতা করে থাকি। আপনি এসেও চা খেয়ে যেতে পারেন। ’

জেলা রেজিস্ট্রার দীপক কুমার সরকার বলেন, ‘যেকোনো সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে তথ্যবহুল প্রমাণসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তপূর্বক তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সাভারের সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’


মন্তব্য