kalerkantho


এপিঠ-ওপিঠ

জালিয়াতি রোধে অ্যাপস তৈরি করেছেন মনিরুল হাসান

আপেল মাহমুদ   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জালিয়াতি রোধে অ্যাপস তৈরি করেছেন মনিরুল হাসান

দলিল লেখকদের সরবরাহ করা কাগজপত্র দেখে সরল বিশ্বাসে রেজিস্ট্রেশন কর্মকাণ্ড চালাতে হয় সাবরেজিস্ট্রারদের। সেই কাগজ জাল না সঠিক, তা শনাক্ত করার কোনো সুযোগই থাকে না। এ কারণে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় জাল দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যায়। ফলে একজনের জমি অন্যজন বিক্রি করে দেওয়ার সুযোগ পায়। এতে সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়। নিজেদের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়। সরকারি রাজস্ব আদায়ে নামে ধস। দেশের রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো পরচা বই নেই বলে শ্রেণি পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়ে গেছে।

এটা কিভাবে রোধ করা যায় সে চিন্তা অনেক দিন ধরেই সাবরেজিস্ট্রার মনিরুল হাসানের মাথায় ঘুরছিল। এক বছর আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে ঢাকার সূত্রাপুরে বদলি হয়ে আসার পর সেই চিন্তাটা তাঁকে পেয়ে বসে।

চাকরির উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, দেশের প্রত্যেক কর্মকর্তাকেই চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে  দু-একটি ভালো কাজও করা উচিত। সে কথাটি তাঁর মনে বেশ দাগ কাটে। তিনি ভাবতে থাকেন, নিজস্ব অ্যাপস তৈরি করে সেখানে দলিলের আদ্যোপান্ত এন্ট্রি করা সম্ভব কি না? এই ভাবনা থেকে তিনি কাজ শুরু করেন। এবং সফলও হন।

এক বছর ধরে তিনি তাঁর নিজস্ব অ্যাপসে অফিসে রক্ষিত বিভিন্ন সময়ে সম্পাদিত দলিলপত্রের সূচিপত্র তৈরি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সাফকবলা, বায়নানামা, হেবা দানপত্র, আমমোক্তারনামা, বন্ধকী, ব্যাংকঋণ, চুক্তিপত্র, আপস-মীমাংসাসহ আরো অনেক দলিলে উল্লিখিত দাতা-গ্রহীতার নাম-ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর প্রভৃতি। ১ নম্বর সূচিপত্রে এসব তথ্য রাখা হয়েছে। সাবকবলা, বায়না দলিলের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি, পরিমাণ, মৌজাসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সঙ্গে দলিল নিবন্ধনের দিনক্ষণও উল্লেখ রয়েছে। তা সংরক্ষণ করা হয়েছে ২ নম্বর সূচিপত্রে।

ওই অ্যাপসের মাধ্যমে তাঁর অফিসের অধীন যেকোনো ব্যক্তি জমি কেনার আগে তা অন্যত্র বিক্রি হয়েছে কি না সেটা পরীক্ষা করতে পারবেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। কেউ বায়না দলিলের চেয়ে কম দামে জমি রেজিস্ট্রি চাইলে সেটাও জানা যাবে। এমনকি দলিলের পাতা পরিবর্তন কিংবা জমির পরিমাণ ঘষামাজা করা হলে এর রহস্য অ্যাপসে বাটন টিপলেই জানা যাবে।

অদূর ভবিষ্যতে তিনি তাঁর অ্যাপসে উল্লিখিত অফিসের অধীন মৌজাগুলোর জমির মালিকদের হালনাগাদ রেকর্ড-পরচার কপি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন। তখন শুধু সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসেই নয়, জমির মালিকরাও ঘরে বসে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত জানতে পারবেন। এটা সম্ভব হলে রেজিস্ট্রেশন বিভাগে রীতিমতো একটি বিপ্লব ঘটবে বলে একাধিক সাবরেজিস্ট্রার মনে করেন। ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, বিগত দিনে জালিয়াতি, ঘুষ-দুর্নীতি রোধসহ কাজে গতি আনার জন্য রেজিস্ট্রি অফিসগুলোকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকায় তিনটি এবং ঢাকার বাইরে দুটি অফিসে পাইলট প্রকল্পের কাজ বেশ এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কোনো সুফল আসেনি। কিন্তু সাবরেজিস্ট্রার মনিরুল হাসান নিজস্ব উদ্যোগে অ্যাপস তৈরি করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। সেটা সারা দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ছড়িয়ে দিতে পারলে জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ অতি সহজেই সেবা পাবে।

একাধিক সাবরেজিস্ট্রার জানান, উদ্যোগটি সত্যি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এর ফলে রেজিস্ট্রি অফিসের সনাতন কর্মপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে। কেউ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে পারবে না। ’

সূত্রাপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে জানা যায়, সাবরেজিস্ট্রার মনিরুল হাসান ইন্টারনেটযুক্ত সাধারণ একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে সেই অ্যাপটি চালাচ্ছেন। তিনি প্রতিদিনের রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের সব তথ্য প্রতিদিন সেখানে এন্ট্রি করছেন। এ জন্য তিনি কম্পিউটার জানা কর্মচারীদের সহযোগিতা নিচ্ছেন, যাঁরা নিজ কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই কাজটি করছেন। এ জন্য অফিসকে অতিরিক্ত কোনো ব্যয় বহন করতে হচ্ছে না। শুধু নিজস্ব উদ্যোগ এবং সেবামূলক মানসিকতার কারণেই তিনি এই মহতী কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্রাপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত কেরানি মো. গিয়াসউদ্দিন ও মোহরার হুমায়ুন কবির বলেন, সাবরেজিস্ট্রার স্যারের এ উদ্যোগের ফলে তাঁরা নির্বিঘ্নে অফিসের কাজ করতে পারছেন। আগে সব সময় জাল-জালিয়াতি নিয়ে চিন্তা করতে হতো। এখন আর সেটা করতে হচ্ছে না। এর ফলে জালিয়াতি রোধ এবং সঠিক রাজস্ব আদায় ছাড়াও তাঁরা দ্রুত দলিল রেজিস্ট্রির কাজ করতে পারছেন। এটা দেশের অন্যান্য সাবরেজিস্ট্রি অফিসের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।


মন্তব্য