kalerkantho


নিজস্বতা হারাচ্ছে আজিমপুর কলোনি!

রফিকুল ইসলাম   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিজস্বতা হারাচ্ছে আজিমপুর কলোনি!

পঞ্চাশোর্ধ্ব খালেক মিয়া। চাকরি করেন সচিবালয়ে।

২০ বছরেরও বেশি সময় আজিমপুর কলোনিতে পার করেছেন। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, আজিমপুর কলোনি আর আগের মতো নেই। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বেড়েছে মানুষের চাপ। একসময় শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল ছিল এটি। তবে এখন বেড়েছে বহিরাগতদের উত্পাত। কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত টাকার লোভে কক্ষ ভাড়া দিয়ে পরিবেশ নষ্ট করছেন। বেড়েছে বখাটেদের উত্পাতও। কলোনির বাসিন্দারা জানায়, আজিমপুর কলোনির নিজস্বতা এখন আর নেই। কলোনির মধ্যে নেই সম্প্রীতি। বেড়েছে বখাটেদের উত্পাত। মাদকের আস্তানাও রয়েছে এখানে। প্রায় সময় দেখা যায়, কলোনির বাসিন্দাদের সহযোগে বহিরাগতরা মাদক সেবন করে। কোনো কোনো স্থান ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর।

১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত আজিমপুর এস্টেট জনকল্যাণ সমিতি কলোনির উন্নয়নে কাজ করছে। সমিতি সূত্র জানায়, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলের আগেও গোড়াপত্তন আজিমপুর কলোনির। শুরুর দিকে কলোনির পরিধি সীমিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে পরিশীলিত রূপ লাভ করেছে।   তারা জানায়, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে সুবেদার আজিমুসের শাসনামলে (১৬৯৭-১৭০৩) প্রতিষ্ঠিত হয় এই কলোনি। ওই সময় রাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কলোনিতে বসবাস করত। আজিমুসের নামানুসারে নামকরণ হয় আজিমপুর কলোনির। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামল-পরবর্তী সময়ে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে পরিশীলিত রূপ লাভ করে আজিমপুর কলোনি; যদিও প্রথম দিকে হাতে গোনা ভবন ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ভবন সৃষ্টি হয়।

কলোনির বাসিন্দারা জানান, আজিমপুর উত্তর ও দক্ষিণ কলোনিতে বিভক্ত। সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল। একসময় দুই কলোনির মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন ছিল খুবই দৃঢ়। যেকোনো জাতীয় উৎসবে খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। প্রতিটি ভবনের বাসিন্দারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। এখন আর সেটি নেই। কাগজে-কলমে সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ হলেও থাকে ভাড়াটিয়া। নিজেরা কোনোমতে এক-দুটি কক্ষে থেকে অন্য কক্ষগুলো ভাড়া দিচ্ছেন। কেউ কেউ রান্নাঘরকে কক্ষ বানিয়েও ভাড়া দিচ্ছেন।

কলোনিতে বসবাসরত এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কলোনিতে এখন সব ধরনের মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। কখনো কখনো রাস্তার পাশে মাদকের আড্ডাও বসে। রাত-দিন চলে বখাটেদের উত্পাত। কর্মকর্তাদের নামে বাসা বরাদ্দ থাকলেও সেগুলো ভাড়াটিয়াদের সাবলেট দেওয়া হয়। এতে বাইরের লোকজনের সঙ্গে বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে। সাবলেটে একটি কক্ষ ভাড়া দিলেও ভাড়াটিয়া থাকে একাধিক। মানুষের অতিরিক্ত চাপে পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ’

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আজিমপুরের আশপাশে রয়েছে বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ ইত্যাদি) ও সরকারি অফিস। নামিদামি কয়েকটি স্কুল-কলেজও এই এলাকায়। কাজেই অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানে আবাসনের চাপ বেশি। নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে অনেকেই আজিমপুর কলোনির ভরসা করেন। আর বাড়তি কিছু অর্থের আশায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন।

কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, কোনো কোনো স্থান ময়লা-আর্বজনায় পরিপূর্ণ। বড় বড় দুটি পুকুর থাকলেও ময়লা-আবর্জনায় ভরা। একটি পুকুরের চারপাশ ইট দিয়ে বাঁধাই করা হলেও পানি কচুরিপানায় ভর্তি। অন্যটির চারপাশেই রয়েছে ময়লা। প্রতিদিনই কলোনির মধ্যে ও প্রবেশপথে বসে বহিরাগতদের আড্ডা। বখাটে ও বহিরাগতদের বখাটেপনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। মাঝেমধ্যে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটে। এতে নষ্ট হচ্ছে কলোনির পরিবেশ।

আজিমপুর এস্টেট জনকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে একসময় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রতিটি ভবনের মানুষ প্রত্যেককে চিনত। কিন্তু এখন আর সেটি নেই। কলোনি এলাকায় নানা রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। ’


মন্তব্য