kalerkantho

নগরে নারীর জীবন

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নগরে নারীর জীবন

শিল্পী : নাজলী লায়লা মনসুর

নগরজীবনের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষত শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে নারীরা গৃহজীবনের বাইরে আসতে শুরু করে। মূলত বিশের শতকে এসে নাগরিক জীবনে নারীর পরিসর বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশেও ব্যাপক নগরায়ণ ঘটলে নারীর পরিসর অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের নগরজীবনে নারীর কতটুকু মুক্তি ঘটেছে? এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন শারমিনুর নাহার

 

এ বছর বিশ্ব নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বি বোল্ড ফর চেঞ্জ’—পরিবর্তনের জন্য সাহসী হও। কথাটা এভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে—পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য আরো আরো সাহসী হতে হবে। বলা যেতে পারে—চিত্কার করো মেয়ে, তোমার সামর্থ্যকে জাগাও। আদতে স্লোগানটিতে নারীর মেরুদণ্ড শক্ত করার কথাই বলা হয়েছে। তুমি উঠে দাঁড়াও, দৃঢ় হও, নতুন পৃথিবীতে শক্তিশালী করো নিজের অবস্থান।

ইতিহাস বলে, সম্পত্তির সংরক্ষণ ও উত্তরাধিকারের জন্য নারীকে সামাজিক উত্পাদনের ক্ষেত্র থেকে বহিষ্কার করে পরিণত করা হয় গৃহস্থ দাসে। আর তারই ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের আজকের পরিবারগুলো। ফলে এই দাসত্ব থেকে মুক্তি ও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার লড়াই নারীর আজকের নয়।

সমাজকাঠামো যখন কৃষিভিত্তিক উত্পাদনব্যবস্থা থেকে সরে এসে পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রবেশ করল, সেই সময় থেকেই। পুঁজির চলাচল, রকমফেরের সঙ্গে সঙ্গে নারীও শ্রমিক হিসেবে যুক্ত হতে থাকল। সেটি বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপে ব্যাপকভাবে হতে শুরু করে। ঘরের বাইরে নারী নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করতে শিখল। এককথায় বলা যেতে পারে, শিল্প বিপ্লব নারীকে শ্রমিক করে তুলল। পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উন্নতি ঘটল। নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যক্তিত্ববোধ জাগ্রত হলো। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ল। এরই ধারাবাহিকতায় যদি আমরা আমাদের দেশ, বিশেষ করে নগরের নারীর জীবনের ওপর একটু আলোকপাত করি, তাহলে কিছু বিষয় নজরে আসে।

বর্তমানে আমাদের দেশে নারী উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, লিঙ্গবৈষম্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, মাতৃমৃত্যু ইত্যাদিতে সাফল্য এসেছে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে ১৮৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬ নম্বরে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম তাদের লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে (২০১৬) দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সফল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে উল্লেখ করেছে। কর্মসংস্থান, সক্ষমতা ও ব্যবসা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব—এই তিন সূচকে আমাদের নারীরা এগিয়েছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতের ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এককথায় বলতে গেলে এরাই এই মহানগরীর প্রধান শ্রমিক এবং দেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের সূচকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাত্রার সাফল্যের দাবিদার। এমনকি নারীর নাগরিক জীবনের রূপান্তরে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে, তারা হলো গার্মেন্টে কর্মরত নারী। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের অর্থনীতি বেগবান করতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। আর যাদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, সেই শ্রমিকদেরই বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। যা বেতন পায়, তা দিয়ে মৌলিক চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা, তাদের অমানবিক জীবন যাপন করতে হয়। অন্যদিকে অর্থনীতিকে নিম্ন মধ্যম আয়ের সূচকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি বিদেশে কর্মসংস্থানে বাংলাদেশের নারীদের সংখ্যা গত এক দশকে ১০ গুণ বেড়েছে। আর দুই দশক ধরলে এই বৃদ্ধি ৬০ গুণ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৮ হাজার নারী বিদেশে কর্মী হিসেবে গিয়েছিল। আর ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা ১০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৮ হাজারে। এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই ২০ হাজার নারী বিদেশে গেছে, যাদের একটি বড় অংশ শহুরে।

শহরে শিক্ষিত নারীর একটি বড় অংশ কর্মজীবী। ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নিজে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছে বিপুলসংখ্যক নারী। মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের কাজে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বলা চলে, প্রায় সমানে সমান। কিন্তু নারীর এই গতিশীলতাকে বর্তমান সমাজ কি ধারণ করতে পারছে? ঘরের বাইরে এসে অর্থনীতির চাকা শক্তিশালী করলেও তাকে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। এটি শুধু নিম্নবিত্ত নারীর ক্ষেত্রে নয়, মধ্যবিত্ত নারীর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশই কোনো না কোনো সময় নির্যাতিত হয়। সুতরাং ঘরেই নারী নিরাপদ নয়। এর পরে রাস্তাঘাট, বাস, নিজের কর্মস্থল—কোথাও কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ-পরিস্থিতি নিশ্চিত নয়। সর্বত্রই একটি পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের সঙ্গে তাকে লড়াই করে টিকতে হয়।

আবার বিত্তবান নারীর ক্ষেত্রেও নির্যাতন কম নয়। তারা হয়তো গণপরিবহন ব্যবহার করে না, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে নারী স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন—কোনো কিছুই ভোগ করতে পারে না। সব ক্ষেত্রেই একটা কুক্ষিগত মানসিকতার সঙ্গে তাকে লড়াই করতে হয়। শহুরে উচ্চবিত্ত নারীর ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি। পারস্পরিক বোঝাপড়া না থাকা, ইগো সমস্যা, সম্পত্তির সমস্যা, বহুগামিতাসহ নানা কারণে এই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে থাকে। নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুর্বলতার পেছনে কাজ করে সম্পত্তিতে তার অধিকার না থাকা। বিশেষ করে ভূমির অধিকার থেকে নারী ভয়াবহভাবে বঞ্চিত। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ‘নারীর অধিকার ও বঞ্চনা’ শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন, ‘মাত্র ৪ শতাংশ নারীর ভূমির ওপর প্রকৃত মালিকানা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম নারী উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা লাভ করলেও মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ মুসলিম নারীর ভূমির প্রকৃত মালিকানা রয়েছে। ’ মূলত নারী যে বিত্তেরই হোক, অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরতার ফলে প্রকৃতপক্ষে দাসের জীবনই তাকে যাপন করতে হয়। আবার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হতে গেলেও নারীকে প্রথাগত দায়িত্ব পালন থেকে রেহাই দেওয়া হয় না। ফলে স্বনির্ভরশীল হওয়া নারীর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। মূলত নারীর ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধের অগ্রগতি না হওয়ায় তাকে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

নগরে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত—নারীর যে অবস্থাই বলি না কেন, কেউ সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। নগরে নারীদের ক্ষেত্রে প্রধানভাবে সেই চিরায়ত নিরাপত্তা সমস্যা বিরাজমান। নারী ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। এ জন্য দরকার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, এমনকি পারিবারিক উদ্যোগ। চাকরীজীবী নারীরা সারা দিন অফিসে কাজ করলেও ঘরে এসে তাকে সংসারের সবটা সামলাতে হয়। সন্তানের দেখাশোনা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির কাজ পর্যন্ত। দীর্ঘদিন ধরে গৃহস্থালির কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়নের দাবি তোলা হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। শিশুর জন্য অফিসগুলোতে ডে কেয়ারের ব্যবস্থা চালু এখন একটি বড় দাবি। নারীমুক্তির প্রথম শর্ত হলো, পুরো নারী জাতিকে সামাজিক উত্পাদনের মধ্যে নিয়ে আসা। নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তৈরি করা। পাশাপাশি নারী সম্পর্কে মানুষের মনে যে অমূলক ধারণা রয়েছে, তা ক্রমাগত পরিবর্তনের জন্য সমাজের অগ্রগামী মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া পারিবারিক, সামাজিক মানুষ হিসেবে জীবনধারণের দর্শন নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তাকে যথাযথভাবে গড়ে তুলতে হবে। আর নগরে নারীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে আরো এগিয়ে আসতে হবে। সে যেন নারীর অগ্রগতিতে কোনোভাবেই বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তা না হলে আমরা অর্থনৈতিক, সামাজিক—কোনো ক্ষেত্রেই উন্নয়নকে কাজে লাগাতে পারব না।


মন্তব্য