kalerkantho


শ্রমিকদের দুঃখগাথা

এক দিন ছুটি নিলে দুই দিনের বেতন কাটা

ইসরাত জাহান অনন্যা   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এক দিন ছুটি নিলে দুই দিনের বেতন কাটা

ছবি : শেখ হাসান

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের অর্থনীতি বেগবান করতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। চীনের পর বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্ট রপ্তানিকারক দেশ। আর যাদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, সেই শ্রমিকদেরই বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। যা বেতন পায় তা দিয়ে মৌলিক চাহিদা পূরণ তো দূরের কথা অমানবিক জীবন যাপন করতে হয় তাদের। সর্বশেষ ২০১৩ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছিল। অথচ গত তিন বছরে কয়েক দফায় বাড়িভাড়া, গ্যাস বিল, দ্রব্যমূল্যসহ অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ। ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত যাদের বেশির ভাগই নারী। ২০১৫ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে, গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতে গিয়ে ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং ৭৬ শতাংশ নারী শ্রমিকই মনে করে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নেই। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তারা কাজ হারাতে পারে। অন্যদিকে মালিকদের পক্ষ থেকে নতুন ন্যূনতম মজুরি শতভাগ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রায় ৪০ শতাংশ নারী শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পায় না।

নারী শ্রমিকদের যাপিত জীবনের খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে তাদের নানামাত্রিক করুণ চিত্র।  

রামপুরার গার্মেন্ট শ্রমিক ফরিদার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ৯ বছর যাবৎ গার্মেন্টে কাজ করি। ওভারটাইমসহ মোটামুটি ১২ হাজার টাকার মতো আসে। কিন্তু এই টাকায় কী হয়? বাসাভাড়া, খাওনে যায় ছয়-সাত হাজার টাকা, নিজের হাতখরচ আছে, বাড়িতে ছোট ভাই আর মা-বাবার জন্য পাঠাই চার হাজার টাকা। এরপর মাস শেষে শূন্য। কী করতাম, উপায় নাই। সকালে ঢুকি, রাইতে বারাই। ঠিকমতন দিনের আলোটাও ধরেন পাই না। ’ গাবতলী বেড়িবাঁধসংলগ্ন ঢাকা উদ্যানের গার্মেন্ট শ্রমিক ইয়াসমিন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘হেলপার হিসেবে কাজ করি আমি। মাসে বেতন পাই পাঁচ হাজার টাকা, সঙ্গে ওভারটাইমও কিছু আসে। কিন্তু তাতে চলে না। আর অসুখবিসুখ বা কোনো কারণে এক দিনের ছুটি নিলে দুই দিনের বেতন কাটা পড়ে। বুড়া মা-বাবা  আর ছোট তিন ভাইরে নিয়া টানাটানি লেগেই থাকে। কোনো উপায় না পেয়ে বাবা আচার বিক্রি করা ধরছে। আর মা পরের বাসায় কাজ কইরা যা পায় তাতে কোনো রকম চইলা যায়। কী আর করমু, লেহাপড়া জানি না, গার্মেন্ট ছাড়া তো আমাগো কোনো উপায়ও নাই। ’ ইয়াসমিন আরো জানান, তিনি কোনো বোনাস পান না। কাজ শেষে অফিস থেকে হেঁটে বাসায় ফেরেন। ইয়াসমিনের স্বপ্ন, সবচেয়ে ছোট ভাই তমিজকে স্কুলে পড়াবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ছোট একটি টিনের খুপরি ঘরেই আটকে থাকে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক রুমের মধ্যেই থাকেন সপরিবারে। ঘরে একটিমাত্র খাট, তিন ভাই ও বাবা ঘুমান খাটে আর মা-মেয়ে মিলে থাকেন মেঝেতে।

কথা হয় মোহাম্মদপুরের কাটাসুরের ১৫-১৬ বছরের রিনার সঙ্গে। সে কাজ করে ইত্যাদির মোড়ের একটি গার্মেন্টে। আগে গ্রামেই থাকত রিনা। ভালো থাকার আশায় ঢাকায় আসা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। সংসারের অভাবে স্কুল ছাড়ে। পড়াশোনার কথা জানতে চাইলে রিনা জানায়, ‘দিদিমণি কইত আমার নাকি মাথা ভালা। আমি নাকি অঙ্ক ভালা বুঝি। তবু বাপে আর পড়াইল না। অভাবের সংসার হলে যা হয়। ’ সেই ভালো মাথার রিনার হিসাব-নিকাশ আজ চার হাজার ৩০০ টাকায় সীমাবদ্ধ! রিনা সকালে না খেয়ে কাজে যায়। দুপুরে বাসায় এসে ভর্তা ভাজি দিয়ে খেয়ে ফিরে যায় আবার কাজে। কোনো ছুটি নিতে পারে না। কাজের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে রিনা বলে, ‘অফিসের অবস্থা নিয়া আর কী কমু! কোনো ছুটিছাটা নিতে পারি না। অসুখের কারণে কামাই হইলে বেতন কাটা পড়ে। মেয়েদের বাথরুম ব্যবস্থাও খুব খারাপ। আবার কিছু কিছু পুরুষ শ্রমিক আছে যারা কুনজরে তাকায়। কী করমু কন, ভালো পরিবেশের চাকরি কই পামু, পেটের দায়ে সব কিছু মাইনা নিয়া চলি। ’

কথা হয় গার্মেন্ট শ্রমিক শিরিন, সুমি আর ময়নার সঙ্গে। তাঁরা তিনজন এক রুমে থাকেন। ভাড়া গুনতে হয় তিন হাজার ৪০০ টাকা। তাঁরা তিনজনই কাজ করেন ঢাকা উদ্যানের একটি গার্মেন্টে। শিরিনের বেতন সাত হাজার টাকা, সুমি পান পাঁচ হাজার আর ময়না চার হাজার ২০০ টাকা। ময়নার বেতন কম বলে ভাড়া বাবদ তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় এক হাজার টাকা। ময়না বলেন, ‘দুই বছর আগে বাসায় কাজ নিয়া শহরে আইছিলাম। বাড়ির মালিকে খারাপ প্রস্তাব দিত, ম্যাডামে অনেক অত্যাচার করতো। বেতন দিত না, বাড়িতে টাকা পাঠাইতে পারতাম না। হেই জইন্যে ওইখান থেকে পালাইয়া গার্মেন্টে ঢুকছি। ’ শিরিনের পরিবারের সবাই গ্রামে থাকে। তাঁরা দুই ভাই দুই বোন। বাবা নেই, বড় ভাই আলাদা হয়ে গেছেন, মা আর ছোট এক ভাই এক বোনের খরচ তাঁকেই চালাতে হয়। অন্যদিকে সুমি বলেন, ‘আমার কেউ নাই, সব গেছেগিয়া। মা মারা গেছে তিন বছর আগে। বাবার কোনো খবর জানি না। ছোটবেলায় শুনছি, বাবা সত্মারে নিয়া চইলা গেছে। ’ বিয়ে হয়েছিল তাঁর। একটি ছেলে আছে। স্বামীর আরো দুইটা বউ আছে। ছেলেকে গ্রামের মাদরাসায় দিয়েছেন। প্রতি মাসে ছেলের মাদরাসায় দুই হাজার টাকা পাঠাতে হয়। এক বছরের বেশি নিজের ছেলেকে দেখেননি সুমি। ছুটি নিতে পারেন না বেতন কাটার ভয়ে। বেতন কাটলে যে টাকা কমে যাবে। তাই প্রতিদিন ফোনেই কথা হয় মা-ছেলের। আর ১৪-১৫ বছরের বগুড়ার মেয়ে ময়না দুই মাস হলো কাজে ঢুকছে। বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। মা মিরপুরে এক বাসায় কাজ করেন। দুই মাস আগে ময়নাও মায়ের সঙ্গে সেখানেই থাকত। ওই বাড়ির সবাই খুব আদর করত। কিন্তু ময়নার ভাষায়, ‘মায় কইল, এহানে থাকলে ভবিষ্যৎ অইবে না। কাজেকামে ঢুকলে ট্যাহা জমাইতে পারমু। ’

জাতীয় রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয় গার্মেন্ট শ্রমিকরা। অথচ তারা মালিকের কাছে যেমন শোষিত, সরকারের কাছে তেমনি অবহেলিত। ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণের জন্য আন্দোলনও হয়েছে। তাতেও কোনো কাজ হয়নি।


মন্তব্য