kalerkantho


গণপরিবহন কতটা নারীবান্ধব?

‘আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ নয়। ফলে লোকাল বাসে প্রায়ই নারীকে অমর্যাদার শিকার হতে হয়’

শারমিনুর নাহার   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণপরিবহন কতটা নারীবান্ধব?

কেস স্টাডি-১ : রাজধানীর মগবাজার থেকে প্রতিদিন বারিধারা অফিস করেন তুলি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি।

মগবাজার মোড় থেকে বাসে উঠতে নিত্য ধকল পোহাতে হয় তাঁকে। ‘লেডিস সিট নাই’ বাক্যটি শুনতে শুনতে আধাঘণ্টা পেরিয়ে যায়। কোনো বাসের কাছেই যেতে পারেন না, ওঠা তো দূরের ব্যাপার। একসময় রেগে গিয়ে ঠেলাঠেলি করেই একটি বাসে উঠে পড়েন। তিনি বলেন, ‘কিচ্ছু করার নেই, হাতে আর সময় নেই। এই চিত্র এক বা দুই দিনের নয়, সপ্তাহের ছয় দিনই পোহাতে হয়। ’ সারা দিনের কাজের মধ্যে বাসে উঠতে পারাই তাঁর কাছে একমাত্র সাফল্য বলে মনে হয়। কথা বলে আরো জানা গেল, বাসে নারীদের সিট নেই, সংরক্ষিত আসন নেই, নানা ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়; এসবের চেয়ে রাজধানীতে পর্যাপ্ত বাস নেই, এই সংকটকেই প্রধান সংকট বলে মনে করেন তিনি।

কেস স্টাডি-২ : মিরপুর ১০ নম্বর থেকে সুহাকে প্রতিদিন অফিস করতে হয় বনানীতে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার পাস—এখন একটি ফার্মে কাজ করেন তিনি। এটা তাঁকে হতবাক করে যে মিরপুর থেকে গুলশান-বনানীতে আসার একমাত্র ভালো বাস আছে একটি। সেটির জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত। তুলি বলেন, ‘লোকাল বাসের ভাড়ার ডাবল দিয়ে আসি; কিন্তু অনেক সময়ই তারা যে ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলে তা রক্ষা করতে পারে না। অতিরিক্ত যাত্রী তোলে, আর আচরণ সব সময় সেই লোকাল বাসের মতো। ’

চলতি পথে আমাদের নারীরা এখনো অল্প দূরত্বে বাসে ওঠে না। অনেক সময় হেঁটে বা প্রয়োজনে রিকশা ব্যবহার করে। শুধু যারা বেশি দূরত্বে অফিস করে তাদেরই নিয়মিত বাসে উঠতে দেখা যায়। প্রায় দেড় কোটি নাগরিকের এই শহরে প্রায় অর্ধেক নারী, যারা নানা সমস্যার কারণে গণপরিবহন ব্যবহার করে না। অনেকেই বলে, ইচ্ছা করে কে নিজেকে সমস্যায় ফেলে। সত্যিই বাসে ওঠা যেন এখনো এই শহরে অনেক নারীর কাছে ইচ্ছা করে নিজেকে সমস্যায় ফেলা। তারা উত্পাদনশীল কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পুরুষের সমান দাবিদার। কিন্তু সেই নারীর জন্য গণপরিবহন কতটা স্বস্তিদায়ক, কতটা মর্যাদার?

এ প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সহসভাপতি মোশরেফা মিশু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ নয়। ফলে লোকাল বাসে প্রায়ই নারীকে অমর্যাদার শিকার হতে হয়। বাসে উঠলে কন্ডাক্টরদের বাজে আচরণ, নামার সময় তাড়াহুড়া করা, গায়ে হাত দেওয়া, ওড়না টানা ইত্যাদি নানা ঘটনা ঘটে। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আগে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক লড়াই চালাতে হবে। এটা অবশ্যই দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। আমাদের সরকারপ্রধান, স্পিকার, বিরোধী নেতা সবাই নারী হলেও নারী-পুরুষের মর্যাদাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে। গণপরিবহনে নারীর নানা হয়রানি, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ পরিবহন মালিকরা ব্যবসায়িক দৃষ্টিতেই দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। এখন নারীরা নানাভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করছে। কিছু নারী ওয়েবপেজে তাদের ব্যক্তিগত নানা সমস্যা লিখে থাকে। তাই বাসে নিজেদের হয়রানি, নির্যাতন এগুলোর বিরুদ্ধে যখন কোনো নারী অভিযোগ করে তখন অবশ্যই প্রশাসনের উচিত তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। কয়েকটি অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে আমার মনে হয় অন্যরাও সাবধান হয়ে যাবে। মনোভাবের পরিবর্তন আসবে।

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘একটা কমপ্লেইন বক্স চালু করতে হবে। কোনো মেয়েকে যদি বাসে উঠতে না দেয় অথবা তিনি যদি হ্যারাসমেন্টের শিকার হন, তাহলে তিনি যেন কমপ্লেইন করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই গাড়ির লাইসেন্স বাতিল করা কিংবা যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। বাসের কন্ডাক্টর, হেলপার, ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ’

এ প্রসঙ্গে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নারী নেতা জলি তালুকদার বলেন, ‘বাসে সাধারণত পুরুষের যে অ্যাপ্রোচ থাকে সেটাই নারীবান্ধব নয়। সে হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দেখায়, এমন নয়। অনেক সময় না বুঝেও করে, কারণ এটা সে বহন করে আসছে। নারীদের ক্ষেত্রে তার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, বিশেষ করে মানসিকতা, সে ব্যাপারে পুরুষদের আরো সচেতন হতে হবে। তবে পাশাপাশি এটাও বলব যে এখন এই মনোভাব অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। হয়তো পাঁচ বছর আগেও নারীদের সিটে পুরুষরা বসত, বাসে উঠলেই মেয়েদের সংরক্ষিত সিটে বসার জন্য গলা চড়িয়ে কথা বলতে হতো, এখন এই প্রবণতা কমে গেছে। ধীরে ধীরে আরো হবে। তবে এখন নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি গণপরিবহন ব্যবহার করছে। তাই নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য যে সংরক্ষিত ৯টি আসন তা আরো বাড়ানো জরুরি বলে মনে করি। আর পরিবহন মালিক সমিতির জোরদার তদারকি করা উচিত, সব বাসে সংরক্ষিত আসনের বিষয়টি মানা হচ্ছে কি না। বাসের সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন।

সরকার এর আগে নারীদের জন্য পৃথক বাসের পরিকল্পনা করেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিআরটিসির বাসও নামানো হয়েছিল। এখনো সম্ভবত অল্প কিছু বাস চলাচল করে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আবার বিআরটিসির বাসের ক্ষেত্রে প্রায়ই অভিযোগ আসে, তারা খুব ধীরে চলে। ফলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু সেই বাড়তি প্রবণতাকে সামাল দেওয়ার জন্য নেই পর্যাপ্ত বাস। আবার সংরক্ষিত যে ৯টি আসন বাসে আছে তাও রক্ষা করা হয় না। ফলে নারীরা বাসে উঠলেও জায়গা পায় না। দাঁড়িয়ে অন্যের সঙ্গে হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি আর যৌন হয়রানির সমস্যা তো আছেই। এসবের জন্য দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, পাশাপাশি জরুরি হলো ঢাকা শহরে জনসংখ্যা অনুপাতে গণপরিবহন বাড়ানো। নারীদের জন্য আরো বিশেষ সার্ভিস চালু করা উচিত। বাসগুলোয় সংরক্ষিত আসনও বাড়ানো প্রয়োজন। ’


মন্তব্য