kalerkantho


নগরজীবন

ঢাকার ভালো-মন্দ বুঝি না—রোজগার করি, যা জোটে তাই খাই

রুখসানা বেগম, ভ্রাম্যমাণ ফুল বিক্রেতা, ঢাবি টিএসসি চত্বর

ফাহিম রেজা শোভন   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকার ভালো-মন্দ বুঝি না—রোজগার করি, যা জোটে তাই খাই

‘ভাইয়া, একটা ফুল নেন...একটা ফুল নেন...গোলাপ আছে, মুকুট আছে, নেন না ভাইয়া। ’ আট বছর বয়সী একটি মেয়ের করুণ কণ্ঠস্বর আকর্ষণ করল।

সে ফুল বিক্রি করছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শামসুন্নাহার হলের সামনে। করুণ এই কণ্ঠস্বর শুনে যে কারো দৃষ্টি আকর্ষিত হবে। তাকে কে ফুল বিক্রি করতে বলছে জিজ্ঞাসা করায় সে তার মায়ের কথা বলে। তার মাকে মিলল টিএসসির মিলন চত্বরে। নাম তাঁর রুখসানা বেগম (৪২)। কথা বলে জানা গেল, বরিশালের শিবপুরে তাঁর গ্রামের বাড়ি। তিন ছেলে ও চার মেয়ের জননী রুখসানা। নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাপে ঠেলাগাড়ি চালাইতো, মাত্র ১২ বছর বয়সে এক ট্রাকচালকের সঙ্গে বিয়া দিয়া দেয়। হার্টের সমস্যার কারণে অহন আর গাড়ি চালাইতে পারে না। বাধ্য হইয়া নিজেরেই পথে নামতে হইছে। কী করমু, পেট তো চালাইতে হইব। আইজ ছয় বছর ধইরা ফুল বিক্রি করি। আগে বাসাবাড়িতে কাজ করতাম। ’  রুখসানা সংসারজীবনের ৩০ বছর পার করে দিয়েছেন অসুস্থ স্বামীর সঙ্গে। অনেক কষ্ট করে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দুই মাইয়ারে কত কষ্ট কইরা বিয়া দিছি, একটু ফিরাও দেখে না। কিন্তু মায়ের জান তো, খালি কান্দে। এই যে এখনো তিন পোলা আর দুই মাইয়া আছে। আমি তো আর চাইলেই ওগো ফালাই যাইতে পারি না। ’ গ্রামে ফিরে যান না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রুখসানা বলেন, ‘অনেক বছর ধইরা ঢাকায় আছি। গ্রামে গিয়া কী করুম? ঢাকায় থাকলে তো কিছু একটা কইরা খাওন যায়, দেশগ্রামে তো কাম নাই। দুই দিন কাম পাইলে তিন দিন বসা থাকতে হয়। আর মাইয়া মানুষের জইন্যে তো আরো বিপদ!’

তিন ছেলে, দুই মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে কামরাঙ্গীর চরে থাকেন রুখসানা। প্রতিদিন ভোরে উঠেই চলে আসেন শাহবাগে। ফুলের নতুন চালান এলে নতুন ফুল কেনেন নিজের ব্যবসার জন্য। চালান না এলে পুরনো ফুল নিয়েই দোকানের পসরা সাজিয়ে বসেন মিলন চত্বরে। নানা বয়সের মানুষ আসে তাঁর কাছে, তবে শিক্ষার্থীরাই বেশি। ফেব্রুয়ারি মাসে বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় বিক্রি বেশি হয় বলে জানান তিনি। রুখসানা বলেন, ‘এই যে ধরেন ফাল্গুনের দিন, ভালোবাসা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি—এই দিনগুলানে বিক্রি হয় বেশি। তা ছাড়া পহেলা বৈশাখেও হয়। ’ ঢাকা কেমন লাগে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘গরিবের ঢাকা আর বড় লোকের ঢাকা—এক গো বাবা। আমাগো লাত্তি-গুতার জীবন। ঢাকার ভালো-মন্দ বুঝি না—রোজগার করি, যা জোটে তাই খাই। ’

কোনো কোনো দিন খরচের পরিমাণ বাদ দিয়ে তাঁর আয় থাকে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। আবার বিশেষ দিনগুলোয় ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে টানাপড়েন লেগেই থাকে। একার আয়ে না পারেন সন্তানদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার জোটাতে, না পারেন কোলের সন্তানটির জন্য দুধ জোটাতে। সকালে রান্না করে আনা খাবার দুপুরে রাস্তায় ধুলাবালু ও পাশে ময়লা রেখেই সন্তানদের নিয়ে খেয়ে নেন। ভালো পোশাক তো দূরে থাক, ঈদেও একটা নতুন জামা কিনে দিতে পারেন না সন্তানদের। রুখসানা বলেন, ‘বাবারে, সেই সকালে খাবার রাইন্ধা লইয়া আসি। কোনো মতে চলে সারা দিন। অসুস্থ স্বামীর জন্য আবার রাইতে গিয়া রান্না করন লাগে। আর জামাকাপড় তো মাইনসে ভালোবাইসা যা দেয় পোলাপাইন তাই পরে। ঘর ভাড়া, পেটের ভাত জোগাইতেই কষ্ট হয়, আবার নতুন জামা!’

ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারেন না। বই-খাতা কিনে দিলেও জীবিকার তাগিদে তাদের সঙ্গেই রাখতে হয়। রুখসানা ফুল দিয়ে মালা গাঁথেন, মুকুট বানান। আর সন্তানরা ফুলার রোড, হাকিম চত্বর, রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হলের সামনে গিয়ে ফেরি করে সেগুলো বিক্রি করে। বাচ্চা কোলে নিয়ে ঝুঁকির মধ্যেই ব্যবসা চালান রুখসানা। মিলন চত্বরে স্থায়ীভাবে বসতে পারেন না। মাঝেমধ্যেই পুলিশ এসে উঠিয়ে দেয়। কোনো কোনো দিন সন্তানদের নিয়ে টিএসসিতেই রাত কাটিয়ে দেন রুখসানা। সেদিন স্বামীর দেখভাল করার আর কেউ থাকে না।


মন্তব্য