kalerkantho

কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীর প্রতিবন্ধকতা

তবু কেউ থেমে নেই

মারুফা মিতু   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তবু কেউ থেমে নেই

ছবি : জহির হোসেন খান

হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা কিংবা নামা। মাঝেমধ্যে হলের সবুজে ঘেরা বিশাল মাঠটাতে আরো দু-একজনের হাতে হাত রেখে বিকেলের মিষ্টি রোদে হাঁটা।

নিজের মনের মতো করে এমনই একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে থাকতেন। নাম তাঁর জাহানারা বেগম। চোখে দৃষ্টি ছিল না। কিন্তু সেই সাদা হয়ে যাওয়া চোখে ছিল রংধনুর মতো স্বপ্ন। একদিন তিনি বড় সাংবাদিক হবেন। দাপিয়ে বেড়াবেন দেশের সাংবাদিকতার প্রতিটি পথ। বছর দশেক পর এই প্রতিবেদকের মনে পড়ে যায় আবাসিক হলে নিজের পাশের কক্ষে থাকা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েটির কথা, চোখ-মনজুড়ে যাঁর নিজেকে নিয়ে স্বপ্নের শেষ ছিল না। পরিচিত কয়েকজন মারফত খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, স্বপ্ন দেখা সেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েটি তাঁর স্বপ্নপূরণ তো দূরের কথা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে প্রথম সারির ছাত্রী হয়েও নিজের পরিচয়ে ‘কর্মকর্তা’ পদবিও বসাতে পারেননি। কোনো রকম টাইপরাইটার হয়ে কর্মচারীর জীবনই বেছে নিতে হয়েছে তাঁকে। এমন জাহানারার অভাব নেই আমাদের দেশে। রাজধানীতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী, যারা নিজের বা মা-বাবার স্বপ্নের কারণে পড়াশোনাটা চালিয়ে যায়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থান শূন্য।

সুমাইয়া সুলতানা। আরেকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণী। জন্মগত প্রতিবন্ধী নন। দুই বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান। এসএসএসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। এসএসসি পাসের পর বদরুন্নেসা কলেজে ভর্তি নেয়নি তত্কালীন কর্তৃপক্ষ। পরে ভাইস প্রিন্সিপাল ভর্তি নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ইংরেজিতে এমএ পাস করেছেন। তিনি স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে অফিসের যাবতীয় কাজ করতে সক্ষম। বর্তমানে ‘ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিস-অ্যাবল্ড পিপলস অর্গানাইজেশনে (ন্যাডপো) সমন্বয়কারী হিসেবে কর্মরত। এর আগে ভোকেশনাল ট্রেনিং অব দ্য ব্লাইন্ড (ভিটিসিবি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থায় কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির এক মাস পর জাপান থেকে কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা পেলে কর্মক্ষেত্রে সহজেই এগিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুবই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চেয়ে তাদের কর্মক্ষেত্রের অভাব। এমনকি শত শত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণী নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পরও ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। তাঁদের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবু আমরা কেউ থেমে নেই। নানা প্রতিবন্ধকতা উতরেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয় না। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আইসিটিসহ যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলে চ্যালেঞ্জিং পেশায় এগিয়ে আসতে পারবে। কম্পিউটার অপারেটর, ট্রেইনার, শিক্ষক, গ্রাফিক ডিজাইনার, ফ্রন্ট ডেস্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট, হিসাবরক্ষকসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক পদে চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তসলিমা হোসেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রচেষ্টা এবং প্রিয়জনদের উৎসাহে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস অনার্স (সমাজকল্যাণ) পাস করে প্রথমে প্রতিবন্ধী কল্যাণ সোসাইটি (পিকেএস) নামক এনজিওতে চাকরি নেন। পরে তিনি চিন্তা করলেন, প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনে কাজ করাকে প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন বলা সাজে না। সে জন্য নিজ উদ্যোগে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে চাকরি পেয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণী প্রবেশগম্যতার অভাবে চাকরি পাওয়ার পরও কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারে না বলে বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মুক্ত চলাচলের জন্য প্রবেশগম্যতা দরকার।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা থাকার পরও চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। অথচ একজন প্রতিবন্ধী নারীকে শত বাধা অতিক্রম করে লেখাপড়া শিখতে হয়। প্রতিবন্ধীদের যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে সম্মানজনক পেশায় কাজ করার সুযোগ দিলে অন্য পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে এখন সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ নিতে হবে, যে উদ্যোগে থাকবে মানবিকতার ছোঁয়া, ছায়া। সেই ছায়ায় নিজেকে আরো যোগ্যতর প্রমাণ করবে আমাদের প্রতিবন্ধী নারীরা।


মন্তব্য