kalerkantho


মেয়র সমীপে

প্রভাবশালীদের দখলে শিশু পার্কটি এখন বিপণিবিতান

ঢাকা ৩৬০০ প্রতিবেদক   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



প্রভাবশালীদের দখলে শিশু পার্কটি এখন বিপণিবিতান

বোঝারই জো নেই যে একসময় এখানে একটি শিশু পার্ক ছিল!

তিলোত্তমা নগরী ঢাকার যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কংক্রিটের উঁচু উঁচু ভবন, রিকশা, বাস, কার, ট্রাক আর জনস্রোতের রাজত্ব চারদিকে। দক্ষযজ্ঞের এই শহরে সবারই যেন নাভিশ্বাস অবস্থা। নিঃশ্বাস ফেলার মতো যৎসামান্য উন্মুক্ত পরিসরটুকুও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে মাত্র ৫১টি পার্ক-মাঠ টিকে আছে। দুই দশক আগেও অসংখ্য খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও পার্ক ছিল। গত এক দশকে বিলীন হয়েছে রাজধানীর ৯টি শিশু পার্ক। শিশুদের প্রাণকেন্দ্রগুলো দখল করে গড়ে উঠছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া পার্কের সেই তালিকায় যোগ হয়েছে লক্ষ্মীবাজারের বিচারপতি শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের উত্তর মাথায় অবস্থিত একসময়ের শিশু পার্কটিও। সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। সংবাদপত্রের পাতায় একাধিকবার শিরোনাম হয়েছে।

কিন্তু শিশু পার্কটি উদ্ধার হয়নি। উল্টো এর পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথমে পার্কের একাংশ দখল করে সেখানে দোকানপাট তোলা হয়। সামান্য অংশে পার্কের কিছু খেলনা রাখা ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে সেটাও হাওয়া হয়ে যায়। সেখানে যে একটি শিশু পার্ক ছিল, সেটা এখন আর কেউ বলতে পারে না। আজ সেখানে গড়ে উঠেছে মার্কেট। খেলাধুলার পরিবর্তে চলে পণ্যের দরদাম।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিশু পার্কটিতে ছোট ছোট ৩০টি দোকানঘর ছাড়াও একটি কাঁচাবাজার গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সুভাষ বোস এভিনিউয়ের গৃহবধূ আফছানা বেগম বলেন, ‘রাতারাতি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হাতের ইশারায় একটি শিশু পার্ক নিমেষেই মার্কেটে পরিণত হয়ে গেল। কেউ এর প্রতিবাদ পর্যন্ত করল না। ক্ষমতাসীন দলের পাতিনেতাদের ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। মূলত স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা এস কে নূর মোহাম্মদ বিষুর নেতৃত্বেই শিশু পার্কটি পরিণত হয়েছে বিপণিবিতানে। ’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ৭৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস কে নূর মোহাম্মদ বিষু বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে লিজ নিয়েই তিনি সেখানে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। কিন্তু একটি শিশু পার্ক কেন মার্কেটের নামে লিজ নেওয়া হলো সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিশু পার্ক হলেও সেখানে অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করা হতো। লিজের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুদিন আগেও শিশু পার্কের মধ্যে শিশুদের খেলাধুলার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ছিল। সুভাষ বোস এভিনিউ, পাতলা খান লেন, স্যার কে জি গুপ্ত লেন ও শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাসিন্দারা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে সেখানে বেড়াতে যেতেন। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগ নেতা বিষু প্রথমে সেখানে অবৈধভাবে একটি ফাস্ট ফুডের দোকান গড়ে তোলেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দোকানটি উচ্ছেদ করে দেওয়া হলে কিছুদিন তিনি চুপচাপ থাকেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেখানে পাকাপোক্ত করে তাঁর নেতৃত্বে একটি মার্কেট ও একটি কাঁচাবাজার নির্মাণ করেন। এরপর প্রতিটি দোকান তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার সেলামিতে বিক্রি করা হয়। এসব দোকান থেকে প্রায় কোটি টাকা নেতারা হাতিয়ে নেন। দোকানের পজেশন মালিক গোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘একটি দোকান পাঁচ লাখ টাকায় কিনেছি। এখন তাদের মাসে মাসে ভাড়া দিই। তা থেকে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি শাখায় একটি ভাগ যায়। ’

ভাড়াটিয়া মালিকদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই টাকার একটি অংশ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে গেছে। সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাও তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাগ পায়। এলাকাবাসী জানায়, নেতারা শুধু দোকান বিক্রি করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁরা এক দোকান একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ জন্য দোকান দখল নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

এলাকাবাসী আরো জানায়, স্থানীয় এমপি মিজানুর রহমান দিপুর নাম ভাঙিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা শিশু পার্কটি দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন, যার ফলে কেউ এর প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। তারা মনে করে, এমপির অগোচরেই তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতারা শিশু পার্ক দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা জানান, শিশু পার্ক কাউকে বরাদ্দ বা লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে শিশু পার্কের জমিতে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। দখলদারচক্র মিথ্যা তথ্য দিয়ে পার পেতে চাইছে। এলাকাবাসীর কাছ থেকে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানান। যেকোনো সময় এই অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হবে তিনি জানান।


মন্তব্য