kalerkantho


পরিত্যক্ত আব্বাসউদ্দীন চত্বর

ঢাকা ৩৬০০ প্রতিবেদক   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পরিত্যক্ত আব্বাসউদ্দীন চত্বর

আব্বাসউদ্দীন চত্বরটি এখন রয়েছে নামমাত্র। গরুর গাড়ির চাকায় ঘুণ ধরেছে। ছিঁড়ে গেছে একতারার তার

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পুরানা পল্টন মোড়ে ইহুদি ক্লাবের সামনের জায়গাটি আব্বাসউদ্দীন চত্বর। ইহুদি ক্লাবের পেছনেই হিরামন মঞ্জিল, যা শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের বাড়ি হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। এই হিরামন মঞ্জিলের আড়ালে ইহুদি ক্লাবের পরিচিতিটাও গৌণ হয়ে গেছে নগরবাসীর কাছে। ব্রিটিশ আমলে দোতলা ক্লাবটিতে ঢাকায় বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায় আড্ডা দিত। এই ক্লাবের ঠিক সামনের অংশটি আব্বাসউদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) ‘আব্বাসউদ্দীন চত্বর’ ঘোষণা দেয় ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। সেখানকার রাস্তার আইল্যান্ডে গরুর গাড়ির চাকা ও একতারার সমন্বয়ে চত্বরটি সাজানো হয়। ঢাকার তত্কালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা চত্বরটি উদ্বোধন করেছিলেন। এমনকি মুক্তাঙ্গনের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তাটিও ডিসিসি হিরামন মঞ্জিলের সুবিধার জন্য তৈরি করে দিয়েছিল।

এখন চত্বরটি রয়েছে নামমাত্র। গরুর গাড়ির চাকায় ঘুণ ধরেছে। ছিঁড়ে গেছে একতারার তার।

চত্বরটি সব সময় বেওয়ারিশদের দখলে থাকে। নেশাখোরদের আড্ডা জমে সেখানে। তা দেখভাল করার যেন কেউ নেই। সিটি করপোরেশন চত্বরটি নির্মাণ করেই যেন সব দায়িত্ব শেষ করেছে। একসময় সেখানকার হিরামন মঞ্জিলে আব্বাসউদ্দীনের ঔরসজাতরা বসবাস করতেন। কিন্তু অনেক দিন হলো সেখানে তাঁরা বসবাস করেন না। হিরামন মঞ্জিলটি বেচে এখন তাঁরা অভিজাত এলাকার বাসিন্দা হয়েছেন।

আব্বাসউদ্দীন ও তাঁর পরিবারের কাছে হিরামন মঞ্জিল নামটি বেশ আদরের ও স্মৃতিকাতর ছিল। ভারতের কোচবিহার শহরে হিরামন মঞ্জিল নামে তাঁদের একটি বাড়ি ছিল। সেখানে একসময় সুরের চারণ ও ভাওয়াইয়া গানের রাজপুত্র আব্বাসউদ্দীন আহমদ সপরিবারে বসবাস করতেন। হিরামন নেসা ছিল আব্বাসউদ্দীনের মায়ের নাম। তিনি বাড়িটির নামকরণ করেছিলেন মায়ের নামে। সেই হিরামন মঞ্জিলে আব্বাসউদ্দীনের জীবনে ঘটে সবচেয়ে আনন্দ ও দুঃখের ঘটনা। আনন্দের ঘটনা হলো, সেখানে ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী বেগম। আর দুঃখের ঘটনা হলো, এই হিরামন মঞ্জিলেই তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে মোস্তফা জামাল টাইফয়েডে মারা যান।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আব্বাসউদ্দীন জন্মস্থান কোচবিহার কিংবা সংগীতের তীর্থস্থান কলকাতা কোনোটিই আপন হিসেবে বেছে নেননি। সোজা চলে আসেন ঢাকায়। নারিন্দা ও পাতলা খান লেনের ভাড়া বাড়িতে কিছুকাল থেকে ১৯৫৪ সালের দিকে পুরানা পল্টনের নিজ আবাসস্থলে উঠে আসেন। প্রায় এক বিঘার প্লটে বাংলো ধাঁচের দোতলা বাড়ির নাম রাখেন মা হিরামন নেসার নামে ‘হিরামন মঞ্জিল’। কোচবিহারে হারানো স্মৃতি যেন তিনি ঢাকায় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। এই বাড়িতেই ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর আব্বাসউদ্দীন আহমদ মারা যান।

৬৮/১ নম্বর পুরানা পল্টনের হিরামন মঞ্জিলে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। কবি জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা, আজিজুর রহমান, কাজী মোতাহার হোসেন, আব্দুল কাদির, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, তালিম হোসেন, আবুল কাসেম, কবিয়াল কানাইলাল শীল, আব্দুল আহাদ, এস ওয়াজেদ আলী, বন্দে আলী মিয়া, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীনসহ অনেক গুণীজ্ঞানীর আড্ডা হতো হিরামন মঞ্জিলে। ঢাকার কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীদের তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল বাড়িটি। বসত গান, আবৃত্তি ও সাহিত্যপাঠের নিয়মিত আসর। এ সম্পর্কে আব্বাসউদ্দীনের ছেলে প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী স্মৃতিচারণা করেন, ‘...সাহিত্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল বরাবর। সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ। প্রায় প্রতি মাসেই সাহিত্যসভা হতো আমাদের বাসায়। সেসব সভায় কবিতাপাঠ হতো, গল্প পড়া হতো, সব শেষে গান-বাজনা ও চা-নাশতা হতো। ’

হিরামন মঞ্জিলের স্মৃতি সম্পর্কে লেখক-সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্র বিবরণ থেকে জানা যায়, ‘হিরামন মঞ্জিলে সাহিত্যসভা তো হতোই, নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ ইত্যাদি পর্ব উপলক্ষেও আয়োজিত হতো সাহিত্যসভা, বসত গানের আসর। আব্বাসউদ্দীন অসুস্থ হয়েছেন, তবু তিনি তাতে শরিক হয়েছেন। ’

কলকাতার খ্যাতনামা কবি ও বিভাব পত্রিকার কর্ণধার সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত তাঁর আত্মজীবনী ‘একবচন বহুবচন’-এ লিখেছেন, ‘হিরামন মঞ্জিলে আব্বাসউদ্দীন বেলা ৮টা-৯টার দিকে গানের রেওয়াজে বসতেন। আমি বাইরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুনতাম। সময় পেলেই যেতাম। ’

এমন অনেক স্মৃতিবিজড়িত হিরামন মঞ্জিল যেকোনো সময় হারিয়ে যেতে পারে। ২০০৪ সালের দিকে বাড়িটি আব্বাসউদ্দীনের ওয়ারিশদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে ইলেক্ট্রা ইন্টারন্যাশনাল কম্পানি। বর্তমানে ওই কম্পানির কর্মচারীরা হিরামন মঞ্জিলে বসবাস করছেন। প্রবেশ ফটকে এখনো শ্বেতপাথরে খোদাই করা আছে হিরামন মঞ্জিল, যা শিল্পী আব্বাসউদ্দীন নিজ হাতে স্থাপন করেছিলেন।

পল্টনের স্থায়ী বাসিন্দা চৌধুরী এমরান হোসেন বলেন, ‘আব্বাসউদ্দীনের বাড়ি পল্টনে আছে, সে জন্য পল্টনবাসী হিসেবে গর্ব অনুভব হতো। কিন্তু সেই বাড়িতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন হয়ে গেলে সে গর্বটা আর থাকবে না। ’ এলাকাবাসী মনে করে, আব্বাসউদ্দীনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রি না করে সেখানে আব্বাসউদ্দীন স্মৃতি জাদুঘর, একাডেমি, পাঠাগার কিংবা সংগীতাঙ্গন গড়ে তোলা যেত। এ ঐতিহাসিক বাড়ির দলিলগ্রহীতা ইলেক্ট্রা ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে পি সরকার জানান, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রকৃত ওয়ারিশদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে হিরামন মঞ্জিল কেনা হয়েছে। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে কোনো তথ্য তাঁদের জানা নেই।

হিরামন মঞ্জিল ও আব্বাসউদ্দীন চত্বর নিয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘হিরামন মঞ্জিল পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিক্রি হয়েছে। অংশীদারদের সম্মতিতেই সেটা করা হয়েছে। এই বাড়ি বিক্রি হওয়ার পর এ ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। আপনি অযথা এ ব্যাপারে কথা বলছেন কেন?’


মন্তব্য