kalerkantho


ঢাকার শেষ আর্মেনীয়

কাজী হাফিজ   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকার শেষ আর্মেনীয়

ঢাকায় আর্মেনীয়দের সবচেয়ে বড় নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘আর্মেনিয়ান চার্চ’ ছবি : মঞ্জুরুল করিম

২০০৩ সালের প্রথম দিকে বিদেশি সংবাদপত্রের একটি খবর চমকে দিয়েছিল সচেতন বাংলাদেশিদের অনেককেই। পত্রিকাটির নাম এজেডজি (AZG)।

তুরস্ক ও জর্জিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ আর্মেনিয়া থেকে প্রকাশিত। তাতে ‘আর্মেনিয়ান ওয়ান্টেড ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিদেশি আরেক সংবাদ সংস্থার খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, মাইকেল জোসেফ মার্টিন (মিকায়েল হোভসেফ মারটিরোসিয়ান) সম্ভবত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী একমাত্র আর্মেনীয়। তিনি সেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত ‘আর্মেনিয়ান চার্চ’ দেখাশোনা করছেন। ওই শহরটিতে আর্মেনীয়দের বসবাস শুরু হয় দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে। কিন্তু বর্তমানে কিছু স্মৃতিচিহ্ন ছাড়া সেখানে তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ঢাকায় আর্মেনীয়দের সবচেয়ে বড় নিদর্শন ঐতিহাসিক চার্চটিও বিলুপ্তির পথে। চার্চটি রক্ষায় মার্টিন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কে দায়িত্ব নেবে চার্চটি রক্ষার?

প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন করা হয়, ‘এমন কোনো আর্মেনীয় কি আছেন, যিনি বাংলাদেশে গিয়ে আমাদের প্রাচীন ও পবিত্র চার্চটিকে রক্ষার দায়িত্ব নেবেন?’

ইন্টারনেটের কল্যাণে ওই সংবাদ এ দেশে যেমন আলোচিত হয়েছিল, তেমনি ধারণা করা যায়, সে দেশের পাহাড়ি জনপদেও প্রায় বিস্মৃত এক ইতিহাস স্মরণ করে অনেকে আবেগাক্রান্ত হয়েছিলেন! সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয়েছিলেন মার্টিন। এজেডজির প্রতিবেদনটিতে অতিরঞ্জিত কিছু বলা হয়নি।

এ দেশে বসবাসকালে জীবনাবসান হয়েছে এমন প্রায় সাড়ে তিন শ আর্মেনীয়র কবর আর ২৩৬ বছরের পুরনো চার্চটিকে আগলে রাখা ছাড়া এ দেশে মার্টিনের আর কোনো কাজ ছিল না। ঢাকায় না হলেও আরমানিটোলায় তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র সত্তরোর্ধ্ব বয়সের আর্মেনীয় পুরুষ। চার্চটি রক্ষার জন্য আর্মেনীয়দের প্রতি আবেদন প্রসঙ্গে তিনি ওই সময় বেশ উত্তেজিতভাবে বলেছিলেন, ‘না, আর্মেনিয়া থেকে কারো আসার প্রয়োজন নেই। আমি এখনো বেঁচে আছি এবং যত দিন বেঁচে থাকব চার্চের জন্যই কাজ করে যাব। আমার বিশ্বাস, এই চার্চ ঈশ্বরের ভবন। আমার মৃত্যুর পর ঈশ্বরই এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন। ’

কিন্তু জোসেফ মার্টিনের সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয় তাঁর স্ত্রী ভেরোনিকা মার্টিনের মৃত্যুর পর। ২০০৫ সালের মে মাসে ৬৬ বছর বয়সে স্ত্রীর মৃত্যুর পর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েন মার্টিন। অবশেষে আমেরিকাপ্রবাসী এক আর্মেনীয় আর্মান আসলিয়েনের হাতে এই চার্চ রক্ষার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে দুই বছর আগে তিনি তাঁর কানাডাপ্রবাসী মেয়েদের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে আর্মান আসলিয়েন চার্চটি রক্ষার দায়িত্ব নিলেও তাঁর অবস্থান অনিয়মিত। আমেরিকা থেকে মাঝেমধ্যে আসেন। কিছুদিন অবস্থান করে আবার ফিরে যান। এ অবস্থায় চার্চটি পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন মূলত শঙ্কর ঘোষ নামের এক বাংলাদেশি। শঙ্কর মার্টিনের নিয়োগকৃত চার্চের কর্মী। তাঁর শ্বশুর হরিপ্রসাদ আগে ওই চার্চে কাজ করতেন। সেই সূত্রে তাঁরও কাজ জুটেছে। স্ত্রী অণিমা ঘোষ, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে শঙ্কর ঘোষের সংসার। ৩২ বছর ধরে চার্চের সীমানার ভেতরেই তাঁদের বসবাস। ঢাকার আর্মেনিয়ান স্ট্রিটের ওই চার্চটিতে গিয়ে দেখা পাওয়া যায় শঙ্কর ঘোষের। তিনি ভেরোনিকা মার্টিনের কবরটি দেখিয়ে বললেন, এটিই সম্ভবত এখানে আর্মেনীয়দের শেষ কবর। চার্চটি ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার আগে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এটা চ্যাপল (ছোট আকারের গির্জা) অবস্থায় ছিল এবং এই চার্চটিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম চার্চ। এপোস্টলিক চার্চ। এপোস্টলিক হচ্ছে যিশু যে ১২ জন শিষ্য বেছে নিয়েছিলেন তাঁদের একজন। তিনি আর্মেনিয়ায়ই প্রথম চার্চটি প্রতিষ্ঠা করেন। ওই চার্চের অনুসারীরা অর্থোডক্স সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিস্টান।

চার্চের গেটের পাশেই দেয়ালের কিছু অংশ ডুবে আছে স্যুয়ারেজ লাইনের ময়লা তরলে। এই নোংরা তরলে ভেতরের কয়েকটি কবরও আংশিক ডুবে আছে। চার্চের জীর্ণ-মলিন অবস্থার পাশাপাশি সাধ্যমতো পরিচর্যার ছাপও রয়েছে। চার্চের প্রাঙ্গণ ও বারান্দাজুড়ে কবরের পর কবর। শ্বেতমর্মর, কষ্টিপাথর, বেলেপাথর ও লোহার পাতে বাঁধানো। কবরগুলোর পরিচিতি বেশির ভাগই আর্মেনীয় ভাষায় লেখা। কিছু কবরে আর্মেনীয় ও ইংরেজি দুই ভাষায়ই লেখা রয়েছে। লেখাগুলো পড়ে জানা যায়, মার্টিনের স্ত্রীর কবরটি ছাড়া অন্য কবরগুলো ১৭৫০ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ১৮৭৩ সালে ২৭ বছর বয়সী এক মেয়ের কবরে লেখা রয়েছে, ‘উইপ নট ফর মি। লেমেন্ট নো মোর। আই অ্যাম নট লস্ট, বাট গন বিফোর’। কয়েকটি কবরের স্মৃতিফলকের ওপরের দিকে শ্বেতপাথরের ডানাওয়ালা দেবশিশু বা দেবকন্যা। চার্চের ভেতরে দেখা যায়, সেখানে রক্ষিত আর্মেনীয় ভাষায় লিখিত বাইবেল। বসার চেয়ারগুলো পরিপাটি করে সাজানো। তবে জানানো হয়, প্রার্থনা অনিয়মিত। কয়েক যুগ ধরে কোনো ফাদার নেই। গত বছর জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন আর্মেনীয় বিশপ এসেছিলেন। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে বিদেশি মেহমান এলে উন্মুক্ত হয় চার্চের দরজা। সেসব মেহমানের মন্তব্য লেখার জন্য একটি পরিদর্শন বইও রয়েছে। চার্চের পাশেই পুরনো একটি একতলা দালান, যেখানে মার্টিন থাকতেন। সেখানে এখন শঙ্কর ঘোষ সপরিবারে বসবাস করছেন।  

কানাডায় চলে যাওয়ার আগে মার্টিনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কয়েক দফা আলাপ হয়। সে সময় তিনি জানান, তাঁর জন্ম মিয়ানমারে। পাটের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। কলকাতার কসিপরি প্রেস হাউসে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। আর্মেনিয়ায় তাঁদের আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল ইয়েরভান শহরে। সেখানে তিনি বহু বছর যাননি। তবে সেখানে তাঁর যাওয়ার ইচ্ছা আছে।

মার্টিন সে সময় বলেছিলেন, ‘একসময় এ দেশে পাটের ব্যবসা আর্মেনীয়রাই নিয়ন্ত্রণ করত। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগেই এ দেশে প্রথম আসেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। শতাব্দীর পর শতাব্দী তাঁরা এ দেশে বাণিজ্যের জন্য তাঁদের যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে তাঁরা এই উপমহাদেশে স্থায়ী হন। ফারসি ভাষায় দক্ষতার কারণে অনেক আর্মেনীয় মোগল আমলে আইনজীবী ও দলিল লেখক হিসেবে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অনেক জায়গা একসময় আর্মেনীয়দের মালিকানায় ছিল। গ্রাম এলাকায়ও তাঁদের জমির মালিকানা ও ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। মসলিন কাপড়, রেশম, লবণ, নীল, চামড়া, পাট—এসব পণ্যের কারবারে একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল তাঁদের। ’

মার্টিন তখন আরো জানান, ইংরেজ শাসনামলের শেষ দিকে আর্মেনীয়রা ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে আর্মেনীয়শূন্য হয়ে পড়ে আরমানিটোলা। ২০০৪ সালের দিকেও ঢাকায় ছিল ৯টি পরিবার। বনানী-গুলশান এলাকায় বসবাস করতেন তাঁরা। একজন গার্মেন্ট ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ঢাকায় আগে আর্মেনীয় জনসংখ্যা কেমন ছিল—এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে জানা যায়, ১৮৩৮ সালে ঢাকায় ৪০টি আর্মেনীয় ও ৩১২টি গ্রিক পরিবার ছিল। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে আর্মেনীয়দের অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বাংলায় তাঁরা তাঁদের সঞ্চিত অর্থ-সম্পদসহ মধ্য এশিয়ার ইরানে ফিরে যেতে থাকেন। অনেকে পাড়ি জমান ইউরোপে। বাংলাপিডিয়ায় চার্চটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৮৩৭ সালে ঢাকার আর্মেনীয়রা চার্চটির পশ্চিম পাশে একটি ক্লক টাওয়ার নির্মাণ করেন। টাওয়ারটি ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে ভেঙে যায়। জোসেফ মার্টিনও ওই ঘটনা সম্পর্কে বলেছিলেন। সে সময় আর্মেনীয়রা অনেকেই ঢাকা ছাড়ছিলেন। সে কারণে টাওয়ারটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেননি তাঁরা। বর্তমানে চার্চটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো সংস্থা থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন কি না—এ প্রশ্নে মার্টিন বলেছিলেন, “আর্মেনিয়ায় এ বিষয়ে ‘হলি সি অব ইত্চমিয়াদজিন’ নামের একটি ধর্মীয় সংস্থা রয়েছে। সংস্থাটির মাধ্যমেই অর্থোডক্স চার্চগুলো পরিচালিত হয়। কিন্তু আর্মেনিয়ার আর্থিক অবস্থা এখন ভালো নয়। ওই অবস্থায় সেখান থেকে কোনো সহযোগিতার আশা করছি না। ”

জানা যায়, ঢাকা ছাড়ার আগে মার্টিন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর হাত থেকে চার্চের জমি রক্ষার কাজে সচেষ্ট ছিলেন। এ জন্য তাঁকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। এমনকি জীবননাশের হুমকিও সহ্য করতে হয়। কয়েকবার চুরি হওয়ায় রাত হলেই চুরির আতঙ্ক তাঁকে পেয়ে বসত। সবচেয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন চার্চের চারপাশের নোংরা পরিবেশ নিয়ে। মার্টিনের সেই উদ্বেগ এখন শঙ্কর ঘোষের মধ্যেও। ফটকের পাশেই স্যুয়ারেজ লাইনের ময়লা তরলের দিকে ইঙ্গিত করে তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, কানাডা, জার্মানি—এসব দেশের দূতাবাসের লোকজন প্রায়ই এখানে আসেন। অনেক বিদেশি পর্যটকও আসেন। দুর্গন্ধ এড়াতে তাঁদের নাকে কাপড় দিয়ে আসতে হয়। এলাকার রাস্তাও ভাঙাচোরা। এতে তো দেশেরই বদনাম হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের ডাকটিকিটেও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে এই আর্মেনিয়ান চার্চের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। দেশের পর্যটন গাইডেও ছাপা হয়েছে এই চার্চের ছবি ও ইতিহাস।


মন্তব্য